রোববার ৭ মার্চ ২০২১ ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

শিরোনাম: লিওনেল মেসি ফেব্রুয়ারির সেরা খেলোয়াড়     বিএনপিকে ৭ মার্চ পালন করায় ধন্যবাদ তথ্যমন্ত্রীর    বিজিবির সঙ্গে সংঘর্ষে সীমান্তে নিহত ১    ১৭ মার্চ দেশে বিদেশিদের টিকা নিবন্ধন শুরু     দেশব্যাপী গণসংযোগ করার ঘোষণা ড. কামালের    সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব নির্বাচনে সভাপতি মমতাজ আহমেদ বাপী, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সুজন    দিল্লির শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাংলাদেশ : গয়েশ্বর   
রুখতে হবে বাংলা ভাষার বিকৃতি
বিপুল হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ৭:৪৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

রুখতে হবে বাংলা ভাষার বিকৃতি

রুখতে হবে বাংলা ভাষার বিকৃতি

বাংলা পৃথিবীর সমৃদ্ধ ভাষাগুলোর অন্যতম। বাংলা এখন বিশ্বের কমবেশি ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মেঘালয়, বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, দিলি্লসহ বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী। প্রবাসীদের মাধ্যমে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা ভাষা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। দূরপ্রাচ্য থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে তারা পাড়ি জমিয়েছে ইউরোপ-আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকায়।

রক্তের বিনিময়ে একটি ভাষার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।  একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আমাদের অর্জন। কিন্তু আজ আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা তার যোগ্য সম্মান থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত। আজ সে বিকৃতিরও শিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষা কার্যক্রমের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার শিক্ষা ও চর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে বাংলা ভাষায় শুদ্ধ উচ্চারণকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পরও আমরা কজনই-বা শুদ্ধ বাংলায় শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার বা লেখার যোগ্যতা অর্জন করি। ভাষায় আঞ্চলিকতার প্রভাব থাকা খুবই স্বাভাবিক। তবে শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার ও চর্চা সম্পর্কে সচেতনতা খুব জরুরি। 

আধুনিকতার নামে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার, প্রয়োগ এবং উচ্চারণে ভিন্ন ভাষার মিশ্রণ ও শব্দের বিকৃত উপস্থাপন প্রবণতা প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার মৌলিকতা ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন ভাষা বিশেষজ্ঞরা।

এখনকার চাকরিযুদ্ধে প্রায় সর্বত্রই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ যে হারে নেওয়া হয় বাংলা ভাষায় তা নেওয়া হয় না। মৌখিক পরীক্ষাগুলো অধিকাংশই হয় ইংরেজিতে এবং সেখানে ইংরেজিতে কথা বলায় পারঙ্গম পরীক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। তারা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে বা লিখতে পারেন কি না, তা দেখা হয় না। কিন্তু কর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় দক্ষতা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হওয়া উচিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর জন্য একসঙ্গে দুটি কিংবা তিনটি ভাষা আয়ত্ত করা খুব কঠিন নয়। তবে প্রয়োজন হলো, প্রতিটি ভাষার স্বকীয়তার প্রতি হৃদয়ে শ্রদ্ধা রেখে তা আয়ত্ত করা এবং একটি ভাষার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে আরেকটি ভাষা যেন তার যোগ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। পরিবারগুলোকে এ বিষয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ মানুষের সব শিক্ষার ভিত্তিভূমি রচিত হয় পরিবারে।  পরিবার থেকেই যদি শিশু এমন আভাস পায় যে বাংলার চেয়ে ইংরেজি শেখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার কাছে বাংলা ভাষাকে গৌণ মনে হবে। কিন্তু শিক্ষার শুরুতে মাতৃভাষার ভূমিকাই প্রধান। তাই আমাদের শিশুদের ইংরেজির আগে বাংলা শিখতে হবে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অধিক ব্যবহারের ফলে বাংলা ভাষাকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হালের ফ্যাশন হিসেবে ভাষাকে সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে প্রমিত বাংলাকে বিকৃত করা হচ্ছে। ভিনদেশি শব্দের একটু একটু আগ্রাসনে ব্যবহারিক ভাষা থেকে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে অনেক বাংলা শব্দ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষায় অদ্ভুত সব শব্দ ঢুকছে। ফেসবুক ও ব্লগে মজার ছলে কথিত নতুন শব্দের ব্যবহারে দূষণ ঘটছে বাংলা ভাষায়। ফেসবুকে এমন বিকৃত বাংলা শব্দ আর বাক্যের ব্যবহার হচ্ছে হরহামেশাই। বন্ধুরা হয়েছে ফ্রান্স, খারাপ হয়েছে খ্রাপ, হবের বদলে হপ্পে। আর মন চায়কে লেখা হচ্ছে মুঞ্চায়! রোজ ফেসবুকে লেখা হচ্ছে এমন অদ্ভূতসব শব্দ। মজার ছলে এসব নয়া শব্দের ব্যবহার করা হলেও, একরকম অভ্যাসে পরিনত হয়েছে অনেকেরই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে। ফলে ভাষার এমন যাচ্ছেতাই চর্চা দূষণ ঘটাচ্ছে মূল বাংলা ভাষার। সোস্যাল মিডিয়ায় প্রধানত লিখিত বর্ণে ভাব প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও অডিও, ভিডিও বার্তা এবং বিভিন্ন ধরনের আবেগ মিশ্রিত সংকেত ব্যবহার করা হয়। ছবি আদানপ্রদানও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। তবে সবচেয়ে বেশি যে ভাষা ব্যবহার করা হয় সেটি হচ্ছে লিখিত বর্ণ। এই ভাষারও প্রতিনিয়ত ভাঙাগড়া চলছে অনলাইন জগতে। এর ফলে ভাষা যে সমৃদ্ধ হচ্ছে এমন ভাবার কিছু নেই, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাষার ঘটছে চরম বিকৃতি।


এক সময় টেলিভিশন নাটকে সংলাপের ক্ষেত্রে ‘প্রমিত’ বাংলা ভাষার শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও এখন চলিত ও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারই চোখে পড়ে বেশি। এ বিষয়টি নিয়ে অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বেশ বিরোধও চোখে পড়ছে। কেউ বলছেন জাতীয় গণমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনে একটি মান ভাষা বজায় রাখা প্রয়োজন; আবার কেউ বলছেন আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বাংলা ভাষা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বর্তমানে। ভাষা বিকৃতির মহোৎসব চলছে চারদিকে। ঘরের ড্রয়িং রুম থেকে শুরু হয় এ বিকৃতি। পথে নেমে কান পাতলে শোনা যায় আরও শত রকমের বিকৃত বাংলা উচ্চারণ। একটি দেশের প্রজন্মের বড় একটি অংশ শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে কথা বলতে পারেন না। এদের অনেকের কাছেই ইংরেজি ও বাংলার মিশ্রণে তৈরি নতুন ধরনের ভাষা প্রিয় হয়ে উঠছে। আগে  বাবা-মা তাদের সন্তানকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলায় উৎসাহিত করতে গণমাধ্যমের দ্বারস্থ হতেন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন দেশীয় গণমাধ্যমে ভাষার বিকৃত ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষ বিনোদন পেতে ভারতীয় কিংবা বিদেশি চ্যানেল বেছে নিচ্ছেন। এফএম রেডিওর আরজেদের বাংলা ইংরেজির মিশ্রণ এবং  বিকৃত উচ্চারণের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঁচমিশালী ভাষার যাত্রা শুরু। একই সাথে বেশ কয়েকজন তরুণ নির্মাতার নাটক ও সিনেমাতেও বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ ও বিকৃত উচ্চারণ প্রকট আকার ধারণ করে। সেই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন, টিভি মিউজিক শো, গেম শো এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিকৃত ভাষার ব্যবহার আস্তে আস্তে বাড়ছে।

অনেকেই শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারেন না, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত বাংলা বলা, ইংরেজি-বাংলা মেশানো কিংবা ইংরেজি ধাঁচে বাংলা বলার চর্চা দেখা যাচ্ছে। এমনকি কর্মক্ষেত্রেও ইদানীং ইংরেজি কায়দায় ও ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে কথা বলার চল লক্ষ করা যাচ্ছে।  এটা রুখতে হলে এখন কঠোর তদারকি বড় প্রয়োজন।

যে ভাষার জন্য একটি প্রজন্ম বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, যে ভাষার জন্য ভাবাবেগ বুকে ধারণ করে একটি প্রজন্ম দুর্গম গিরি, কান্তার মরু পাড়ি দিয়েছে, সেই ভাষার গুণগত সম্প্রসারণে সংঘবদ্ধ উদ্যোগ নেই। এসব কারণেও বাংলা ভাষার মানচিত্র কোথাও কোথাও ফিকে হয়ে যাচ্ছে এবং মোট হিসাবের আওতায় আসছে না।

ভোরের পাতা

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাংলা ভাষার বিকৃতি   বাংলা ভাষা   বিকৃতি  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  

সারাদেশ

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]