গোয়েন্দা নথির বঙ্গবন্ধু : কয়লার খনিতে খুঁড়ে পাওয়া হীরার উজ্জ্বল আলো

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

অবশেষে আলোয় এলো আলোকিত হয়ে গোয়েন্দা নথির বঙ্গবন্ধু। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশভাগ-উত্তর স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরু পর্যন্ত দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে যে নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন তা আজ অবিসংবাদিত। কিন্তু দীর্ঘ ২৪ বছরে তার এই সংগ্রামী জীবন স্বাভাবিক কারণেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এ জন্য তাকে অনেক চড়াই-উৎরাই পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তাকে ফাঁদে ফেলতে জায়গায় জায়গায় বিছানো হয়েছিল গোয়েন্দা জাল। যে-জালে ফেলে পাকিস্তান ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ (আইবি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিদিনের কর্মকা- পর্যবেক্ষণ করত। গোয়েন্দা সংস্থাটি তাদের এই পর্যবেক্ষণ সংরক্ষণ করত বঙ্গবন্ধুর নামে খোলা একটি ফাইলে। সেই গোয়েন্দা নথিগুলোর সংকলন নিয়ে এবার প্রকাশিত হলো ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ শীর্ষক একটি বই। গত শুক্রবার বিকেলে গণভবনে এক অনুষ্ঠানে ১৪ খণ্ডের এই সংকলনের প্রথম খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংকলনটি প্রকাশ করতে পেরে গর্বিত হওয়ার সুযোগ পেল দেশের অন্যতম প্রকাশনী সংস্থা হাক্কানি পাবলিশার্স।

এপ্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) যা করে গেছেন তার অনেক কিছুই আমরা এই রিপোর্টের মধ্য দিয়ে পাব। এই রিপোর্টগুলো তার পক্ষের কিছু না। সবই তার বিরুদ্ধের রিপোর্ট। কিন্তু এই বিরুদ্ধের রিপোর্টগুলোর মধ্য থেকেই আমার মনে হয় আমরা সব থেকে মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করতে পারব। যেমনÑ কয়লার খনি খুঁড়ে খুঁড়ে তার মধ্য থেকে হীরা বের হয়ে আসে, হীরার খনি পাওয়া যায়। আমার মনে হয়েছে ঠিক সেভাবেই যেন আমরা হীরার খনি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। বইটি সকলের হাতে তুলে দিতে পারলাম যেন বাংলাদেশের মানুষ সব জানতে পারে।’

এটা এমন একটা ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে, যে দলিলটিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রিপোর্টের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতিটি কর্মকা-, গতিবিধি, তিনি কোথায় গিয়েছেন, কী করেছেন, সেসবের অনেক তথ্য ঠাঁই পেয়েছে। এ ছাড়া যে সমস্ত চিঠিপত্র বঙ্গবন্ধুর কাছে গেছে সেগুলোর অধিকাংশই বাজেয়াপ্ত করা ছিল। অনেক চিঠি তিনি দিয়েছেন সেগুলো হয়তো প্রাপকের কাছে কোনোদিনই পৌঁছায়নি। কিন্তু সে চিঠিগুলো এখানে পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের যে সংগঠনটা ১৯৪৯ সালে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এখানে আওয়ামী লীগের পুরনো অনেক নেতাকর্মীর নাম পাওয়া যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু তাদের কাছে চিঠি লিখেছেন। ১৯৬৬ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিষয়েও তথ্যগুলো আছে। এর সবই এই দলিলে প্রকাশ পেয়েছে। এখন আমরা কয়লা খনি থেকে পাওয়া এই উজ্জ্বল হীরকরূপ বইটি থেকে বহু অজানা তথ্য জানতে পারব যা থেকে তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের স্বরূপ আরো বেশি উন্মোচিত হবে। তারা কীভাবে বাংলার মানুষকে ‘দাবায়ে’ রাখতে কত গোয়েন্দা জাল ফেলে রেখেছিল তার সব কিছুরই ধারণা পাওয়া যাবে এই বইটি থেকে। 

বঙ্গবন্ধুর লেখা নিয়ে আরো দুটি বই বের হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তার লেখা আরো দুটি বই বের হবে। তিনি ১৯৫২ সালে চীন ভ্রমণ করেছিলেন। সেটাও প্রায় প্রস্তুত আছে। আমরা সেটা শিগগিরই বের করতে পারব। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে কারাগারে বসে তিনি স্মৃতিকথা বলে নিজের কিছু আত্মজীবনীও লিখেছিলেন। যা অনেকটা অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সঙ্গে মিলে যায়, সেখানেও আরো আরো অনেক অজানা তথ্য। এগুলোও প্রকাশ হয়ে আসছে শিগগিরই। এ দেশের শত্রুরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম চিরতরে বিলুপ্ত করে দিতে চেয়েছিল। সে লক্ষ্যে সপরিবারে তাকে হত্যা করেছিল। কিন্তু সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না, সেটাই আজ প্রমাণ হয়েছে। আর এই নাম আজ শুধু বাংলাদেশে না, সারা বিশ্বে উজ্জ্বল।

আজকে বিশ্ব ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, যে নাম অমর হওয়ার জন্যই জন্ম নিয়েছে তা মুছে ফেলার সাধ্য কার আছে? কারোরই নেই। তাই তো আজ একে একে বঙ্গবন্ধুর অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসছে। ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশ পেয়েছে। এবার এলো ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বা গোয়েন্দা নথির বঙ্গবন্ধু নামে প্রথম খণ্ডের আরো একটি বই। যা ১৪ খণ্ডের প্রকাশিত হবে। আমরা বইটির দেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রচার ও সাফল্য কামনা করি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here