প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ: বই যেন শিশুর বোঝা না হয়ে ওঠে

  • ১৫-মার্চ-২০১৯ ১০:৫৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরেতজা হাসান ::

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ উদ্বোধনকালে পড়াশোনার ক্ষেত্রে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করতে অভিভাবক, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। শিশুরা তাদের পীঠের ওপর যে ভারী বইয়ের বোঝা বহন করে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছেন, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনোমতেই যেন কোমলমতি শিশুদের অতিরিক্ত চাপ দেওয়া না হয়। তা হলেই তারা নিজেদের ভেতরে একটা আলাদা শক্তি পাবে। তাদের শিক্ষার ভিতও শক্তভাবে তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে।

গত বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখেছেন তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আজকাল এমন হয়েছে যে, দেশের শিশুদের রাতারাতি মহাজ্ঞানী ও মেধাবী হিসেবে জাহির করার কারণে তাদের ওপর পড়াশোনার যে সীমাতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হয়, তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। পড়াশোনা নিয়ে এতো চাপাপাপির কারণে অনেক শিশু সহজাত গুণ হারিয়ে বসে এমন এক ধরনের প্রতিবন্ধীর মতো আচার-আচরণ করে যে. তা দেখে অনেকের কাছেই তাকে প্রতিবন্ধীই মনে হবে। এর ফলে পড়াশোনা বা জ্ঞান আহরণের প্রতি শিশুদের সহজাত আগ্রহ প্রকারান্তরে বিফলে যায়। কেননা, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাই বোঝেন না যে, এটা করতে গিয়ে তারা প্রকারান্তরে শিশুদের ওপর মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছে কঠোর শৃঙ্খলা আরোপ করে। ফলে শিশুরা তখন পড়াশোনাকে দেখে এক অজানা ভীতির চোখে। 

অথচ শিশুদের মনের ওপর অযথা এরকম চাপ সৃষ্টি না করে হাসি-খেলার পরিবেশেই শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়। উন্নত দেশগুলোয় এ পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সার্বিকভাবে এ থেকে সুফল অর্জন একেবারেই হতাশাজনক। প্রাথমিক শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে ভালো বেতন, ছুটিসহ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও পাঠদানের ক্ষেত্রে তাদের এক বড় অংশের অমনোযোগিতা নিয়ে কথা না বললেও চলে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার বদলে উৎকোচ সিংহভাগ ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করায় অযোগ্যরাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন- এমন অভিযোগও বিস্তর রয়েছে। যে কারণে মানসম্মত শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে দেশের কোমলমতি শিশুরা। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিশুশিক্ষাসহ বাংলাদেশের টোটাল শিক্ষাব্যবস্থাই অত্যন্ত শোচনীয়। যে কারণে তথাকথিত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর সেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারেই নেই। যা কিছুদিন আগে এক আন্তর্জাতিক জরিপে উঠে এসেছে। সেক্ষেত্রে শিশুশিক্ষা কীরকম শোচনীয় হবে এতেই অনুমেয়। ফলে যাদের আর্থিক সংগতি আছে তারা সাধারণ নিজেদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর বিষয়ে বীতশ্রদ্ধ থাকেন। সেক্ষেত্রে গরিবরা নিজেদের আর্থিক অসংগতির কারণে নিতান্তই নিরুপায় হয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের সন্তানদের পাঠান।

এভাবে কার্যত প্রাথমিক শিক্ষা তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন গরিবী শিক্ষার বাহন, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত সাধারণ শ্রেণির জন্য এমন এক শ্রেণির কিন্ডারগার্টেন- যা নানা মুখরোচক বিজ্ঞাপন, লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার ইত্যাদির মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত। আর একেবারে উচ্চবিত্তদের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম- যার পরিচিতি মূলত উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেসব সাধারণ মধ্যবিত্তদের চেনাজানা ও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এভাবে কার্যত এই স্বাধীন রাষ্ট্র দেশের নাগরিককে স্পষ্টত এই বৈষম্যকরণের লক্ষ্যে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করাই শুধু নয়, এটাকেই প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে। কাজেই আমরা মনে করি, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে যেভাবে নির্বিচারে নৈরাজ্য চলছে তা আর চলতে দেওয়া অনৈতিকতারই নামান্তর হবে। আমরা এর অবসান ঘটাতে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনাকে সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুুসরণ করার আহ্বান জানাই।

Ads
Ads