দুর্নীতি মামলার আসামি ফরিদপুর-১ আসনে নৌকার প্রার্থী মনজুর

উৎপল দাস
ফরিদপুর-১ (আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী) আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনজুর হোসেন দুর্নীতি মামলার আসামি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০৭ সালের ৮ আগস্ট তার বিরুদ্ধে মামলাটি করে। বর্তমানে মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনজুর হোসেন যে হলফনামা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন, তাতে তিনি মামলার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া হলফনামায় মনজুর হোসেন তার ও স্ত্রীর নামে থাকা স্থাবব ও অস্থাবর সম্পদের হিসাবও দিয়েছেন। নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে রাষ্ট্রোত্তর রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে থাকার বিষয়টি কোথাও উল্লেখ করেননি। 

দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ডেসকোর মালিকানা শেয়ার নিয়ম ভেঙে দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২০০৭ সালের ৮ আগস্ট শাহবাগ থানায় দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন সহকারী পরিচালক  মাহবুবুল আলম একটি মামলা করেন। মামলার নম্বর (৭৯/২০০৭)। পরে মামলাটি তদন্তের পর ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোপত্র জমা দেওয়া হয়। আসামিদের তালিকায় তৎকালীন ডেসা ও ডেসকোর বোর্ড সদস্য এবং বিটিএমসির চেয়ারম্যান মনজুর হোসেনের নাম উঠে আসে। 

অভিযোগপত্রে বলা হয়,  ডেসকো যখন কোম্পানি হয় তখন কর্মকর্তা/কর্মচারী ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্যদের জন্য আইন করে সংরক্ষিত ৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৯৮টি প্রাথমিক শেয়ার থেকে (প্রতিটির ফেসভ্যালু-১০০/-) ৬১ হাজার প্রাথমিক শেয়ার বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়েছে। এর মধ্যে মনজুর হোসেনও আছে। সে ২৪০০টি শেয়ার নিজের নামে নিয়েছে। 

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ‘বিধি বহির্ভূতভাবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের  ১০০তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে ডেসকোর বোর্ডে উপস্থিত খান লোদী সাইফুল ২২৫০টি শেয়ার, মো. মনজুরুল হোসেন ২২৫০টি শেয়ার, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ২২৫০টি শেয়ার, সালেহ আহমেদ ২৪৯৮টি শেয়ার, মনজুর হোসেন ২৪০০টি শেয়ার, কুদরত ই খোদা ২৪০০টি শেয়ার, এ এইচ এম নুরুল হুদা ১৭৫০টি শেয়ার সহ মোট ১৫৭৯৮টি শেয়ার নিজেরা নিয়েছেন এবং অবশিষ্ট শেয়ার অন্যদের দিয়েছেন। অর্থাৎ ডেসকোর বোর্ড অব ডিরেক্টররা ডিরেক্ট লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী শেয়ার ট্রেডিং এর ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশে ১০০ তম বোর্ড সভার অবতারনা করে তৎকালীন (১৫ জানুয়ারি/০৭) প্রতিটি শেয়অর ৪২৩.২৫টাকা সর্বনিম্ন বাজার মূল্যের জায়গায় ১০০ টাকা অবহিত মূল্যে ১৫৭৮৯টি শেয়ার নিয়েছে এবং বাকিগুলো অন্যদের দিয়েছে। যাতে সরকারের মোট ১০ কোটি ২০ লাখ ৮৯১ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। 

আদালত সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়নি। উচ্চ আদালতে একের পর এক শুনানির মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রাখা হয়েছে। 

এ ছাড়া মনজুর হোসেনের নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাছ চাষ, ব্যাংক থেকে সম্মানি ও সুদ থেকে তার বছরে সর্বোচ্চ আয় হয়। এ খাত থেকে তিনি বছরে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৮০ টাকা আয় করেন। এর পরেই আছে পরামর্শক খাত। এই খাত থেকে তিনি বছরে ৪ লাখ ২২ হাজার ৪০০ টাকা আয় করেন। ব্যবসাও আছে মনজুর হোসেনের। এ থেকে বছরে আয় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এ ছাড়া কৃষিখাত থেকে বছরে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। মোট ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৩৮০ টাকা।   

এ ছাড়া তার ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির অস্থাবর সম্পদের তালিকাও দিয়েছেন তিনি। যেখানে লিখেছেন, তার কাছে নগদ ৩২ লাখ ২৫ হাজার ৮৭৭ টাকা রয়েছে। স্ত্রী ডেইজি বেগম রেহানার কাছে আছে ১২ লাখ ৯ হাজার ৩২১ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মনজুর হোসেনের নামে জমা আছে ৩৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭৮ টাকা। সরকারি চাকরিজীবী স্ত্রীর নামে জমা আছে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার ৪৮১ টাকা।  তার নিজের নামে কোনো বন্ড বা কোম্পানি শেয়ার নেই। আছে স্ত্রীর নামে। পরিমাণ ৫ হাজার টাকা। 

এ ছাড়া সেভিংস সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বা স্থায়ী আমানতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত কোনো বিনিয়োগ নেই। তবে স্ত্রীর নামে ৫৯ লাখ ৪ হাজার ৩৯৫ টাকার সঞ্চয়পত্রে ও আমানতে বিনিয়োগ রয়েছে। স্ত্রীর নামে স্বর্ণালংকার রয়েছে ১৮ ভরি। অর্জনকালীন সময়ে তার মূল্য দেখিয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রার্থী ও প্রার্থীর স্ত্রী দুজন মিলে ১ লাখ ৪০ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক সমগ্রির মালিক। যার মধ্যে আছে ফ্রিজ, টিভি ও ওভেন। নিজের নামে আসবাবপত্র আছে ৬০ হাজার টাকার। স্ত্রীর নামে আছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার আসবাবপত্র। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে মনজুর হোসেনের ২৪ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকার সম্পদ রয়েছে। স্ত্রীর নামে আছে ৬ লাখ টাকা। তবে প্রার্থী ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন কোনো ধরনের মোটরগাড়ি নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসেবে স্বামী এবং স্ত্রী দুজনে মোট ১ কোটি ৮৯ লাখ ৩১ হাজার ১৫২ টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক। 

এ ছাড়া স্থাবর সম্পদের তথ্য বিবরণীতে মনজুর হোসেন বলেছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ৭৮ শতক কৃষি জমির মালিক। যার অর্জনকালীন আর্থিক মূল্য ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া স্ত্রী ডেইজি বেগম রেহানার নামে ৫৪ শতক কৃষি জমি আছে। যার অর্জনকালীন আর্থিক মূল্য ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। প্রার্থীর নামে অকৃষি জমি রয়েছে ৯ কাঠা। যখন সম্পদের মালিক হয়েছেন তখন এর আর্থিক মূল্য ছিল ১৯ লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা। স্ত্রীর নামে অকৃষি জমি আছে ৫ শতক। যার অর্জনকালীন দাম দেখানো হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া যৌথ মালিকানায় ১০ কাঠা পরিমাণ একটি জমির মালিক তিনি। কেনার দর দেখিয়েছেন ৩৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫ কাঠার মালিক তিনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here