মনোনয়নপত্র বাতিল: তর্কে নয়, আপিলেই নিষ্পত্তি হোক

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা পড়া মনোনয়নপত্রের যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে নানা কারণেই ওইসব মনোনয়নপত্রের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বাতিল বা স্থগিত হতেই পারে। এ তেমন কোনো ‘অস্বাভাবিক’ কিছু নয়। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে জমা পড়া তিন হাজার ৬৫ জন মনোনয়নপত্রের মধ্যে ৭৮৬ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী বাদ পড়ার বিষয়টি কিন্তু ব্যতিক্রম। যা মোট সংখ্যার ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এই বিপুলসংখ্যক বাদ পড়ার বিষয়টি কতটা ‘স্বাভাবিক’ আর কতটা ‘অস্বাভাবিক’ এ নিয়ে কেউ যদি যুগ যুগ বিতর্ক করতে চান তো তা চলতেই পারে। কেননা, রাজনীতিতে বিশেষ কোনো ‘তর্ক’ বা ‘বাদানুবাদ’গুলো তো এরকমই দীর্ঘ কালের পর কাল চলে যায়। উপভোগের খোরাক হিসেবেও তা ইনফিনিট টাইম চলতেই থাকে। শেষই হতে চায় না। 

আমরা দেখেছি, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। এবার সেই রেকর্ডও ভঙ্গ হয়েছে বাতিলের তালিকায় আরও অন্তত তিন শতাংশ যুক্ত হয়ে। এটা ঠিক যে, আমাদের রাজনীতি আর রাজনীতিক, এই দুয়ের সম্পর্ক এমন হয়েছে যে, যেখানে দুটো শব্দ ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বা ‘ঋণখেলাপি’ আর ‘দ-িত’ অনিবার্যভাবে লেগেই থাকে অনেকের মধ্যেই। কাজেই নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী ঋণখেলাপি বা আদালতে দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্তদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে বাধ্য নন, রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ ছাড়া মনোয়নপত্র বাতিলের ক্ষেত্রে বিলখেলাপি, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা ইত্যাদি বিষয় তো রয়েছেই। এমনকি অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যসংবলিত মনোনয়নপত্রও বাতিল বা স্থগিত হতে পারে। এমনও আছে যে, কোনো কোনো প্রার্থী তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র দেননি। আবার এমনও আছে, কোনো কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে দেওয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণের সঙ্গে শিক্ষা সনদের মিলই নেই। আবার মনোনয়নপত্রে আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও অনেক মনোনয়নপত্রে তা পাওয়া যায়নি। আবার অনেকের ভোটারের তালিকায় মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। আয়কর সনদ না থাকার কারণেও অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ভুলের মধ্যেও কি লঘু-গুরু বিবেচনা থাকবে না? আমরা দেখেছি, একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে একটি ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ডের সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা কিস্তি বাকি থাকায়। এর চেয়েও কম অঙ্কের পুরনো বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকায় মনোনয়ন বাতিল হয়েছে আরেকজন প্রার্থীর। দুজনেই বাংলাদেশের পরিচিত মুখ। আরও কিছু পরিচিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে প্রয়োজনীয় এক শতাংশ সমর্থক ভোটারের স্বাক্ষর বা ক্রমিক নম্বর না মেলায়। আমরা মনে করি, এসব ভুল ‘লঘু’ হিসেবেই দেখা উচিত।  সেক্ষেত্রে তাতে সংশোধনের সুযোগ দিলে রিটার্নি অফিসারদের চাকরি/দায়িত্ব চলে যেত বলে মনে হয় না। নতুন যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের অনভিজ্ঞতাও দেখা উচিত উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে। এক্ষেত্রে তো এই প্রশ্নও তোলা যায়, নির্বাচন কমিশন তো সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে কীভাবে মনোনয়নপত্র পূরণ করতে হয় বা মনোয়নপত্র জমা বিষয়ে স্বল্প সময়ের জন্য একটা বিশেষ কর্মশালা বা প্রশিক্ষণের আয়োজনও তো করতে পারত। যা কিনা কখনো কখনো উচ্চশিক্ষিতরাও ভুল করেন, সেখানে বিপুলসংখ্যক স্বল্পশিক্ষিত, স্বশিক্ষিত ব্যক্তি তো এমন ভুল করতেই পারেন।

ব্যাংকে টাকা তুলতে গেলেও অনেককে একবারের জায়গায় তিন বার স্বাক্ষর দিতে হয়, স্বাক্ষর না মেলায়। তবে এখানে, আমাদেরও একটা জিজ্ঞাসা, এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী যারা ঠিকমতো ফরম পূরণও করতে জানেন না, তারা কীভাবে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার মতো ‘আইনপ্রণেতা’ হওয়ার ‘সাহস’ করেন? 

তবে সে না হয় সাধারণ প্রার্থীদের প্রসঙ্গেই বলা হলো। কিন্তু এই বাতিলের তালিকায় হেভিওয়েটদের প্রসঙ্গে কী বলা যায়? তারা নিশ্চয় লঘু ভুলে বাতিলের খাতায় পড়েননি। যদি রাজনৈতিক হয় তো সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু তারা যদি আইনতই দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকেন এবং সংবিধান অনুযায়ী যদি তারা নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ থাকেন তাহলে আমরা প্রত্যাশা করব আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলুক। 

আরেকটি কথা, এরই মধ্যে মনোয়নপত্র জমা না নেওয়ায় ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারসহ ৫ ডিসি এখন ইসির কাঠগড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারা মনোনয়নপত্র জমা নেবেন না কেন? যা হোক, নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী বাছাইয়ে বাদ পড়া প্রার্থীরা তিন দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। সে মেয়াদও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এবার ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে সেসব আপিল নিষ্পত্তি করা হবে। ইতোমধ্যেই এসব বাতিল ও স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল শেষও হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ইতোমধ্যেই ৫৪৩ জন আপিল করেছেন। তার মানে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২৪৩ জন আপিল করা থেকে বিরত থেকেছেন। 

জনগণের অংশ হিসেবে আমরাও নিশ্চয়ই চাইব, একটি সর্বাত্মক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। যাতে জাতীয় নির্বাচনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা যায়। সেক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়ায় প্রার্থীর সংখ্যা যত বেশি হবে, সেই নির্বাচনের সৌন্দর্য তত বেশি বাড়বে, এ বলাই বাহুল্য। সাধারণ নির্বাচনের এই মর্মার্থ অনুধাবন করেই কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকেও এই নির্দেশনা ছিল যে, মনোনয়নপত্রে ‘তুচ্ছ’ ভুলের কারণে যেন তা বাতিল করা না হয়। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছি যে, সেই নির্দেশনা সর্বত্র প্রতিপালিত হয়নি। আমরা জানি যে, যারা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে ফরম পূরণ করেন সেখানে অনেক উচ্চশিক্ষিত লোকও ভুল করেন। কোনোটা না বুঝলে ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝে নেন। বিশেষ করে নতুনদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। এবারের নির্বাচনেও অনেক নতুন মুখ আছেন। যারা ইতিপূর্বে এ সংক্রান্ত ফরম পূরণ করেননি। এগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।  

আমরা আশা করি, বড় ভুলগুলো বাদে লঘু ভুলের গুরু দ-াদেশ রদ হবে। যাতে করে আগ্রহীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান। তবে একটা ফরম পূরণ করতেই হিমশিম খান তারা যে পার্লামেন্টে যাওয়ার যোগ্য নন, এতেই প্রমাণিত হয়। আর যা হোক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় গোটা দেশ যেখানে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, তার গুরুত্ব নির্বাচন কমিশন ও তাদের কর্মকর্তারাও কিন্তু উপেক্ষা করতে পারেন না।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here