জনতা ব্যাংক ডোবানোর পর চাকরি না থাকলেও ইউনিয়ন ব্যাংকে অফিস করছেন আমিনুর!

:: অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ::

নতুন প্রজন্মের ইউনিয়ন ব্যাংকের উপদেষ্টা ছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ডুবানোর নায়ক এস এম আমিনুর রহমান। দুই মাস আগেই ইউনিয়ন ব্যাংকে উপদেষ্টা পদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। বর্তমানে চাকরি না থাকলেও ব্যাংকটিতে নিয়মিত অফিসর করছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেও ছড়ি ঘুরাচ্ছেন আমিনুর রহমান। এদিকে, চাকরি না থাকলেও ইউনিয়ন ব্যাংকে এস এম আমিনুর রহমানের অফিস করা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। জনতা ব্যাংকে নজিরবিহীন লুটপাটের ঘটনার মূল হোতা হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে আমিনুর রহমানকে। এজন্য ইউনিয়ন ব্যাংকের পর্ষদে উপদেষ্টা হিসেবে আমিনুর রহমানের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হলেও সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে সাহস পায়নি ব্যাংকটি। 

২০০৮ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন এস এম আমিনুর রহমান। তার মেয়াদেই লুটপাটের শিকার হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। এ সময়ে জনতা ব্যাংকে সংগঠিত হয়েছে বিসমিল্লাহ গ্রুপ, এননটেক্স, ক্রিসেন্ট গ্রুপের মতো দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের ঘটনা। জনতা ব্যাংক থেকে বিদায় নিয়েই ইউনিয়ন ব্যাংকের উপদেষ্টা পদে যোগ দিয়েছিলেন আমিনুর রহমান। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত মেয়াদ ছিল তার। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আমিনুর রহমানকে আবারও উপদেষ্টা পদে নিয়োগের প্রস্তাব পাস করে ইউনিয়ন ব্যাংকের পর্ষদ। কিন্তু ওই সময়ই রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের এননটেক্স ও ক্রিসেন্ট কেলেঙ্কারির বিষয়টি সামনে আসে। ওই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে গণমাধ্যমে উঠে আসে আমিনুর রহমানের নাম। এজন্য তাকে ইউনিয়ন ব্যাংকের উপদেষ্টা পদে আবারও নিয়োগ দিতে মৌখিকভাবে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগের আবেদন জানাতেই সাহস করেনি নতুন প্রজন্মের ব্যাংকটি। অথচ চাকরি না থাকলেও এখনও ইউনিয়ন ব্যাংকে নিয়মিত অফিস করছেন আমিনুর রহমান।

চাকরি না থাকলেও অফিস করার বিষয়টি আমিনুর রহমান স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, ‘আমার এখন কোনো চাকরি নেই। বর্তমানে অবসর জীবন-যাপন করছি। তবে মাঝে মাঝে ইউনিয়ন ব্যাংকে যাই। কাগজপত্র গুছিয়ে দিতেই ব্যাংকটিতে যাচ্ছি। উপদেষ্টা পদের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে পর্ষদে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক শেষ পর্যন্ত কী করেছে, তা আমার জানা নেই।’

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা ভোরের পাতাকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক লোপাটের সঙ্গে আমিনুর রহমানের নাম আলোচিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একটি নতুন প্রজন্মের ব্যাংকে তার উপদেষ্টা পদে থাকার কোনো কারণ থাকতে পারে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মৌখিকভাবে তার মেয়াদ বাড়ানো হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। চাকরি না থাকা সত্ত্বেও আমিনুর রহমান ইউনিয়ন ব্যাংকে অফিস করলে, সেটি অপরাধ বলে গণ্য হবে।

প্রসঙ্গত, বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারিতে ২০১২ সালে ভিত নড়ে গিয়েছিল জনতা ব্যাংকের। চলতি বছরের শুরুতে ঝড় উঠেছিল এননটেক্স গ্রুপের সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি নিয়ে। তারপর উদঘাটিত হলো ব্যাংকটির ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের ৪ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি। এর বাইরেও গত এক দশকে ছোট-বড় নানা জালিয়াতির ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়েছে জনগণের অর্থে পরিচালিত ব্যাংকটি। লাগামহীন লুটপাটের কারণে বেসিক ব্যাংকের মতোই ডুবতে বসেছে জনতা ব্যাংক। রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকটির লুটপাট শুরু হয়েছিল সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম আমিনুর রহমানের হাত ধরে। ২০০৮ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। নতুন করে খেলাপির ঝুঁকিতে আছে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক এমডি এস এম আমিনুর রহমানের অপকীর্তিই জনতা ব্যাংককে ডুবিয়েছে। তার সময়ে বিতরণ করা ঋণখেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বিসমিল্লাহ গ্রুপ, এননটেক্স, ক্রিসেন্টসহ জনতা ব্যাংকের সব বৃহৎ ঋণ কেলেঙ্কারি আমিনুর রহমানের হাতে সংঘটিত হয়েছে। টানা ৭ বছর ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার দায়িত্ব পালনের সময়টিই ব্যাংকটির অন্ধকার যুগের সূচনা করেছে। এস এম আমিনুর রহমানই হলেন জনতা ব্যাংক লুটের ‘মাস্টারমাইন্ড’।

সূত্র বলছে, জনতা ব্যাংকের আজকের পরিস্থিতির শুরুটা ছিল বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারি দিয়ে। বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল পাঁচ ব্যাংক জনতা, প্রাইম, যমুনা, প্রিমিয়ার ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু এ কেলেঙ্কারির সূচনা হয়েছিল জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি এস এম আমিনুর রহমানের হাত ধরেই এ কেলেঙ্কারীর সূত্রপাত হয়। মূলত বড় কমিশনের বিনিময়ে বিসমিল্লাহ গ্রুপকে  ঋণ দিয়েছিলেন আমিনুর রহমান। গ্রুপটির কেলেঙ্কারির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন তিনি। দুদকের অনুসন্ধানে বিষয়টি ধরা পড়লেও অজ্ঞাত কারণে পরবর্তীতে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিসমিল্লাহ গ্রুপ সবচেয়ে বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে। ব্যাংকটির করপোরেট শাখা, মগবাজার শাখা ও এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে নামসর্বস্ব চারটি কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ ৬৭৮ কোটি ৪৪ লাখ ও নন-ফান্ডেড ১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গ্রুপটির কোম্পানি এমএস হিন্দোল ওয়ালি টেক্সটাইল মিলসের নামে ১৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, শেহরিন টেক্সটাইল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নামে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ, শাহরিজ কম্পোজিট টাওয়েলের নামে ২৯৮ কোটি ৩ লাখ ও আলফা কম্পোজিটের নামে ১৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের এ কেলেঙ্কারি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বরে বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমডি ও চেয়ারম্যানসহ ৫৪ জনকে আসামি করে ১২টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে গ্রুপটির এমডি, চেয়ারম্যানসহ ১৩ জনকে সবকটি মামলার আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে অন্য ৪১ জন বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন জনতা ব্যাংকের তিন শাখার ১২ জন, প্রাইমের নয়জন, প্রিমিয়ারের সাতজন, যমুনার পাঁচজন ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের আটজন ব্যাংকার। কিন্তু বেঁচে যান জনতা ব্যাংক এমডি আমিনুর রহমান।
বিসমিল্লাহ গ্রুপের চেয়েও পাঁচগুণ বড় কেলেঙ্কারির জš§ দিয়েছে এননটেক্স গ্রুপ। এস এম আমিনুর রহমানের মেয়াদেই জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন গ্রুপটির কর্ণধার মো. ইউনুছ বাদল। ২০০৭ সালে গাড়ি চোর চক্রের হোতা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া ইউনুছ বাদলকে রাতারাতি বিশিষ্ট শিল্পপতি বানিয়ে দিয়েছে আমিনুর রহমান। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত জামানতও নেই। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জামানতের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখানোর মাধ্যমেও গ্রাহককে বেশি ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন শাখার কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঋণকেলেঙ্কারির সঙ্গেও তৎকালীন এমডি আমিনুর রহমান যুক্ত ছিলেন।

জনতা ব্যাংকের তথ্যমতে, এস এম আমিনুর রহমান জনতা ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব গ্রহণের সময় ২০০৮ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। কিন্তু ৭ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৪ সালে তিনি ব্যাংকটির ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রেখে যান। আমিনুর রহমানের বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। তার দায়িত্ব পালনের সময়ই ২০১২ সালে রেকর্ড ১ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা লোকসান গোনে জনতা ব্যাংক।
 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here