মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২ আশ্বিন ১৪২৮

শিরোনাম: বারডেম হাসপাতালের কেবিনে বৃদ্ধার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার    দেশে ৪ কোটি ১৩ লাখের বেশি করোনার টিকা প্রয়োগ    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সর্বত্র যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশ রাষ্ট্রপতির    করোনা টেস্টের টাকা নিয়ে উধাও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট    দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করছে বিএনপি: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী    মৃত্যু ও শনাক্ত দুটোই বেড়েছে    কমল ডেঙ্গু রোগী, বাড়ল মৃত্যু   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতি
প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে বিতর্কিত করা দুর্নীতিবাজরা কেন বহাল তবিয়তে
রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশ: সোমবার, ১২ জুলাই, ২০২১, ১:০৯ এএম আপডেট: ১২.০৭.২০২১ ১:২৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ

সম্প্রতি প্রশাসনের তথাকথিত পরিশুদ্ধ, সৎ, দক্ষ, যোগ্য, কর্মঠ ছোট আমলাদের কীর্তিকলাপ দেখে মানুষ হতভম্ব। দেশবাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল প্রশাসনের সবচেয়ে নিম্ন স্তরের জুনিয়র কর্মকর্তা ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) ও সহকারী কমিশনার ভূমির সাহস। তারা খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নে আশ্রয়ণ প্রকল্প লুটেপুটে খাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এতেই প্রমান হয়, দূর্নীতিবাজ ওইসব কতিপয় কর্মকর্তার বুকের পাটা কত বড় এবং সাহসের দৈর্ঘ কতদূর। প্রধানমন্ত্রীর ‘ব্রেইন চাইল্ড’ হিসেবে খ্যাত উদ্ভাবনী এই আশ্রয়ণ প্রকল্পটি তিনি নিয়েছিলেন দেশের অসহায়, ভূমিহীন, ছিন্নমুল হাজার হাজার মানুষকে স্বাবলম্বী করার জন্য। অথচ তাতেই ছোবল ? হয়তো সবকিছুতে ছোবল মারার গতানুগতিক অভ্যাস থেকে এই অপকর্ম। অবশ্য এবার ‘কেষ্ট বেটাই চোর’ ফর্মুলায় রাজনীতিবিদদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেরা আর সাধু সাজতে পারেননি। সব ঝাড়িঝুড়ি যে ফাঁস হয়ে পড়েছে তথাকথিত কতিপয় সৎ আমলাদের চরিত্র। এ যেনো মহামারি করোনা ভাইরাসের চেয়েও বিপজ্জনক। মাস্ক পড়লে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চললে এবং দুই ডোজ টিকা নিলে হয়তো মানবতার অদৃশ্য শত্রু করোনার হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। কিন্তু মন্ত্রনালয় (সচিবালয়) থেকে উপজেলা পর্যন্ত জালের মত বিস্তৃত ওই প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর কী কোনো দাওয়াই আছে ?
 
হতদরিদ্র মানুষের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব ও একান্ত মমতা-ভালবাসা থেকেই এই আশ্রয়ণ প্রকল্প। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর মুজিবর্ষের প্রতিশ্রুতি। তিনি স্বগর্ভে বলেছেন,‘দেশের একজন মানুষর ভূমিহীন থাকবে না।’ আর সে জন্যই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে পিছিয়ে পড়া দেশের প্রান্তিক জনগোষ্টীকে টেনে তোলার জন্যই এই প্রয়াস। ইতিমধ্যেই প্রকল্পটি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে, প্রশংসিতও হয়েছে। কিন্তু গৃহহীন ও ভুমিহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মান নিয়ে অভিযোগের যেনো শেষ নেই। অসংখ্য অভিযোগের ভাড়ে প্রধানমন্ত্রী রীতিমত বিব্রত ও ক্ষুব্ধ। প্রধানমন্ত্রীর মানবিক হৃদয়ের স্পর্শমাখা উপহার পেয়ে ভূমিহীন অসহায় মানুষগুলো যেভাবে খুশিতে আত্মহারা হয়েছিল, এখন সেভাবেই তারা অবাক বিস্ময়ে অশ্রুস্বজল হয়েছেন।

গত ২৩ জানুয়ারি প্রথম দফায় ৬৬ হাজার ১৮৯টি গৃহহীন পরিবারের হাতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের চাবি তুলে দেন বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুজিব বর্ষের উপহার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় দফায় আরও ১ লাখ ২৩ হাজার ঘরের নির্মান কাজও প্রায় শেষ হয়েছে। অথচ এর মধ্যেই ফাঁস হলো ইউএনওদের পুকুর চুরির কেচ্ছা-কাহিনী। ইতিমধ্যেই ২২টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ঘর নির্মানে অকল্পনীয় দূর্নীতি, অনিয়ম, ও অর্থআত্মসাতের মাধ্যমে অবিশ্বাস্য নিম্নমানের ঘর তৈরির প্রমান পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ প্রমানীত হওয়ায় ইতিমধ্যেই সরকারের জনপ্রশাসনের উপজেলা পর্যায়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ প্রশাসন ক্যাডারের ৫ জনকে ওএসডি করা হয়েছে। তদন্তে দোষী প্রমানীত হওয়ায় আরও কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ৯ জুলাই থেকে সরকারের ৫টি তদন্ত দল মাঠ পর্যায়ে তদন্তেও নেমেছে। যাদের ওএসডি করো হয়েছে, তারা হচ্ছেন-সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের সাবেক ইউএনও মো. শফিকুল ইসলাম,বরগুনার আমতলীর ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান, বগুড়ার শেরপুরের সাবেক ইউএনও মো. লিয়াকত আলী সেখ, মুন্সিগঞ্জ সদরের সাবেক ইউএনও রুবায়েত হায়াত শিপুল এবং মুন্সিগঞ্জ সদরের বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ মেজবাহ-উল-সাবেরিন। এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার ভিত্তিতে সরকার তাদের শাস্তি ঠিক করবেন। 

আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর অধীনে প্রতিটি ঘরের সাথে দুই শতাংশ জমিসহ একটি দুই কক্ষের আধাপাকা ঘর বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে এই মহৎ কর্মযজ্ঞ। আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিচালক সরকারের অতিরিক্ত সচিব মো. মাবুব হোসেন বলেছেন, ‘ ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর করে দেওয়া প্রকল্পে কিছু জায়গায় যেসব অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে নজরে এসেছে, সে বিষয়ে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ’ 

প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো নির্মানের শুরুতেই সাইট সিলেকশনে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বহু নিচু জায়গা মাটি ভরাট করেই শুরু করা হয়েছে নির্মানকাজ। আবার অনেক জায়গায় জোয়ারের পানি ঢুকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও স্থান পরিবর্তন করা হয়নি। এসব স্থানে কাঁচার মাটির ওপর ঘরভিটি তৈরি ও তার ওপর আধাপাকা দুই কক্ষের ঘর নির্মানের কাজে তেমন কোনো তদারকিই ছিল না। সিমেন্টের পরিবর্তে অতিরিক্ত বালু, নিম্নমানের জানালা-দরজা ও টিন ব্যবহার করলেও ওই আমলা হুজুররা দেখতেই যাননি। অথবা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজসে কিছুমিছু পকেটস্থ করে ভাগ্যপরিবর্তনের খেলায় মেতে উঠেছিলেন উপজেলার দন্ডমুন্ডের কর্তারা। চৈত্রের কাঠফাঁটা গরমেও যারা ইউরোপের ঢংয়ে টাই স্যুট পরে তথাকথিত আমলা সেজে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চেয়ারে বসে সবার উপরে ছড়ি ঘোরান, সেইসব অফিসাররা কী আর মাঠে-ময়দানে গিয়ে রোদে দাঁড়িয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঠিকাদারকের কাজের তদারকি করতে পারেন ? কীভাবে তারা জানবেন কত ব্যাগ সিমেন্টের সাথে কত ব্যাগ বালু মিশাতে হবে , কত মিলিমিটার রডের পরিবর্তে কত মিলিমিটার রড দেওয়া হয়েছে, জানালা ও দরজা মান সম্পন্ন কীনা অথবা ইটগুলো এক নম্বর কীনা ? এসব কাজ কী তাদের মানায় ? ওনারা কোন পরিবার থেকে কীভাবে উঠে এসে ইউএনও এবং সহকারী কমিশনার হয়েছেন, তা কী এখন মনে আছে ? কাকের বাসায় কোকিলের ছাঁয়ের মত তাদের ওই ম্যাকি ভরণ টাই স্যুটের নীচে চাপায় পড়ে গেছে। এখন তো তাদের অনেকেই নিজেকে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্পের বংশধর ভাবতে শুরু করেছেন। তারা (প্রশাসনের কতিপয় আমলা) কীকরে ওইসব ভূমিহীন, ছিন্নমূল অসহায় মানুষের আর্তনাদ ও দীর্ঘশ্বাস বুঝবেন ? এই জন্যই তো সিঙ্গাইরের ইউএনওকে স্যার না বলে আপা বলায় পুলিশ দিয়ে গরিব স্বর্ণকার তপনকে পিটিয়েছে। বগুড়ার আমতলীর ইউএনও’র বাগানের গাছ ছাগলে খাওয়ায় ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে ছাগলকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করেন ? এগুলো কিসের আলামত ? কী শাস্তি হয়েছে ওইসব পিচ্চি অফিসারদের ? 

প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভাবনী জনকল্যাণমুখী চিন্তা 
দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েই পিতার রাষ্ট চিন্তা, ও দর্শন থেকে উৎসারিত আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্টীর জন্য অভাবনীয় ও সৃষ্টিশীল প্রকল্প হাতে নেন। তিনিই এ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম চালু করেন বয়ষ্ক ও বিধাব ভাতা। এর কিছুদিন পরেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর অনন্যসাধারণ চিন্তা থেকে শুরু করেন কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ এবং ঘরে ফেরার মত যুগান্তকারী কর্মসূচী। অবশ্য ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসেই দেশের গ্রামাঞ্চলের অসহায় মানুষের সহায়-সম্বল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়ে গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়।

দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন কারা- রাজনীতিবিদ না আমলা
অবশ্য দেশের এখন বড় শত্রু দুর্নীতি। সরকারের আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, এতদিন বদনামের ভাগিদার রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিকে যোজন যোজন পেছনে ফেলে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে বীরবিক্রমে এগিয়ে চলেছেন আমলারা। 

এতদিন প্রশাসনযন্ত্রের মাঠ পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সুকৌশলে প্রচার করে আসছিল, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, এমপি ও মন্ত্রীরা নানাভাবে উন্নয়ন কাজে নাক গলানো এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে ভাগ নেওয়াসহ বিভিন্নভাবে দুর্নীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ায় দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন হচ্ছে না। এই দুর্নীতি-অব্যাবস্থাপনা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় আমলাতন্ত্র। 

দুর্নীতির দায়ে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রসহ বহু জনপ্রতিনিকে বরখাস্তসহ গ্রেফতার ও জেলে দেওয়া হয়েছে, বহু এমপি রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা হয়েছেন, সাজা পেয়েছেন এবং মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ করা হয়েছে অনেকে, সাবেক অনেক মন্ত্রীর জেলও হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির দায়ে কখন কোন্ ইউএনও, ডিসি, সচিব বা আমলার জেল-জরিমানা হয়েছে ?

অথচ অতীত ইতিহাস কী স্বাক্ষ্য দেয় ? এদেশের স্বাধীনতাসহ যা কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন সবকিছুই হয়েছে রাজনীতিবিদদের হাত ধরে। বরং ইতিহাস প্রমান করে বিভিন্ন সময় অনেক আমলা আদর্শচ্যুত, পথভ্রষ্ট ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদদের ষড়যন্ত্রের অংশীদার হয়ে ফায়দা লুটেছেন। 

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওইসব আমলারা নানাভাবে কলকাঠি নেড়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে তাদের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সরকারের ‘গুড নুট বুকে’ চলে আসে। এখন সেই আমলাদের কী অবস্থা ? পুলিশ, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, ভূমি বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, শিক্ষা প্রকৌশল, গণপূর্ত প্রকৌশল, পানি সম্পদ বিভাগসহ এমন কোন্ সরকারি অফিস নেই যেখানে দুর্নীতি হচ্ছে না ? যারা দেশের মূল চালিকা শক্তি, সেই সাধারণ মানুষকে তারা নানা কৌশলে শুষে পিষে চিড়ে চ্যাপ্টা করছেন এই আমলারা। অথচ তারাই সুকৌশলে রাজনীতিবিদদের কাঁধে দুর্নীতির সব দায় চাপিয়ে নিজেরা নিষ্পাপ দুধে ধোয়া সাধু সেজে বসেছিলেন। এখন সেই সাধুর ঝোলা থেকে বেড় হচ্ছে নানা কেচ্ছা-কাহিনী। বিশ্বস্ত আমলাতন্ত্রের ইদুঁর ফুটো করে ফেলছে সরকারের উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির উন্নয়নের জাদুর বাক্সকে। 

আমলাদের ওপর সরকারের বিভিন্ন গুরুদায়িত্ব অর্পন এবং তাদের কার্যকলাপ ও দুর্নীতিতে অতীষ্ট হয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও ঘটে গেল এক অনির্ধারিত বিতর্ক। গত ২৮ জুন সংসদে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ঐতিহাসিক চরিত্র, আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য, প্রাক্তন মন্ত্রী বর্ষিয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান প্রাক্তন মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদসহ অন্যান্যরাও আমলাতন্ত্রকে তুলোধূনো করে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। সচিবদের জেলার দায়িত্ব প্রদান ও তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে উষ্মা প্রকাশ করে অনেকটা আবগআপ্লুত কন্ঠে তোফায়েল আহমেদ স্মরণ করিয়ে দেন যে, সরকারের ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুযায়ী সচিবেদের ওপরে এমপির অবস্থান। কিন্তু বাস্তবে তারা এখন ক্ষমতাহীন। দেশ চালাচ্ছে আমলারা।

মানবতার নেত্রী শেখ হাসিনা আরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবীয় উদ্যোগের আরও একটি উজ্জ্বল উদাহারণ হলো ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প। প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা কারণে এখন এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আমার বাড়ি আমার খামার।’ ওই আগের মতই বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে প্রকল্পটি পূনরুজ্জীবন পায়। ওই সময়ও প্রকল্পটির পরিচালক ছিলেন একজন সিনিয়র আমলা। কিন্তু ওই পরিচালকের নানামুখী অপতৎপরতা ও খামখেয়ালির কারণে প্রকল্পটি গতি হারায়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় নানা কাজে। এক পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে হরিলুটের অভিযোগ তুলে হৈচৈ শুরুও হয়। এ সময় অনেকে ব্যাঙ্গ করে এই প্রকল্প সম্পর্কে বলে বেড়াতো-‘ একটি বাড়ি একটি খামার, অর্ধেক আমার-অর্ধেক তোমার।’ওইসময় তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রকল্পটিকে দুর্নীতিমুক্ত করে গতি সঞ্চারের জন্য নানামুখী চেষ্টা-তদবির করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ফল হয়নি। ওই প্রকল্প পরিচালকের খুটির জোর এত শক্ত ছিল যে, বুলডোজারের ধাক্কাতেও তাকে নড়ানো যায়নি। ওই আমলার অপকর্মেও জন্য শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির নাম পর্যন্ত পাল্টে ‘ আমার বাড়ি-আমার খামার’ রাখা হলেও প্রকল্প পরিচালকের কেশাগ্র ষ্পর্শ করা যায়নি। আমলারা যেন পানিতে ভাসমান হাঁস। সবসময় ভাসমান থাকলেও শরীরে পানির ছোঁয়া লাগে না। আর পানি লাগলেও পাখা ঝাড়া দিলেও সব পুতপবিত্র। এইসব আমলারাই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে উচ্চ কন্ঠে প্রচার করতেন,‘ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক।’ এরশাদকে এরাই দিয়েছিলেন ‘পল্লীবন্ধু’ উপাধি। খন্দকার মুশতাক ও জেনারেল জিয়ার আমলে এইসব আমলাদের বুদ্ধিতেই জারি হয়েছিল ‘ ইনডেমনিটি’র মত কুখ্যাত কালো আইন। জিয়া-এরশাদের শামরিক শাসনকে এরাই বৈধতা দিয়ে সংবিধানের সংশোধনী আনতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবার এরাই এখন ওই হাঁসের মত পাখা ঝাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সবচেয়ে ব[ড় সৈনিক সেজে ত্যাগী, আদর্শবান, নির্যাতিত, সৎ, যোগ্য হাজারো আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিতর্কিত করে ঠেলে দিয়েছেন সাইড লাইনে। সামনে নিয়ে এসেছেন তাদের মতই রং পাল্টানো, ভোল পাল্টানো আদর্শহীন, নীতিহীন, যখন যেমন, তখন তেমন মার্কা নবাগতদের। যুগে যুগে এইসব রং ও ভোল পাল্টানো আমলাদের কীর্তিকলাপ ও আমলনামা লিখতে গেলে বিশাল শাহনামা রচনা করা যাবে।
 
আশ্রয়ণ প্রকল্পের পেছনের কথা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসেন তখন দেশের দারিদ্রের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। একটানা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনা করে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে গত সাড়ে ১২ বছরে দেশের দারিদ্রের হার হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। দেশের অসহায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত করে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিনত করতে তিনি মায়ের মমতায় তিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন।

‘বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না’ এমন ঘোষণা দিয়ে তিনি দেশের ৬৪ জেলাতেই ভূমিহীন, গৃহহীন ও ছিন্নমুল মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব পরিকল্পনা থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্প হাতে নেন। 

‘ক’ শ্রেণীভুক্ত অর্থ্যাৎ একেবারেই ভূমিহীন ও গৃহহীন এমন ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬১ পরিবার এবং ‘খ’ শেণীভুক্ত অর্থ্যাৎ যাদের ঘর নেই অথবা জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর ঘর আছে এমন ৫ লাখ ৯২ হাজার ২৬১টি পরিবারের তালিকা করা হয়। প্রকল্পের ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ৪ লাখ ৪২ হাজার ৬০৮টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে পুণর্বাসন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত মোট ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২ পরিবারকেই পূনর্বাসন করা হবে। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সম্পূর্ণ সরকারের অর্থায়নে ৩ হাজার ৮৪০ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পূনর্বাসিত গৃহহীন-অসহায়-ছিন্নমুল মানুষদের মধ্যে ২, ৭৫ হাজার ৬৫৬ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে এবং ১লাখ ৩৭ হাজার ৭১৮টি পরিবারকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে নিজ জমিতে গৃহনির্মান প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৭টি পরিবারকে ঘর নির্মানও করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের জন্য ২৪৩টি টং ঘর ও বিশেষ ডিজাইনের ঘরও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন নোয়াখালী, বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছা গ্রাম পরিদর্শন করেন এবং নদীভাঙ্গন কবলিত ভূমিহীন-গৃহহীন অসহায় পরিবারগুলোকে গুচ্ছগ্রামে পুনবার্সন করেন। কক্সবাজার ও অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯৯৭ সালের ১৯ মে ভয়াবহ ঘুর্ণিঘড় আঘাত হানে। দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসা জাতির পিতার উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘুর্ণিঝড়ের পরদিন ২০ মে টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিন পরিদর্শন করে ঘুর্ণিঝড় ক্ষতিগ্রস্থ গৃহহীন হত দরিদ্র পরিবারগুলোকে পূনর্বাসনের নির্দেশ দেন। শেখ হাসিনা ওই বছরই ভূমিহীন-গৃহহীন ছিন্নমূল মানুষদের পূনর্বাসন করার জন্য সম্পূর্ন নিজস্ব চিন্তা ও অসহায় মানুষের প্রতি দরদ-ভালবাসা থেকে চালু করেন ‘ আশ্রয়ণ প্রকল্প।’ এটি শুধু একটি মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্যই নয়। এটির পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। উপকারভোগিরা পাবেন দুই শতাংশ করে জমির দলিল, থাকার ঘর, রান্নার ঘর, গোসলখানা ও টয়লেটসহ একটি অধাপাকা ঘর। থাকবে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ। প্রতি দশ পরিবারের জন্য একটি নলকুপ। প্রকল্পে থাকবে কমিউনিটি ক্লিনিক ও প্রাথমিক স্কুল। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য থাকবে একটি খেলার মাঠ ও বিনোদন কেন্দ্র। প্রকল্প এলাকার চারদিকে থাকবে শাক-সবজির বাগান। উপকারভোগিদের স্বনির্ভরতার জন্য কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করতে বিভিন্নমুখী পেশার প্রশিক্ষনের ব্যবস্থাও থাকবে এখানে। বিশেষ করে মৎস্য চাষ, পাটি বুনন, নার্সারি, নকশিকাঁথা, ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক ওয়েল্ডিং এবং রিক্সা-সাইকেল ও ভ্যান গাড়ি মেরামতের মতো ৩২টি পেশায় তাদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। এ প্রশিক্ষণ চলাকালে যাতে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে না যায় তার জন্য প্রতিদিন প্রতিজনকে ৭৫০ টাকা করে ভাতাও দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষণ পরবর্তি সময়ে উপকারভোগিরা সমবায় সমিতি গঠন করে আয়বর্ধনকারী ব্যবসা বা পেশা চালুর মাধমে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দানেরও ব্যবস্থা রয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতে ওঠার প্রথম তিনমাস প্রতিটি পরিবার ভিজিএফ-এর আওতায় খাদ্য সহায়তা পাবে। একই সঙ্গে বয়ষ্ক ভাতা, মাতৃকালীন ভাতা, বিধাবা বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা-নিরাপত্তার কর্মসূচীর সকল সুযোগ-সুবিধাতেও তারা অগ্রাধিকার পাবেন। অর্থ্যাৎ একজন অসহায় ছিন্নমূল নিঃস্ব মানুষকে আত্মপ্রত্যয়ী হিসেবে মানব সম্পদে পরিণত করাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের সুদূর প্রসারী বাস্তবায়নের নামই আশ্রয়ণ প্রকল্প। প্রকল্প এলাকায় আধুনিক গ্রামের সব ধরনের সুযোগ সুবিধাই থাকবে। 

কেসস্টাডি-১ ভোলার দৌলতখান উপজেলা
দৌলতখানে কাগজে কলমে ৬ মাস আগেই প্রথম পর্যায়ের ৪২টি ঘরগুলো ভূমিহীনদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও সেসব ঘরে এখনও টিনই লাগানো হয়নি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাওসার হোসেন ইতিমধ্যেই ঘর নির্মাণের সব বিল তুলে পকেটস্থ করেছেন। এই ইউএনও’র গাড়ি চালক ও গৃহচরিচারিকার নামেও বরাদ্দ করা হয়েছে দুটি ঘর। এছাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের নাজিরের দুজন গৃহপরিচারিকার নামেও দেওয়া হয়েছে ঘর। এলাকাবাসীর অভিযোগ স্বচ্ছল ও জমি-জমা আছে এমন পরিবারের কাছ থেকে নগদ নারায়নের বিণিময়েও ঘর বরাদ্দ করা হয়েছে। মৃত স্ত্রীর নামে ঘর বরাদ্দ নিয়ে বিক্রি করে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে এই ইউএনও’র বিরুদ্ধে। এমনকি উপজেলা শিক্ষা অফিসারের বাবার নামে এবং উপজেলায় কর্মরত কর্মরত একজন সরকারি কর্মকর্তাও বাবার নামেও ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন জনপ্রশাসনের এই ক্ষুদে অথচ ক্ষমতাধর কর্মকর্তা। অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, সাদিয়া আফরোজ লিমা নামের এক গৃহবধূকে বিধাব দেখিয়ে তার নামে অসৎ উদ্দেশ্যে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরে ওই গৃহবধূও স্বামী আল আমিন ঘরটি পারভীন নামে অন্য এক নারীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। উপরোক্ত যাদের নামে ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন সদাশয় ইউএনও, তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব জমি-জমা ও ঘর রয়েছে। উপজেলার চরপাতা হাইস্কুল সংলগ্ন খাসজমিতে নির্মিত ঘর কাগজে কলমে নাজমা নামের এক গৃহহীন নারীর নামে বরাদ্দ দেখানো হলেও মুলত ঘরটি নির্মিতই হয়নি। টিনের চালাই লাগানো হয়নি। অথচ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ তৌফিক ইলাহী বলেন, কোনোরূপ অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত হবে।
 
কেসস্টাডি-২, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা
সুনামগঞ্জের দুর্গম শাল্লা উপজেলার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে নির্মিত প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরগুলোতে ফাটল ধরেছে। বরাদ্দকৃত ৩৭টি ঘরের মধ্যে ৬টিতে এমনভাবে ফাটল দেখা দিয়েছে যে, সেগুলো আর বসবাসের উপযোগী নয়। ঘরের বরাদ্দ পাওয়া ভূমিহীন আলী রাজা, রমিজ আলী, হারুন রশিদ, আবদুল কাহার, আব্দুল কালাম ও গোলাম রাব্বানী জানিয়েছে, ঘরগুলো বসবাস করা যাবে না। ঘরের মেঝেতে ফাটল, জানালা-দরজা খসে পড়ছে, ঘরের খুটি ও বারান্দা ভেঙ্গে পড়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতি,নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার এবং কর্তৃপক্ষের তদারকির পরিবর্তে অসৎ পন্থায় অর্থ আত্মসাতের কারণে এমন দশা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় লোকজন। উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা (পিআইও) মো.মানিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, ঘরের ফাটলের কথা তিনি জানতেই পারেননি। যদি ফাটল ধরেই থাকে তবে আমাদের মিস্ত্রী গিয়ে মেরামত করে দিয়ে আসবে। কতবড় বাটপাড় এই পিআইও। তাকে কেন ওএসডি করা হচ্ছে না ? ওই লোকটার কথার ধরন শুনে মনে তিনি বঙ্গের লাট। ঘরে ফাটল কোনো বিষয়ই না। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল-মুক্তাদির হোসেনকে ওএসডি করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

কেসস্টাডি-৩, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে বরাদ্দ করা শ্রীপুরের নিম্নাঞ্চলে নির্মিত ১১টি ঘরই ভেঙ্গে পড়েছে। নির্মিত স্থানে জোয়ারের পানি আটকে থাকায় সেখানে বসবাসের অনুপোযুক্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহাদত হোসেন মাসুদ বরাদ্দ পান ৪১৭টি ঘরের। প্রথম পর্যায়ে ২৫২টি ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬৫টি ঘর। প্রতিটি ঘরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অফিসের প্রকল্প পরিচালক বরাদ্দ দেন প্রথম পর্যায়ে এক লাখ ৭১ হাজার ও দ্বিতীয় পর্যায়ে এক লাখ ৯০ হাজার করে টাকা। গত ২৩ জানুয়ারী শ্রীপুর ইউনিয়নের কাঠের পোল এলাকায় প্রথম পর্যায়ে ৪০টি ঘরের ১৬টি ঘরের পিলার ধ্বসে গেছে। দেওয়ালে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ফাটল। ছুটে গেছে জানালার গ্রিল। খুলে গেছে চালের টিনের ছাউনি। বৃষ্টিতে চালের ফাঁকা দিয়ে পানি পড়ছে। জোয়ারের সময় পুরো প্রকল্প এলাকায় পাটি আটকে থাকায় প্রতিটি ঘরের মেঝের মাটি ধ্বসে গেছে। এসব ঘরে ঘর বরাদ্দ পাওয়া কেউ বসবাস করতে পারছে না। শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মো. রাকিব ও আনসার সদস্য মিজানুর রহমানের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হলেও এরা কেউই ভূমিহীন নন। তাছাড়া মাছ ব্যবসায়ী নিজস্ব জমিতে চৌচালা ঘরের মালিক মো. রফিকের নামেও টাকা খেয়ে তার নিজ বাড়িতেই দুটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। এ দুটি ঘরে তারা কেউ বসবাস করেন না। ব্যবহৃত হচ্ছে রান্নার ও লাকড়ি রাখার ঘর হিসেবে। 

কেসস্টাডি-৪, বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে ১৫৬টি ভূমিহীনকে আশ্রয়র প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২ নম্বর আশ্রয়ণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া এসব ঘরের মধ্যে গোছন ও গোপালপুর পুকুরপাড় নির্মিত ঘরগুলোতে দেখা দিয়েছে ফাটল। মেঝে ও দেওয়াল ফেটে ধ্বসে পড়েছে। ঘরের বারান্দার খুটিও পড়ে গেছে। প্রকল্প এলাকায় যাওয়ার জন্য কোনো রাস্তাও নেই। ফলে ঘরের বরাদ্দ পেয়েও সেখানে কেউ বসবাস করছেন না। এছাড়া দাসগ্রামে নির্মিত ১৭টি ঘরেও এখন পর্যন্ত কেউ ওঠেনি। কারণ সেগুলোও বসবাসের যোগ্য নয়। 

দুর্নীতির আরও কিছু খন্ড চিত্র
গোপালপুরে হস্তান্তরের পরেই ভেঙ্গে পড়েছে দুটি ঘর। বৃষ্টির কারণে কাঁচা মাটি ও বালু মাটি ধ্বসে ঘরগুলো ভেঙেছে। লালমনিরহাটে ঝড়ো বাতাসে উড়ে গেছে ঘরের চালার টিন। বগুড়ার শেরপুরে কায়রাখালি বাজারের কাছে খালের পাড়ে নির্মিত ঘরগুলোর সবকটিতেই ফাটল দেখা দিয়েছে। 



ভোলার দৌলতখানে কাজ অসমাপ্ত রেখেই বিল তুলে নিয়েছে চোরের দল।

মেহেরপুরের গাংনীতে উপহারের ঘর নির্মাণ শেষে জমি নিয়ে মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে ভূমিহীনরা এখন ঘরই পাচ্ছেন না। পাবনার সাঁথিয়ার ৩৭১ ঘরের ১০টির চালা খুলে পড়েছে। ১২টি ঘর নির্মানের পর এখন অন্যত্র স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নাজিরপুর পৌরসভার চান্দাইল গ্রামে নির্মিত ঘর, নেত্রকোনার মদন উপজেলার সদর ইউনিয়নে নির্মিত ৫৬টি ঘর, পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আমখোলা, গোদাখালী,কলাগাছিয়া ও তালতলী ইউনিয়নে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, নাটোর সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি গ্রামের ১৭টি ঘর, বরগুনার বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে নির্মিত ২১টি ও রামনা ইউনিয়নে নির্মিত ৮টি ঘর এবং মুন্সীগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি,নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি ও মোহনগঞ্জ, কুমিল্লার দেবিদ্বার, জামালপুরের ইসলামপুর, বরিশাল, হবিগঞ্জের মাধবপুর ও নবীগঞ্জ,মানিকগঞ্জের ঘিওর, মাদারিপুরের কালকিনি, লালমনিরহাট সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, ময়মনসিংহ সদর, দিনাজপুরের ফুলবাড়ি, সিরাজগঞ্জের তাড়াস ও কুষ্টিয়াসহ ২২ জেলার ৩৬ উপজেলায় নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরকম অসংখ্য-অসংখ্য উদাহরণ ও তথ্য আছে সাংবাদিকদের হাতে। এখন দেখার পালা কাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমলাদের আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচে এবং নানাবিধ বৈধ-অবৈধ তদবির, দলকানাদের কলকাঠি নাড়া, আত্মীয়তার ঋণ শোধ ও ঘুষ বাণিজ্যে প্রকৃত দোষীদের ইহজগতে যদি সাজা-শাস্তি নাও হয়, গরিবের হক মারার অপরাধে পরলৌকিক জগতে সৃষ্টিকর্তার আদালতে তারা যে ঘৃনিত ও দন্ডিত হয়ে কঠিন শাস্তি পাবেন তা হলফ করেই বলা যায়।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিন। আহবায়ক, সম্পাদক পরিষদ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://www.dailyvorerpata.com/ad/Comp 1_3.gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]