বৈশ্বিক সূচকে ঢাকা কবে ‘কল্লোলিনী তিলোত্তমা’ হবে!

বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে আবারও সারা বিশ্বের শহরের মধ্যে একেবারে তলানিতেই রয়ে গেল। গত মঙ্গলবার এমনই তথ্য উঠে এসেছে। ফি বছরই বিশ্বের বাসযোগ্য নগরের তালিকা তৈরি করে দি ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা বিভাগ দি ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। ‘বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক’ শিরোনামে এটি প্রকাশিত হয়।

গত মঙ্গলবার ২০১৮ সালের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বাসযোগ্য নগরের তালিকায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। ঢাকার পরে অর্থাৎ তালিকার সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা। আর এটা নির্ণয়ে কোনো রাজনৈতিক অভীপ্সাও কাজ করে না সংস্থাটিতে। বাস্তবসম্মত বেশ কিছু মানদণ্ডের নিরিখেই এই তালিকা প্রণয়ন করা হয়ে থাকে।
আর এটা একনজর চোখ বুলালেই দেখা যাবে যে, ঢাকা মহানগরে যানবাহনের কীরকম লাগামছাড়া বাড়বাড়ন্ত অবস্থা। ফিটনেসবিহীন হাজার হাজার গাড়ির কালো ধোঁয়া কীভাবে গিলে খাচ্ছে নগরীকে। এত আছেই অন্যদিকে বিভিন্ন নির্মাণকাজের কারণে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা কোনোটাতেই যেন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রচেষ্টাও যেন নেই। আশঙ্কাজনক এ বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর। সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ১৭২ মাইক্রোগ্রাম। অথচ জাতীয়ভাবে পিএম ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও ভালো নয়। মশাবাহিত রোগ; যেমন চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু প্রভৃতির ঝুঁকিতে রয়েছে এ  নগরবাসী। পয়ঃনিষ্কাশনের অবস্থাও শোচনীয়। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ঢাকার মলমূত্রের মাত্র ২ শতাংশের নিরাপদ নিষ্কাশন হয়। বাকিটা মিশে যায় প্রকৃতিতে, জলীয় বাষ্পে। বিবিএস ও ইউনিসেফের তথ্য মতে, ঢাকায় সরবরাহ করা পানির দুই-তৃতীয়াংশে মলবাহিত জীবাণু থাকে। এটি জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় ঝুঁকি। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভালো নয় বলে একটু বৃষ্টি হলেই স্যুয়ারেজ, ড্রেন আর পাইপের পানি একাকার হয়ে যায়।

বিরতিহীন খোঁড়াখুঁড়িতেও এ দূষণ অব্যাহত থাকে। আর বর্ষাকালে যে জলাবদ্ধতা দেখা দেয় তা থেকে তো আদৌ নিস্তারের কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ঘণ্টাখানেকের টানা বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় ঢাকার রাস্তাঘাট, অলিগলি। ফলে ভোগান্তির সীমা থাকে না নগরবাসীর। বাসযোগ্যতার সূচকে এসব বিবেচনাই তো যথেষ্ট। আরো তো আছেই। যেমন স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো এসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে ‘বৈশ্বিক বাসযোগ্যতাসূচক’ তৈরি করা। এসবের মধ্যে মোট ৩০টি সূচক রয়েছে। গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের কারণে দামেস্ক তালিকার সর্বনিম্নে রয়েছে। এসব সমস্যা না থাকার পরও প্রায় সব মানদ-েই ঢাকা পিছিয়ে আছে; স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোতেই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। আর তাইতো মোট ১০০ স্কোরের মধ্যে ঢাকার স্কোর মাত্র ৩০।

এখন এ থেকে উত্তরণের উপায় কি! এ জন্য নগর পরিকল্পনায় আরো বাস্তবমুখী হতে হবে আমাদের। ঢাকার উভয় সিটি করপোরেশনকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি সূচক খতিয়ে দেখে এবং তা থেকে উত্তরণের পথ বাৎলে উন্নত জীবনযাত্রার পথে এগিয়ে নিতে হবে এই স্বপ্নের ঢাকাকে। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে’। কিন্তু এই স্বপ্ন ঢাকার ক্ষেত্রে দেখতে দোষ কি!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here