শনিবার ১৭ এপ্রিল ২০২১ ৩ বৈশাখ ১৪২৮

শিরোনাম: কবরীর মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি: রাষ্ট্রপতি    দেশের চলচ্চিত্রে কবরী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র: প্রধানমন্ত্রী    ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ    সারাহ বেগম কবরী আর নেই    আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ ঠেকাতেই হবে    স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে মানবতার ভ্যান চালু    মামুনুল-বাবুনগরীসহ হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার দাবি   
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অনুকরণীয় মডেল
মো. সেলিম হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল, ২০২১, ৬:৫৪ পিএম আপডেট: ০১.০৪.২০২১ ৬:৫৯ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের ঝুঁকিহ্রাস ও প্রশমন করে তা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারলে  জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড়ে এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ এ প্রাণহানির সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার ৫০০ জন। ২০১৬ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ান’ আঘাত হানলে ২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে এবং এ ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সরকারের পূর্বপ্রস্তুতি থাকায় ৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীকালে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’, ‘বুলবুল’ এবং ‘আম্পান’ এর সময় সরকার দক্ষতার সাথে তথা সুষ্ঠু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ফলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আর এজন্য দুর্যোগে সাড়াদান, পূর্ব প্রস্তুতি ও জাতীয় সমন্বয়ের উন্নয়ন এবং দুর্যোগ পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে Build Back Better (পূর্বের চেয়ে আরো ভালো অবস্থায় ফেরা) পন্থা অনুসরণ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম আর দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং নতুন নতুন কৌশলকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে আজ সারা বিশ্বের কাছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনুকরণীয় মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাফল্য মূলে রয়েছে স্থানীয়ভাবে বিন্যস্ত শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো। সরকার স্থানীয়ভাবে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনগুরুত্বপূর্ণ এ কার্যক্রমের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ৫২ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল।

জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দুর্যোগ পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ, আসন্ন দুর্যোগের কবল থেকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণের জন্য বেতার, টেলিভিশন এবং স্থানীয়ভাবে দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় মাইকিং এর মাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি দ্রুত ও অধিকতর কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ইন্টারেক্টিভ ভয়েস রেসপন্স (আইভিআর) চালু করা হয়েছে। মোবাইল ফোন নম্বর থেকে ১০৯০(টোল ফ্রি) নম্বরে ডায়াল করে দুর্যোগের আগাম বার্তা পেয়ে জনগণ পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। এ বার্তাকে আরো অধিকতর জনবান্ধব করার লক্ষ্যে কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে স্থানীয় ভাষায় বার্তা প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বড় ধরনের দুর্যোগে অনুসন্ধান ও উদ্ধারে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ National Emergency Operation Centre (NEOC) প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

দুর্যোগে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দুর্যোগ সহনীয় টেকসই নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় পরিকল্পিতভাবে কাঠামোগত ও অকাঠামোগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা দেখে স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালীন দুর্যোগ ঝুকি-হ্রাসে উপকূলীয় বনায়ন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) চালু করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে সমুদ্র উপকূলীয় ১৩ টি জেলাসহ ১৯ টি জেলায় এর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ৫৫ হাজার ৫১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক কর্মরত আছেন। 

সম্প্রতি মহিলা স্বেচ্ছাসেবক ইউনিটও গঠন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা হতে মানুষের জানমাল রক্ষার্থে মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়, যা সর্ব সাধারণের কাছে মুজিব কিল্লা নামে পরিচিত। তারই আধুনিক রূপে উপকূলীয় ও বন্যা উপদ্রুত ১৪৮ টি উপজেলায় ৫৫০ টি মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান। উপকূলীয় দুর্গত জনগণ যেমন সেখানে আশ্রয় নিতে পারবে তেমনি তাদের প্রাণিসম্পদকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের  ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারবে। এছাড়া জনসাধারণের খেলার মাঠ, সামাজিক অনুষ্ঠান ও হাট-বাজার হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যাবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহহীন ‘সবার জন্য বাসস্থান’ স্লোগান অনুযায়ী দেশব্যাপী দুর্যোগ সহনীয় গৃহ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির বিশেষখাতে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট ২৮ হাজার ২২৭ টি দুর্যোগ সহনীয় গৃহ নির্মাণ করা হয়। তাছাড়া মুজিব শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্রতিটি গ্রামে একটি করে দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে।

দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে কর্মহীন মৌসুমে কর্মক্ষম বেকারদের স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থানে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচি ‘ইজিপিপি’র  কার্যক্রম চলমান।  গ্রামীণ দুর্গম জনপদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরু রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, সংযোগ সড়ক, হাট বাজার, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে কাবিখা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছর হতে  ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ১২ লাখ ৯১ হাজার ১৬১টি সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থ বছর হতে ২০১৯-২০ অর্থ বছর পর্যন্ত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৮ লাখ ১০ হাজার ৯৫২ টি পরিবারকে গৃহ নির্মাণের জন্য ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৩৩৫ বান্ডিল ঢেউটিন এবং নির্মাণ ব্যয় বাবদ ২৬১ কোটি ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়। উপকূলীয় এলাকায় বয়স্ক, গর্ভবতী, শিশু ও প্রতিবন্ধিতাবান্ধব ৩২০ টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় দুই লাখ ৫৬ হাজার বিপদাপন্ন মানুষ এবং প্রায় ৪৪ গবাদিপশুর আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙ্গন এলাকায় দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে বন্যা পীড়িত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট ২৩০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এতে প্রায় ৯২ হাজার মানুষ এবং ২৩ হাজার গবাদিপশুর আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৮-২০২২ মেয়াদে ৪২৩ টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। দুর্যোগে গবাদিপশু সহ জনগণের আশ্রয় কেন্দ্রে যাতায়াত, উৎপাদিত পণ্য হাট-বাজারে পরিবহন ও বিপণন সহজতর করাসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির লক্ষ্যে মান্ধাতা আমলের বাঁশের সাঁকোর পরিবর্তে দেশে ২৬ হাজার ৩৩১টি পাকা ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্যোগে দ্রুত ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহের লক্ষ্যে জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী মজুদ ও বিতরণের লক্ষ্যে দেশের ৬৪ টি  জেলায় ৬৬ টি জেলা ত্রাণ গুদাম কাম  দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্য কেন্দ্র নির্মাণ কার্যক্রম চলমান। দেশের ৪৯২ টি উপজেলায় মোট ৫ হাজার ৭৮৫ কিলোমিটার গ্রামীণরাস্তা টেকসই করনের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) করণ করা হয়েছে। দুর্যোগকালীন ঘূর্ণিঝড় প্রবণ উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি পরিশোধনে ৩০টি মাউন্টেড স্যালাইন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কারণে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিপদাপন্নতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সহজ হয়েছে।

এভাবে দুর্যোগে ঝুঁকি হ্রাসে জীবন ও সম্পদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দুর্যোগ সহনীয়, টেকসই ও নিরাপদ দেশ গড়ার লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় পরিকল্পিতভাবে কাঠামোগত ও অবকাঠামোগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। যা আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হবে।

লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  

সারাদেশ

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]