কুসংস্কারের কারণেই মরছে উপকারী ‘গিরগিটি’

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

এরা সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী। পৃথিবীতে প্রায় একশ ষাট প্রজাতির বহুরূপী গিরগিটির দেখা মেলে। বহুরূপী গিরগিটি নিজেদের গায়ের রং পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু তারা তাদের শরীরের রং যে বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বদলায়, তা নয়।

এমনকি তারা ইচ্ছা মতো যেকোনো রংও ধারণ করতে পারে না। প্রত্যেকেই কিছু নির্দিষ্ট রং ধারণ করার সীমাবদ্ধতা আছে। প্রধানত গিরগিটির মনের অবস্থার ভিত্তিতে তাদের গায়ের রং বদলায়। যেমন_ ভয় অথবা রাগ। নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করতে এটি খুব জরুরি।

এরা খুব তাড়াতাড়ি চলাচল করতে পারে না, তাই খাবার সংগ্রহের জন্য এরা জিহ্বার উপর বেশি নির্ভরশীল। এরা জিহ্বাকে মুখ থেকে অনেক দূরে লম্বা করতে পারে। জিহ্বার সামনের অংশ বেশ আঠালো। ফলে কোনো খাদ্যদ্রব্য জিহ্বার সংস্পর্শে চট করে আটকা পড়ে যায়। তারপর ঘপাৎ করে মুখে পুরেই এরা পেটে চালান করে দেয়। 

এই প্রাণীটিই আমাদের প্রকৃতির পরম বন্ধু। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে আমাদের শাক-সবজিক্ষেতে বা আমাদের গাছগাছালিপূর্ণ বাগানে সুরক্ষা দেয়।

অথচ আমাদের দেশে ‘রক্তচোষা’ নামক ভুল নামটির করণেই প্রাণ হারাচ্ছে প্রকৃতির জন্য উপকারী এ প্রাণীটি। আতঙ্কিত লোকজন দেখামাত্রই ইটচাপা কিংবা লাঠির আঘাতে মেরে ফেলে এই সরীসৃপ প্রজাতিকে।

এই উপকারী গিরগিটির ইংরেজি নাম Common Garden Lizard এবং বৈজ্ঞানিক নাম Calotes versicolor । এর লেজসহ দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৭ সেন্টিমিটার।
 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বন্যপ্রাণি গবেষক ড. কামরুল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, স্থানীয়ভাবে অনেকে এটাকে ‘রক্তচোষা’ বলে। আমরাও ছেলেবেলায় একে জেনে এসেছি এটা রক্তচোষা এবং এর আশপাশ দিয়ে কেউ গেলে তার রক্ত চুষে নিয়ে লাল হয়ে যায়-এ কুসংস্কারের কারণেই লোকজন এটাকে দেখলেই মেরে ফেলে।
 
তিনি আরও বলেন, যদিও এ গিরগিটি সারাদেশেই পাওয়া যায় কিন্তু এই কুসংস্কারজনিত হত্যার কারণে এই প্রাণি অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই প্রাণিটির রক্তচোষার ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভুল। এর কোনো প্রকার বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই। কোনো প্রাণীই দূর থেকে মানুষের রক্ত চুষতে পারবে না।
 
রক্তচোষা নামক ভুল নামের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ প্রাণীটির শরীর হঠাৎ করে লালবর্ণের হয় বলে মানুষ ভুলভাবে তার নাম দিয়েছিল রক্তচোষা। এ লাল হয়ে উঠার কারণটি হলো- এই প্রাণীটা যখন কোনো কারণে বিপদগ্রস্থ হয় বা যখন যে চারপাশকে তার হুমকি মনে করে তখন সে খুব দ্রুত তার ঘাড় থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত অবস্থিত মেলামিনগুলোকে পরিবর্তন করে লালবর্ণ ধারণ করে ফেলে। যেহেতু লাল হচ্ছে একটি এলার্মিং কালার; তাই গিরগিটির শরীর দেখে বিভিন্ন শিকারি প্রাণী ওর থেকে দূরে সরে যায়। এই লাল রঙ তৈরি করে সে শত্রুকে ভয় দেখায়।

প্রজনন মৌসুম সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রজনন মৌসুমে এক পুরুষ গিরগিটির সঙ্গে অন্য পুরুষ গিরগিটির প্রতিযোগিতা হয়। পুরুষ গিরগিটিরা এভাবে শরীরের ভেতর থাকা মেলামিনগুলোকে লাল রঙে পরিবর্তন করে তার স্ত্রী গিরগিটির কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলে। তার সঙ্গিনীকে ভুলানোর জন্যই প্রজনন ঋতুতে সে তার শরীর লাল করে ফেলে।
 
এ প্রাণীটিকে দেখে ভয়ের কোনো কারণ নেই। এটি পুরোপুরিভাবে আমাদের পরিবেশের উপকার করে। এর প্রধান খাবারই হলো পোকামাকড়। ওরা ওইসব পোকামাকড়ই খায় যেগুলো শাকসবজির ক্ষতি করে। এরা পতঙ্গ দমনে বিরাট ভূমিক পালন করে চলেছে-বলেন বন্যপ্রাণি গবেষক ড. কামরুল হাসান।

কিছু অদ্ভূত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের জন্যই বহুরূপী গিরগিটি আমাদের কাছে এত জনপ্রিয়। অন্য সব সরীসৃপের মতো এরাও বুকে ভর দিয়ে হাঁটে। এদের চারটি পায়ে পাঁচটি করে আঙুল থাকে; কিন্তু অন্যান্য সরীসৃপের মতো এদের আঙুল জোড়া লাগানো নয়। বরং এরা আঙুলের সাহায্যে মানুষের মতো যেকোনো জিনিস শক্ত করে ধরে রাখতে পারে। এদের লেজও যেকোনো জিনিস অাঁকড়ে ধরে রাখতে পারে। গাছের উপর ওঠার সময় লেজের সাহায্যে এরা গাছের ডাল ধরে রাখে। তাহলে বোঝ, লেজ ওদের জন্য কতটা দরকারি। এজন্য কোনো কারণে লেজ কেটে গেলেও টিকটিকির মতো আবার এদের লেজ গজাতে শুরু করে। বহুরূপী গিরগিটির চোখ অন্য সরীসৃপের চোখের চেয়ে আলাদা।

প্রত্যেক চোখে একটি শক্ত ঢাকনা থাকে, যার মধ্যে শুধু একটি ছোট্ট গোল খোলা জায়গা থাকে, যাতে চোখের মণিটি অবস্থান করে। এরা চোখের সাহায্যে শরীরের দুই পাশে অবস্থিত দুটি আলাদা জিনিস একইসঙ্গে দেখতে পারে। এদের শরীরের চারপাশে এরা ৩৬০ ডিগ্রি পরিমাপে সবকিছু দেখতে পায়।

 

/কে

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here