শনিবার ১৭ এপ্রিল ২০২১ ৩ বৈশাখ ১৪২৮

শিরোনাম: অভিনেত্রী কবরীর মৃত্যুতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর শোক    কবরীর মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি: রাষ্ট্রপতি    দেশের চলচ্চিত্রে কবরী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র: প্রধানমন্ত্রী    ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ    সারাহ বেগম কবরী আর নেই    আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ ঠেকাতেই হবে    স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে মানবতার ভ্যান চালু   
নিরব চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ঢাকাবাসী (পর্ব -১)
একতলা বাড়ি নির্মাণে দুইলাখ টাকা চাঁদা নিচ্ছেন কাউন্সিলর আনিস!
উৎপল দাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ৫:১৯ পিএম আপডেট: ২৩.০২.২০২১ ৬:০৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাই নিজ দলের অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশকারী হিসাবে যারা দলের দুর্নাম করেছে তাদেরও কোনো ছাড় দেননি। এবারের আওয়ামী লীগের উপ কমিটিতে যাচাই বাছাই করেই বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আদর্শিক নেতাকর্মীদের পদায়ন করা হচ্ছে যেন কোনো বাটপার ও প্রতারক প্রবেশ না করতে পারে। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘এত কিছু ঘটে যাচ্ছে; কই আপনাদের পত্রিকা, টিভিতে তো আসলো না। আমার নিজের সোর্স  থেকেই খবর নিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি।’ এ অবস্থায় ভোরের পাতার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বর্তমান ঢাকাবাসীদের ওপর নিরব চাঁদাবাজির খতিয়ান। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা, সরকারদলীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে শুরু করে ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া ফ্রিডম পার্টি থেকে যুবলীগে পদ বাগিয়ে নেয় কারাগারে বন্দি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ছোটভাইদের নামও উঠে এসেছে। এ নিয়ে ভোরের পাতার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

২০১০ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হিসাবে মনোনীত হন আনিসুর রহমান আনিস, যিনি বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন এবং সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন স্বাক্ষরিত মহানগর ছাত্রলীগের এই নেতা এক সময় আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসাবে কাজ করলেও, সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে নিরব চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

যেখানেই  ‘ভেজাল জমি’ সেখানেই কাউন্সিলর আনিসের উপস্থিতি অনিবার্য।  ত্রুটিযুক্ত নথিপত্র ও বিবাদপূর্ণ ওইসব জমি নানা কৌশলে দখলে নিতে তার রয়েছে নিজস্ব সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেট দিয়ে রাজধানীর উত্তর গোড়ান, দক্ষিণ গোড়ান, পূর্ব গোড়ান, দক্ষিণ বনশ্রীসহ আশপাশ এলাকায় বেশ কয়েকটি জমি ও বাড়ি দখলে নিয়ে বিক্রিও করেছেন তিনি। এছাড়া এলাকায় মাদক কারবার ও অবৈধ অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগও পাওয়া গেছে আনিস ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা বলছেন, এলাকার রাস্তাঘাট উন্নয়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ কাউন্সিলরের যে রুটিন কাজ সেগুলো বাদ দিয়ে এসব নিয়ে ব্যস্ত কাউন্সিলর আনিস।

স্থানীয়রা জানান, পূর্ব গোড়ানের শেষ মাথার এলাকাটি ‘মাদানী ঝিল’ নামে পরিচিত। বর্তমানে সেখানে ঝিলের কোনো চিহ্ন নেই। পুরোটাই ভরাট করে প্লট বানানো হয়েছে। এ কাজ করেন সাবেক কাউন্সিলর বাচ্চু সিকদার ও বর্তমান কাউন্সিলর আনিসসহ ভূমিদস্যুদের একটি চক্র। ওই ঝিলের কিছু অংশ জনৈক তাহেদ আলী ওরফে মাদানীর, কিছু অংশ খাস ও অন্য কয়েকজনের। তাহেদ আলীর ডাকনামে এলাকাটি ‘মাদানী ঝিল’ নামে পরিচিতি। ১২/৩/এ, পূর্ব গোড়ানে তাহেদ আলী ১৯৭৪ সালে ঝিলের ৬০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। তবে সিটি জরিপে তার জমি ওঠে মাত্র ৬ শতাংশ। বাকি ৫৪ শতাংশ ওঠে অন্য একজনের নামে। এই নিয়ে রেকর্ড কারেকশন মামলা-পাল্টা মামলার জের ধরে বিষয়টি স্থানীয় কাউন্সিলর আনিসের কাছে যায়। এরপর কৌশলে তার সিন্ডিকেট ৬-৭ বিঘা আয়তনের পুরো ঝিলটি দখল করেছে। সেটাকে প্লট বানিয়ে বিক্রির কাজ চলছে। তাহেদ আলীর মৃত্যুর পর তার দুই ছেলেকে সেখানে ৯ কাঠা আয়তনের দুটি প্লট দেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেন আনিস। তারা ৯ কাঠা একসঙ্গে চান। কিন্তু সেটা না দিয়ে তাদের দুই কর্নারে আড়াই কাঠা করে পাঁচ কাঠার দুটি প্লট দিয়ে পুরো ঝিলটি দখল করে নেন আনিস ও তার লোকজন।

কাউন্সিলর আনিস বর্তমানে যে বাড়িতে থাকেন সেটি দক্ষিণ গোড়ানের ৪১১/এ নম্বর হোল্ডিংয়ে। বাড়িটি ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ের ঠিক বিপরীতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাড়ির জমিও দখল করা। এই জমিতে আটতলা বাড়ি করে বেশিরভাগ ফ্ল্যাট বিক্রিও করা হয়েছে। পূর্ব গোড়ান ৮ নম্বর গলির মাথায় শাহী মসজিদের সামনে আরেকটি জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে আনিসের বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা জানায়, আনিস জমিটি দখল করে সার্জেন্ট পাটোয়ারী নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন। সেখানে তিনি ফ্ল্যাট বাড়ি করেছেন। ওই বাড়িতে সবসময় আনিসের ক্যাডাররা পাহারা দেয়।

দক্ষিণ বনশ্রীর এল ব্লকের ১০০ নম্বর সড়কের ৩৫ নম্বর বাড়িটির জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে আনিসের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনিস তার নিজস্ব ক্যাডার মতিন, কাঠ ফারুক ও শফিকের মাধ্যমে জমিটি দখল করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাড়িটির এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, আবুল খায়ের মোল্লা নামে এক ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে প্রবাসী এক ব্যক্তির কেনা জমিটি দখল করে নেওয়া হয়। জমিতে সাততলা একটি বাড়ি করা হচ্ছে। খায়ের মোল্লার ছেলে হাসিনুল হাসান একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। গোড়ান হাওয়াই গলির নির্মাণাধীন ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগও রয়েছে আনিসের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়রা জানায়, আনিসের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজির অভিযোগ বহু পুরনো। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নির্বাচনের প্রচার চলাকালে গোড়ান টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী হাবিবা চৌধুরীর মিছিলে গুলির করে আনিসের ক্যাডার বাহিনী। ওই ঘটনায় ওয়ার্ড বিএনপির ওই সময়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজমুল হুদা ওরফে আরজু গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া ২০১৫ সালে মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে সেগুনবাগিচায় অন্য ছাত্রলীগ নেতা লিয়াতক সিকদারকে লক্ষ্য করে আনিসের নেতৃত্বে গুলি ছোড়া হয়। তার গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।

আনিসের ঘনিষ্ঠরা জানায়, তিনি ১৯৯৯ সালে ২ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০২ সালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২০১০ সালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি হন। চার বছর এ পদে ছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি কাউন্সিলর হন।

কাউন্সিলর আনিসের বিরুদ্ধে  সবচেয়ে ভয়ংকর চাঁদাবাজির অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, রাজধানীর গোরান- দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় কোনো বাড়ি করতে গেলেই কমিশনার আনিসকে চাঁদা দিতেই হবে।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডেভেলপার জানান, আনিস কাউন্সিলর হওয়ার পরই গোড়ানে নির্মাণাধীন ভবনের ডেভেলপারদের ডেকে নেন। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা করে আদায় করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এক তলা বাড়ি করতে গেলে কমপক্ষে ২ লাখ টাকার চাঁদা না দিলে কমিশনার আনিসের ক্যাডার বাহিনী সেই কাজে বাঁধা দিচ্ছে নিয়মিত। বাড়ির মালিকরা সেই টাকা মুখ বুঁজে তার বাহিনীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।  কেউ প্রতিবাদ করলে নানা ধরণের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমন অভিযোগ ভোরের পাতার কাছে কমপক্ষে ২৫ জন নতুন বাড়ির মালিক এ অভিযোগ করেছেন। থানা পুলিশকে জানানো হলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না, উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন। 

উল্লেখ্য,  তাহসীন মোস্তাফিজুর রহমান, হাবীব মোস্তফা রাজন, রাব্বী, মাহমুদ, রনি, শাকিল নামের কয়েকজন ক্যাডারকে দিয়ে এই সব চাঁদাবাজি করাচ্ছেন আনিসুর রহমান সরকার। তাদের মধ্যে রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি প্রান্ত দে আস্থাশীল ক্যাডার হিসাবে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে কাউন্সিলর আনিসুর রহমান আনিসকে মঙ্গলবার বিকাল ৩ টা ২৬ মিনিটে ফোন করা হলে ভোরের পাতাকে  তিনি বলেন,‘ যে বাড়িওয়ালা অভিযোগ করেছেন, তাকে বলুন থানায় মামলা করতে।’ সৌজন্যতা বিনিময়ের পর অভিযোগের প্রশ্ন শুনে মাত্র ৪৪ সেকেন্ডেই কথা‘ শেষ করেন তিনি।’ ঠিক ৩ মিনিট পরই আনিসুর রহমান সরকার কল ব্যাক করেন এ প্রতিবেদককে। ২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের কথোপকথনে তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে কথা বলেন। আনিস বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এমন নিউজ প্রতিদিনই হয়। আমি নিউজ পড়ি না।’ এক পর্যায়ে মামলা করারও হুমকি দেন। পুলিশ দিয়ে হয়রানির কথা উল্লেখ করলে এ প্রতিবেদককে আনিসুর রহমান সরকার বলেন, ‘পুলিশ তো অনেক দূরের বিষয়, দেখেন না আমি অন্যভাবে কি করি।’

এদিকে, ঢাকায় আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে শুরু করে নেতাদের নিরব চাঁদাবাজির পুলিশ এবং গোয়েন্দা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত তদন্ত শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ভোরের পাতাকে বলেছিলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কিছু অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী চাঁদাবাজির অভিযোগে যারা অভিযুক্ত তাদের কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। কারণ বর্তমান সরকার দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।’


আগামী পর্বে: ভয়ংকর ত্রাসের নাম অপর নাম কমিশনার চিত্তরঞ্জন দাস!

ভোরের পাতা-এনই
 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


আরও সংবাদ   বিষয়:  কাউন্সিলর আনিস   কাউন্সিলর   উৎপল দাস  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  

সারাদেশ

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]