ভোরের পাতার সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনছে সরকার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

গত ২৮ আগস্ট দৈনিক ভোরের পাতা অনলাইন ভার্সনে এবং ২৯ আগস্ট পত্রিকাটির প্রিন্ট ভার্সনে ‘বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচার বন্ধ হচ্ছে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এনবিআরকে এ সংক্রান্ত একটি ট্রাস্কফোর্স সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।  শুধু সিঙ্গাপুরই নয়, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি হওয়া ৩৩ টি দেশ থেকেই অর্থ ফেরত আনার কাজ শুরু হয়েছে। 

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কেও এনবিআরের সাথে কাজ করার জন্য বলা হয়েছে। 

২৮ আগস্ট প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, সিঙ্গাপুরের এন্টি মানি লন্ডারিং এন্ড কাউন্টারিং দ্যা ফিনান্সিং অব টেরোরিজম ইন্ড্রাটি পার্টনারশিপ (এসিআইপি) সম্প্রতি এক সেমিনারের আয়োজন করে। সিঙ্গাপুরের অর্থ বিভাগ, কর্মাশিয়াল এ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট, এসোশিয়েশন অব ব্যাংকস ইন সিঙ্গাপুর (এবিএস) এবং ৮ টি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের কর্মকর্তারা অর্থপাচার রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে দুটি পেপার উপস্থাপন করেন। 

‘লিগ্যাল পারসন-মিসইউস অব টাইপোলজিস এ্যান্ড বেস্ট প্যাকটিসেস এবং বেস্ট প্যাকটিসেস ফর কাউন্টারিং ট্রেড বেসড মানি লন্ডারিং’ এই দুটি পেপার উপস্থাপন করা হয়। 
উপস্থাপিত পেপার দুটোতে সিঙ্গাপুরে  এন্টি মানি লন্ডারিং এন্ড কাউন্টারিং দ্যা ফিনান্সিং অব টেরোরিজম ইন্ড্রাটি পার্টনারশিপ (এসিআইপি)  দেশটিতে অর্থ পাচার করে ব্যবসায়ে বিনোয়োগ বন্ধের পক্ষে ‍যুক্তি দিয়েছে। 

বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত দিতেও আগ্রহী দেশটি। এমনকি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার বিষয়েও সহায়তা করবে এই দুই পেপারে উপস্থাপিত সুপারিশগুলো। 

পেপারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১০ বছরে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে। এ পাচারের বেশির ভাগই গেছে সিঙ্গাপুরে। সেক্ষেত্রে অবৈধ চ্যানেলে টাকা যাওয়ায় বাংলাদেশ এবং সিঙ্গাপুরের মধ্যে স্মরণকালের সবচে বড় বাণিজ্য ঘাটতিও দেখা দিয়েছে।  ৪৭ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সঠিক ব্যাকিং চ্যানেলে টাকা লেনদেন না হওয়াতেই এমনটি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সেমিনারের বক্তারা।

সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ দুটিতে পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস, ইন্টারন্যাশনাল কনসোরটিয়াম অব জার্নালিস্টস (আইসিআইজি), গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইনট্রিগিটি গত কয়েক বছরে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর কয়েকটি দেশে অর্থ পাচার নিয়ে কাজ করেছে। সেখানে অভিযুক্তদের তালিকায় রাজনীতিবিদ, সেলিব্রেটি এবং ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে। 
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।  বাংলাদেশের অর্থপাচার রোধে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)কে  গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইনট্রিগিটি এবং সুইস ব্যাংক গত কয়েক বছর আগেই জানিয়েছে, বাংলাদেশিদের বিদেশী একাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন হচ্ছে। 

এদিকে, বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) বলেছে, বাংলাদেশ থেকে ৮০ শতাংশ অর্থ পাচার হয় ব্যাংকিং চ্যানেলে। ভুয়া এলসি (লেটার অব ক্রেডিট), ইনভয়েস এবং শিপমেন্টের দলিল দিয়ে এ ধরণের পাচার চলছে। 

সিঙ্গাপুরের এন্টি মানি লন্ডারিং এন্ড কাউন্টারিং দ্যা ফিনান্সিং অব টেরোরিজম ইন্ড্রাটি পার্টনারশিপ (এসিআইপি) বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে কিছু সুপারিশ করেছে। সেগুলোর মধ্যে যেসব বাংলাদেশি নাগরিক সিঙ্গাপুরে বিনিয়োগ করবে তাদের বিষয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন পড়বে। তাহলে বৈধভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে বিনিয়োগ হবে দু’দেশের মধ্যে। তা না হলে দিনের পর দিন বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তেই থাকবে। 

তবে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অর্থ পাচার রোধে আরো বেশি সজাগ দৃষ্টি রাখারও কথা বলা হয়েছে এন্টি মানি লন্ডারিং এন্ড কাউন্টারিং দ্যা ফিনান্সিং অব টেরোরিজম ইন্ড্রাটি পার্টনারশিপ (এসিআইপি) আয়োজিত সেমিনারে।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে পাচারকৃত টাকা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ৩৩ টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। আরো ১৭ টি দেশের সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যেই চুক্তি করা হবে। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের ট্রাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা সিঙ্গাপুর সরকারের পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার স্বদিচ্ছার কথা জানানোর পরই তারা কাজ শুরু করেছেন। এমনকি শুধু সিঙ্গাপুর নয়, অর্থ পাচার হওয়া বিভিন্ন দেশে ট্রাস্কফোর্স কর্মকর্তারা সেখানে অবস্থান করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছেন। 

উল্লেখ্য, গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া ২ দশমিক ৫০ লাখ মার্কিন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, রোমানিয়া, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, মরিশাস, দুবাই, বাহরাইনসহ আরো কয়েকটি দেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে কাজ শুরু করেছে ট্রাস্কফোর্স

বিদেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে বিদ্যমান আইনে আরো কঠোর হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, এন্ডি মানি লন্ডারিং আইন এবং চুক্তির ফলে বাংলাদেশ এখন ট্রাস্কফোর্সের মাধ্যমে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।  ইতিমধ্যে অর্থ পাচার হওয়া দেশগুলোর সাথে আলোচনা চলছে এবং খুব দ্রুতই ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি)’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ নিয়েছে। পাচারকৃত টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং দুদকের সমন্বয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সেটা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি। 

পলিসি রিসার্চ ইনিস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এহসান এইচ মনসুর বলেন, শুধু টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমেই বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা সম্ভব নয়। এজন্য রাজনৈতিক সরকারের স্বদিচ্ছা থাকাটাও জরুরি। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) সিনিয়র ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের উচিত পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়নের দিকে বেশি নজর দেয়া। পানামা পেপারর্স কেলেংকারিতে যাদের নাম এসেছে তাদের সবার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। তাহলেই পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে। 

উল্লেখ্য, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি বিদেশে পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here