অনিরাপদ সড়কে নৈরাজ্য : এই লাশের মিছিলের শেষ কোথায়?  

  • ২৪-মার্চ-২০১৯ ০৯:২৩ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই কারও না কারও মৃত্যু ঘটে। কিন্তু তাতেও একমাত্র ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া কখনো কারও মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা যায় না। তবে কালেভদ্রে কোনো কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। আন্দোলন, বিক্ষোভ হয়। কিছুদিন চলে। তারপর সরকারের সমঝোতামূলে উদ্যোগে হোক আর কঠোর ব্যবস্থার মুখেই হোক সে আন্দোলন-বিক্ষোভ একসময় কোনো ফলাফলবিহীন অবস্থায় থেমে যায়। সড়কপথে সড়ক দুর্ঘটনা আগের নিয়মেই চলতে থাকে। যেমন, সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরারের মৃত্যুর পর রাজধানীসহ দেশব্যাপী আন্দোলন হয়েছে একদিকে, অন্যদিকে প্রতিদিনই একই ধরনের মৃত্যুর শিকার হয়ে চলেছে শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ সাধারণ মানুষ। 

এই যেমন, গত বুধবার দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। বৃহস্পতিবার বরিশালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন। গতকাল শনিবারও গাজিপুরে দুই কলেজছাত্রসহ অন্তত ১০জন নিহত হয়েছেন। এ অবস্থায় একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে দেশবাসীকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে রাখছে- তবে কি এ ধরনের মৃত্যুর শেষ বলে কিছু নেই? ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে- প্রতিদিনই কিছু মানুষ সড়কে প্রাণ হারাবেন, কখনও কখনও বিশেষ কোনো মৃত্যু নিয়ে আন্দোলন হবে, হৈচৈ হবে, কিন্তু মৃত্যু রোধ করা যাবে না। বস্তুত দেশের মানুষ প্রতিদিনই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় বের হচ্ছেন এবং তাদের মধ্য থেকে অন্তত কয়েকজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। আর এ দিকে ওই বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান এবারও তার এক আল টপকা মন্তব্যে বলেছেন, আবরার হত্যায় বাস চালক এককভাবে দায়ী নয়। অর্থাৎ এ জন্য আবরারও দায়ী। তার মানে যে ব্যক্তি নিয়ম মেনে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে যাবে, সেও দায়ী? আমরা সরকারকে বলবো, এই বিতর্কিত ব্যক্তিকে অবিলম্বে সরকারের সকল দৃশ্যপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হোক। মনে রাখা দরকার, দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ঢের বেশি উত্তম। যে  বিতর্কিত ব্যক্তিটি বলে, ‘গরু-ছাগল চিনতে পারলেই লাইসেন্স দেওয়া হবে’- সেই বিতর্কিত ব্যক্তির কাছে জেব্রা ক্রসিংই কি আর ট্রাফিক সিগন্যালের ‘লাল বাতি’ই বা কি- তার কাছে সবই সমান।

এমন নৈরাজ্যকর অবস্থায়, এ ধরনের স্বাধীন সড়কে তো যেনতেন গাড়ি চলবে, এতে আর বিস্ময়ের কী থাকবে! তাই তো আমরা যখন সড়কে লাইসেন্সবিহীন যানবাহন চলাচল করতে দেখি, তাতে আমাদের মনে কোনো বিস্ময় জাগে না। এমন বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে থাকে রাজধানীতে ট্রাফিক সপ্তাহ পালনের সময় খোদ ট্রাফিক পুলিশ। সেই সাক্ষ্যসূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ আট মাসেও অধিকাংশ গাড়ির বৈধ কাগজই নেই। তখন তো সরকারের সদিচ্ছা ও ভূমিকার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তাতে স্পষ্ট হতে পারে পরিস্থিতি একটুও বদলায়নি। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এতে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েই প্রশ্ন থেকেই যায়। নয়তো বিতর্কিত মন্ত্রী শাজাহান খানের ওপর কেন আস্থা রাখবে এই সরকার?  

অথচ ডিএমপি কমিশনার স্বয়ং বলেছেন, রাস্তায় শৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। এই ‘আমরা’ বলতে নিশ্চয়ই পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরও বুঝিয়েছেন তিনি। প্রশ্ন উঠবেই, তাহলে রাজধানীর রাজপথে যে বিপুলসংখ্যক ট্রাফিক পুলিশকে কর্তব্যরত অবস্থায় দেখা যায়, তারা প্রকৃতপক্ষে কী করেন? ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, আবরারকে যে বাসটি চাপা দিয়েছিল, সেটির রুট পারমিট ছিল ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার, অথচ সেটি চলাচল করত ঢাকায়। তা কী করে সম্ভব হলো? বাসটির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে ২৭টি মামলাও হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের একটি বাস যে রাজধানীতে চলাচল করত, সেটা ট্রাফিক পুলিশ জানল না কেন? অথবা এই বাসটিকে ঢাকায় চলাচল থেকে নিবৃত্ত করার দায়িত্ব ছিল আসলে কোন্ কর্তৃপক্ষের? ওই বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রীর মতো প্রভাবশালী কোনো কর্তৃপক্ষের? সড়কের নিরাপত্তার দাবিতে ২০১৮ সালের আগস্টে দেশব্যাপী বৃহত্তর গণআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আইন সংস্কারসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশকিছু উদ্যোগ নিলেও তা যে একেবারেই বাস্তবায়িত হয়নি- তার প্রমাণ এখনো প্রতিদিন সড়কে কাউকে না কাউকে এই পরিবহনের চাকায় প্রাণ দেওয়া।

কাজেই আমরা আর সড়ক দুর্ঘটনার পর ঢাকঢোল পিটিয়ে এমন বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রীর মতো প্রভাবশালী কাউকে নিয়ে কমিটি-উপকমিটি গঠনে সন্তুষ্ট হতে চাই না। কমিটি গঠিত হবে, সেই কমিটি সুপারিশমালা তৈরি করবে, অতঃপর চারদিকে নীরবতা- এই পরিস্থিতি বছরের পর বছর চলতে পারে না। জানা গেছে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে এ পর্যন্ত ১২৯ দফা সুপারিশ করেছে সরকারের বিভিন্ন কমিটি ও সংস্থা। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছে আরও ২১টি সুপারিশ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনাও উপেক্ষিত হয়েছে, এমনকি বিভিন্ন সময়ে দেওয়া আদালতের নির্দেশনাও পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। তবে কি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা সমাজের এমন শক্তিশালী অংশ, যারা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য মনে করে যা খুশি করার ক্ষমতা রাখে? এই ক্ষমতার নেপথ্যে কি ওই বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রীর মতো প্রভাবশালী কেউ?

এই নৈরাজ্যের অবসান হতেই হবে। সড়ক ব্যবস্থাপনা এমন কোনো দুরূহ কাজ নয় যে, তা কোনোভাবেই মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো, সর্বোপরি সরকার যদি সত্যি সত্যি নিরাপদ সড়ক গড়তে চায় এবং সেভাবে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা সম্ভব নিশ্চয়ই। আমরা সেই সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা দেখতে চাই। একটি স্বাধীন দেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বা জীবন বাজি রেখে যাতায়াত করতে হচ্ছে জনগণকে। এর চেয়ে পরিতাপের আর কি হতে পারে। মনে রাখা দরকার, সড়কে সারি সারি লাশের মিছিল কারও জন্যই স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

Ads
Ads