মিলেমিশে পূবালী ব্যাংক  লুট করছেন চেয়ারম্যান-এমডি

দেশের প্রথম প্রজন্মের পূবালী ব্যাংকে চলছে নির্বিচার লুটপাট। ব্যাংকটি চেয়ারম্যান ও এমডির যোগসাজশেই এ লুটপাট চলছে। চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে পূবালী ব্যাংকে একটি জালিয়াত চক্র গড়ে ওঠেছে। চক্রটি ঋণের নামে ব্যাংকটি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। জনগণের আমানতের অর্থের নির্বিচার লুটের মাধ্যমে দেশে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়ছেন ব্যাংকটির পরিচালকরা। পরিচালকদের লুটপাটে সর্বাত্মক সহযোগীতা করছেন এমডি আব্দুল হালিম। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ সত্ত্বেও ব্যাংকটির লুটেরা চক্র থামছে না বলে জানা গেছে। এ নিয়ে পূবালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করলেও কেউ ভয়ে মুখ খুলছে না। চাকরি হারানোর ভয়ে জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছে না ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। আবার পূবালী ব্যাংকের সৎ পরিচালকরাও জালিয়াত চক্রের বিষয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। নানা ভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে পরিচালকদের একটি অংশের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চেয়ারম্যান ও এমডির যোগসাজশে লুটপাটের ঘটনাগুলোর একটি চন্দ্রা স্পিনিং। লোকসান ও ঋণ পরিশোধে অক্ষম নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুব। জালিয়াতি করে ঋণ নেওয়ার পর খেলাপি কোম্পানির মালিকানা থেকে কাগজে-কলমে সরে এসেছেন তারা। তাদের প্রভাবের কারণে রহস্যজনকভাবে চন্দ্রা স্পিনিং মিলস্কে কাগজে-কলমে ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। উল্টো ওই খেলাপি ঋণকে সচল দেখিয়ে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আর প্রায় ৭০ কোটিতে দাঁড়ানো ওই খেলাপি ঋণের বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি।

বাংলাশে ব্যাংকের নির্দেশনার পরও এ জালিয়াতির সঙ্গে অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। জালিয়াতির এ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন এমডি আব্দুল হালিম চৌধুরী।

সূত্র মতে, ১৯৯০ সালের ১ অক্টোবর পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুবের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান চন্দ্রা স্পিনিং মিলসের নামে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখা থেকে সাড়ে চার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রায় তিন শকের পুরোনো যন্ত্রপাতির মূল্যকে উদ্যোক্তার পুঁজি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৬ বছরে ঋণটিকে দফায় দফায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। খেলাপি কোম্পানিকেই নতুন করে ঋণ ওেয়া হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া শর্ত লঙ্ঘন করে ওই ঋণের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পরিশোধিত (ফান্ডেড) ঋণ ও পরিশোধীয় (নন-ফান্ডেড) ঋণ মিলিয়ে চন্দ্রা স্পিনিংয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই অনেক পুরোনো খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পর্ষদের যোগসাজশে মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কিন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে ২০১৬ সালের শেষদিকে পূবালী ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শক ল পাঠায় ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। তদন্তে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ব্যাংকটির ঋণ কমিটি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে পরিদর্শক ল। ঋণ আায়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকায় ওই ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ ও চন্দ্রা স্পিনিংকে নতুন করে ঋণ না দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।

২০১৭ সালের শুরুতে চন্দ্রা স্পিনিংকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছয় ধরনের অনিয়মের বিবরণ তুলে ধরে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধুরীর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দেওয়া ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে ায়ায়িত্ব নিরূপণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, চন্দ্র স্পিনিং মিলসকে নতুন ঋণদান, নবায়ন বা নতুন কোনো সুবিধা না দেওয়া ও চন্দ্র স্পিনিংয়ের বকেয়া ঋণ বিদ্যমান মেয়াদের মধ্যে আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনার পর গত বছরের ৯ মে চন্দ্রা স্পিনিংকে বকেয়া ঋণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধের তাগিদ দিয়েছে। কিন্তু ঋণদানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জানা যায়, চন্দ্রা স্পিনিং মিলস একটি লোকসানি কোম্পানি। পূবালী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ১৯৯৮ সালে চন্দ্রা স্পিনিং মিলসের উদ্যোক্তা-পরিচালক ও বেবস্থাপনা পরিচালক থাকাবস্থায় ঋণখেলাপি হয় কোম্পানিটি। এরপর বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করে ওই বছরের ৬ জুন চন্দ্রা স্পিনিংয়ের প্রায় ছয় হাজার শেয়ার ‘মনির উদ্দিন’ নামে এক প্রবাসীর কাছে হস্তান্তর করেন তিনি। তারপরও আইন লঙ্ঘন করে ওই কোম্পানিটিকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পূবালী ব্যাংকের অপর পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুব চন্দ্রা স্পিনিংয়ের নির্বাহী পরিচালক। তিনিও ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি না নিয়ে চন্দ্রা স্পিনিংয়ের শেয়ার হস্তান্তর করেন।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধুরীর কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে ফোন করলে তৃতীয় দিনের মাথায় ফোন রিসিভ করেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শনিবার  ব্যাংক বন্ধের দিন। আপনি রোববার অফিস টাইমে ফোন করেন তখন কথা বলবো। 

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here