মায়েরাই কী শিশুর দন্ত ক্ষয়ের কারণ?

:: ডাঃ সিফাত রহমান ::

আমাদের দেশের বেশিরভাগ মায়েদের অভিযোগ তাদের বাচ্চা খেতে চায় না। এই অভিযোগ করেন না এমন মা খুঁজে পাওয়া দায়। একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন, ৩ বছর বয়েসী ছোট্ট একটি মেয়ে সুহা। ভীষণ চটপটে এবং দূরন্ত। কিন্তু বয়সের তুলনায় গ্রোথ একেবারেই কম, লিকলিকে শুকনা। ওকে দেখেই বলে দেওয়া যাচ্ছে, ও ম্যালনিউট্রিশনে ভুগছে ।স্পষ্ট এনিমিয়ার সাইন।

ওর মায়ের কাছে হিস্ট্রি নিয়ে জানলাম, মেয়ে একেবারেই খেতে চায় না, এমনকি পছন্দের কোন খাবার ও মুখে তুলতে চায় না। খাবার খেলেও মুখে নিয়েই না চিবিয়ে সে টুপ করে গিলে ফেলে, তার মানে ও খাবার খাচ্ছে কিন্ত ওর খাবার ডাইজেস্ট হচ্ছে না, অর্ধচর্ব্য খাবার ডাইজেস্ট না হওয়াই স্বাভাবিক।

চাকুরিজীবি মা, সুহা কে চাইলেও বুকের দুধ দিতে পারেন নি, বোটল ফিডিং এর উপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে ৬ মাস বয়স থেকেই। মেয়ের ওরাল ক্যাভিটি পরীক্ষা করতে গিয়ে আঁতকে উঠলাম। উপরের সামনের দাত গুলো ক্ষয় হয়ে ক্রাউনের অংশ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। যেটা বুঝলাম বাচ্চার এই অপুষ্টির অন্যতম কারণ সে খেতে পারছে না, তাকে দুধ, ডিম, ফলমূল সবকিছু দিয়েই চেষ্টা করা হলেও সামনের দাঁতগুলো ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় ইচ্ছা থাকার পরেও সে খাবার খেতে পারছে না।

এখন আসি কারণ খুঁজতে। কেন এমন হল। এক কথায় বলতে গেলে নার্সিং বোতল ক্যারিজ কিংবা ছয়মাস বয়স থেকে বাচ্চাদের দুধদাঁত উঠা শুরু হয়। বেশিরভাগ চাকুরিজীবি মায়েরা তাদের বাচ্চাকে অভ্যস্ত করেন ফিডিং বোটলে। বাচ্চা মুখে বোটল লাগিয়ে ঘুমিয়ে যায়, মা নিশ্চিত থাকেন যে বাচ্চা সুস্থ আছে। কিন্তু এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ আসুন দেখি। বেবি বোটল ক্যারিজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপরের

মাড়ির সামনের দাঁতে হয়।কিন্তু কেন?

-রাতে ঘুমানোর সময় দীর্ঘক্ষণ বাচ্চার মুখে দুধ কিংবা সুগার ফ্লুইডের সংস্পর্শে থাকলে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে
- Dr. Harold Torney Ges Dr. Brian Palmer নামক দুজন ডেন্টিস্ট গবেষণা করে দেখেন যেসব শিশু মায়ের বুকের দুধ খায় সেসব শিশুদের মধ্যে নার্সিং বোতল ক্যারিজের প্রবণতা একেবারেই নেই বললেই চলে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কেন ব্রেস্টফিডিং এ ক্যারিজ হবার চান্স কম? 

বাচ্চারা এক্টিভলি সাকলিং প্রসেসের মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধ গ্রহণ করে, যে কারণে দীর্ঘক্ষণ ধরে বাচ্চার মুখে দুধ জমে থাকার কোন সুযোগ নেই, মুখের ভিতরে সেটা জমে থাকার আগে swallow করে ফেলে। কিন্তু বোটল ফিডিং এর সময় বাচ্চা এক্টিভলি সাক না করলেও বোটল থেকে দুধ গিয়ে জমা হয় বাচ্চার ওরাল ক্যাভিটিতে এবং সেটা ‘পুল’  ইফেক্ট তৈরী করে বাচ্চার মুখে। যখনই বাচ্চার মুখে মিল্ক কিংবা সুগার ফ্লুইডের পুল তৈরী হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ সময় ধরে, এ অবস্থায় streptococcus mutans ব্যাকটেরিয়াসহ ক্যারিজের জন্য দায়ী অন্যান্য ব্যক্টেরিয়ার তখন পোয়াবারো! বদখত ব্যাক্টেরিয়া পেয়ে যায় তার কাংখিত পরিবেশ।

ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ল্যাকটিক এসিড তৈরী করার জন্য সুগার এনরিচ এক চমৎকার অনুকুল পরিবেশ তারা পেয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড। ফলাফল গিয়ে শেষ হয় দাঁতের ক্ষয়ে।‘নার্সিং বোটল ক্যারিজ’ এ বাচ্চাদের আপার এন্টেরিওর টিথ এফেক্ট হয় কারণ এই দাঁতগুলোতেই ‘পুল ইফেক্ট’ এর সরাসরি যোগসাজেশ থাকে পিছনের অন্য দাঁতগুলোর তুলনায়।

আবার অনেক সময় মায়েরা অতি ভালোবাসায় বাচ্চার মুখে চুমু খান, মায়ের স্যালাইভা চলে যায় বাচ্চার মুখে,অথবা বাচ্চার খাবার হয়তো নিজে চিবিয়ে বাচ্চার মুখে তুলে দেন মা! ভয়ংকর খুব ভয়ংকর এই ব্যাপারগুলো! মা বুঝতে পারছেন না বেশি ভালোবাসায় বাচ্চার ক্ষতি করছেন তিনি! স্যালাইভা টু স্যালাইভা কন্টাক্টে বাচ্চার মুখে চলে যাচ্ছে মা কিংবা কেয়ারগিভারের মুখের ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া।

সচেতন থাকতে হবে এই ব্যাপারেও। এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং (বোতল ফিডিং না করানো বা জুস না খাওয়ানো) ও তখন বাচ্চাকে দাত নস্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবে না। অনেক ক্ষেত্রে জেনেটিক প্রিডিজপোজড বেবিদের এনামেল স্ট্রাকচারে ডিফেক্ট থেকে থাকে (soft, fragile enamel)। সেক্ষেত্রে টুথ ডিকে প্রতিরোধ করতে ব্রেস্টফিডিং ও কোন সমাধান আনতে পারে না।

এক্ষেত্রে সমাধানঃ নিয়মিত দাত ব্রাশ এবং ওরাল হাইজিন মেইন্টেন করা, ফ্লোরাইড যুক্ত ডায়েট, ফ্লোরাইড জেল টপিক্যালি ব্যাবহার করা। রুটিনলি বাচ্চার ডায়েট মেইন্টেন করা, বাচ্চা চাইলেই বাচ্চার মুখে দুধ কিংবা জুস দেবেন না।চামচে করে খাওয়ানোর অভ্যাস করা, প্রতিবার খাবার খাওয়ানোর পর কুলি করানোর অভ্যাস করা, দরকার হলে বাচ্চাকে এক সিপ পানি খাইয়ে দিন, এতে করে ওরাল ক্যাভিটিতে খাবার জমে থাকবে না।

নিয়ম করে দুবেলা ব্রাশ তো করাতেই হবে বাচ্চার প্রথম দাঁত মুখে উঁকি দেওয়ার দিন থেকেই।নরম ব্রিসলের ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে, মটরদানা পরিমাণ পেস্ট ব্রাশে লাগিয়ে আস্তে আস্তে ব্রাশ করাতে হবে যাতে কোন ভাবেই বাচ্চার মাড়িতে আঘাত না পায়। সবচেয়ে বড় কথা এসব সমস্যা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব ডেন্টিস্টের শরনাপন্ন হওয়া উচিত।নিয়ম করে বছরে দু’বার শিশুকে নিয়ে ডেন্টিস্টের কাছে যান, ওরাল চেকাপ করিয়ে আনুন।

জেনে রাখা ভালো টুথ ডেভলপমেন্ট শুরু হয় ভ্রুণ মায়ের পেটে থাকা থাকা অবস্থায় ছয় থেকে সাত সপ্তাহের মধ্যে। আপনার শিশুর দাঁত কেমন হবে তা নির্ভর করে মা গর্ভাবস্থায় কতটা সচেতন সেটার উপর। ফ্লোরাইড এবং ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার নিয়মিত সেবনের মাধ্যমে মা পেতে পারেন সুস্থ দাঁতের সুস্থ শিশু। কি ভাবছেন তো দুধ দাঁততো পড়েই যাবে, এত মাথা ব্যথার কি আছে! জী মাথা ব্যথার আছে।কি বুঝলেন?

আকাবাঁকা উঁচুনিচু দাঁতের পিছনে মূল কারণ কিন্তু শৈশবের সেই ‘দাঁতের পোকা’। কত অবলীলায় সেটা বাবামায়ের চোখ এড়িয়ে যায় কিন্তু সন্তানকে সেটা বয়ে বেড়াতে হয় বাকী জীবন। শিশুকে নিয়ে আর অর্থোডন্টিস্টের কাছে ছুটতে হবে না যদি বাবা মা শুরু থেকেই সচেতন থাকেন। আর তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়াই ভালো

লেখক: ডাঃ সিফাত রহমান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here