স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা আওয়ামী লীগই দিতে পারে

  • ২৬-মার্চ-২০১৯ ০৭:২৩ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

নৈসর্গিক রূপ, কল্পচিত্র আর মানুষের বিচিত্র চিন্তা-চেতনা লিপিবদ্ধ করার কাজটি বেশ কঠিন। আর গণিতশাস্ত্র, ব্যাকরণ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভবত কঠিনতর কাজ। কিন্তু মানুষের হূদয় যে এক বিশাল ক্যানভাস। এই হূদয়, মা-মাটি-মানুষ নিয়েই আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি যেমন ভাষার মাস, তেমনি মার্চ স্বাধীনতার মাস। আমরা প্রতিবছর মার্চের ছাব্বিশ তারিখে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালন করে থাকি। মার্চ মাস এলেই স্বাধীনতা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় গণমাধ্যমে আলোচনায় উঠে আসতে থাকে। এসব বিষয়ের মধ্যে যেমন থাকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ, তেমনি থাকে স্বাধীনতার সীমারেখা প্রভৃতি তাত্ত্বিক বিষয় সম্পর্কে, তেমনি আবার এর সঙ্গে আরও থাকে আমাদের অর্জিত স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গতা বা অপূর্ণাঙ্গতা সম্পর্কে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে সে সংগ্রাম শুরুর পটভূমির কথা। কিন্তু তারও আগে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে স্বাধীনতা হারানোর কথা। ইতিহাসের কোন্ পটভূমিতে কীভাবে কী কী কারণে আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম তা না জানতে পারলে স্বাধীনতা বা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অধ্যয়ন অর্থবহ ও সার্থক হয়ে উঠতে পারবে না। পলাশী বিপর্যয়ের মাধ্যমেই যে আমরা আমাদের স্বাধীনতা নামক জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হারিয়েছি এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু কাদের কারণে সেদিন আমাদের জাতীয় জীবনের এ মহাবিপর্যয় নেমে আসে তার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা নেই। আমরা শুধু এটুকুই জানি যে, পলাশীর যুদ্ধে ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান এবং অন্য কতিপয় আমত্যের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়বরণের মধ্য দিয়ে এদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ইংরেজদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, আর আমরা জাতি হিসেবে হয়ে পড়ি পরাধীন। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় আমরা ইংরেজদের কাছে সেদিন স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম, এটা আমরা জানি। কিন্তু এর পেছনে মীরজাফরের সহযোগী হিসেবে আর কার কার কী ভূমিকা ছিল, তার কতটা আমরা জানি? এতদিন যাই প্রচার করা হোক এখন তো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ক্রুসেডের ঐতিহ্যবাহী ইংরেজদের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যের নামে এদেশে এসে প্রথমেই যোগাযোগ স্থাপন করে মুসলিমবিদ্বেষী মারাঠা এবং বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারের রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও উমিচাঁদ প্রমুখ অমুসলিম অমাত্যদের সঙ্গে।

আমরা একটু আগে যে ‘ক্রুসেড’ শব্দ ব্যবহার করেছি তার একটা ব্যাখ্যা দরকার। ক্রুসেড কি? এক কথায়, ক্রুসেড অর্থ ধর্মযুদ্ধ। তবে ইতিহাসে ১০৯৫ সাল থেকে ১২৭১ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন থেকে মুসলমানদের বহিষ্কৃত করতে খ্রিস্টানরা বারবার যে যুদ্ধ চালায়, তা-ই ক্রুসেড নামে খ্যাত হয়ে আছে। প্রধানত ইউরোপ থেকেই এই যুদ্ধ চালনা করা হয় এবং এতে ইংরেজদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ক্রুসেডাররা তখন তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলেও পরবর্তীকালে ইউরোপীয় তথা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হয়ে দাঁড়ায় ছলে-বলে-কৌশলে মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতাকে দুর্বল ও ধ্বংস করে দেয়া। শুধু পলাশীর বিপর্যয়ের মাধ্যমেই সাম্রাজ্যবাদ তাদের মুসলিমবিরোধী ক্রুসেডীয় ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়নি, সারা বিশ্বব্যাপী তাদের সে লক্ষ্য আজও সক্রিয় রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখতে হলে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের সত্য-সঠিক কথা লিখতে হবে, কিন্তু আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি মুক্তিযুদ্ধের জয়যাত্রার পক্ষে নয়। আমরা বাঙালিরা অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ করেছি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজব্যবস্থার জন্য। বাংলার ও বাঙালি জাতির স্বাধীনতার এবং জাতির মুক্তির এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য দুরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নির্ভীক ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার দরকার এবং অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে, যার দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই। পৃথিবীর যতগুলো দেশ স্বাধীন হয়েছে সেগুলোর প্রতিটিরই নেতৃত্বে ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক অবিসংবাদিত নেতা। 

তেমনি বাঙালি জাতির একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন: "আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। তিনি এমনও বললেন- আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট, কাচারি, আদালত, ফৌজদারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেক্রেটারিয়েট সবকিছু অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।" ঠিক তাই হয়েছে।

স্বাধীনতা যে কোনো জাতির পরম আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ, গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ গঠন, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, জানমালের নিরাপত্তা বিধান, ধর্ম পালন, নিজস্ব সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-বিশ্বাসের অবারিত চর্চা নিশ্চিত করা ইত্যাদি সাধারণ জাতীয় আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিটি জাতির জন্য অপরিহার্য। 

আজ থেকে ৪৫ বছর আগে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি অনেক সংগ্রাম-আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে। দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে অস্তিত্বময় হয়েছে বাংলাদেশ। জাতির বীর সন্তানদের মরণপণ লড়াই, অসংখ্য আত্মদান ও গোটা জাতির অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের প্রাক্কালে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। 

ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয় এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। 

ইসলামে স্বাধীনতার মর্যাদা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, একদিন ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া পৃথিবী ও তার অন্তর্গত সবকিছুর চেয়ে উত্তম। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তার আমল আর বৃদ্ধি পেতে পারে না। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে ব্যক্তি কোনো ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহরায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তার আমল কেয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং কবরের প্রশ্নোত্তর থেকেও সে মুক্ত থাকবে। -তিরমিজি ও আবু দাউদ

স্বাধীনতার মতো বিশেষ এ নিয়ামতকে সর্বোচ্চ মর্যাদাদান করা উচিত আমাদের। স্বাধীনতার অর্জন যাতে কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা উচিত। মহান স্বাধীনতা দিবস শুধু স্মৃতিচারণ নয়, জাতির জীবনে স্বাধীনতা অর্থবহ, তাৎপর্যময় করে তোলার পাশাপাশি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে শপথ গ্রহণের দিনও। স্বাধীনতা অর্জন যত কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করা তার চেয়ে বেশি কঠিন। চলমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং আমাদের বাস্তবতায় এই বিষয়টি নানাভাবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাতির স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব।

জাতির সবচেয়ে মহান ও মহিমান্বিত স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ উঠলে দেখা যাবে, বিগত বছরে আমাদের অর্জন একেবারে কম না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল, ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে আমাদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে, বাস্তবতার আলোকে তা বলা যাবে না। সহনশীলতা, ধৈর্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ নিয়ে এখনও প্রশ্ন তোলার সুযোগ মেলে। সংঘাত-সহিংসতার রাজনীতি থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পারিনি। জনগণ এখনও রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেন। এবারের স্বাধীনতা দিবসে চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান এবং এর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তাই এ দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ভিত্তি হতে হবে ইমান ও সততার। পূর্ণাঙ্গ মুমিনের জীবন ও চেতনা ধারণ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুরক্ষা হবে না। নাগরিকদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ চেতনা গড়ে ওঠার জন্য সর্বব্যাপী ইমানের বলে বলীয়ান শক্তির প্রয়োজন সর্বাধিক। আর প্রয়োজন সততার। 

স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য বেশি প্রয়োজন সংগ্রাম ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য ও ন্যায়বোধ। এ ছাড়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে জ্ঞান, বুদ্ধি, শিক্ষা ও সৎ বিবেচনাকে কাজে লাগানো একান্ত অপরিহার্য। মূলত যথেষ্ট সচেতন ও সংঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হয় এবং সদা সতর্ক থাকতে হয়। তাই স্বাধীনতার মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য মনে করা উচিত। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের এই মৌল চেতনা সবাইকে অনুপ্রাণিত করুক- এটাই মহান স্বাধীনতা দিবসে প্রত্যাশা। আমি আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা আওয়ামী লীগই দিতে পারে। কারণ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন। স্বপ্ন দেখি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আমরা দেখে যেতে পারবো ইনশাল্লাহ।

লেখক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য ও ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির সদস্য

Ads
Ads