ডাকসুতে শোভনের হারের নেপথ্যে যারা!

  • ১৫-মার্চ-২০১৯ ০৬:৫৭ অপরাহ্ন
Ads

:: উৎপল দাস ::

দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১১ মার্চ। বহুল প্রতীক্ষিত এ নির্বাচনকে ঘিরে আশা ছিল ব্যাপক। কিন্তু সহ-সভাপতি পদে ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন হেরে যাওয়ায় নানামুখী কথাবার্তা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোভনের পরাজয়ের পিছনে ছাত্রলীগেরই একটি অংশের ষড়যন্ত্রের কথা বারবার বলা হচ্ছে। এমনকি ডাকসুতে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে বিজয়ী হওয়া সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর দিকেও অভিযোগ তুলতে কেউ কেউ দ্বিধা করেননি। এমনকি ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস এবং এজিএস হিসাবে নির্বাচিত সাদ্দাম হোসেনকেও কেউ কেউ ঘরে বাইরে দোষারূপ করছেন। অনেকে আবার ছাত্রলীগের অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কথা বলেছেন। এমনকি নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সাথে ভিপি হিসাবে নির্বাচিত  বিতর্কিত কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরুর সঙ্গে বৈঠক নিয়েও অনেকেই নানামুখী কথা বলছেন। এমন এক পরিস্থিতিতে ডাকসু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ভোরের পাতার পক্ষ থেকে শোভনের পরাজয়ের নেপথ্যে কি কারণ রয়েছে, কারা জড়িত এ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান করেছে। 

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রেজওয়ানুল হাক চৌধুরী শোভনের গ্রহণযোগ্যতা কম থাকার কারণে তিনি তেমনভাবে ডাকসু নির্বাচনে ভোট কম পেয়েছেন। এছাড়া তার অনুসারীরাই শোভনের পক্ষে ভোট টানতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সংসদে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের প্রাপ্ত ভোট এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোট বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে গোলাম রাব্বানী, সনজিত অথবা সাদ্দাম হোসেনকে দোষারূপের কিছু নেই বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

অপরদিকে, হল সংসদগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শোভনের পছন্দের প্রার্থীরা তার জন্য ভোট টানতে পারেননি। মোট ৫ টি হলে শোভন তার নিজের অনুসারীদের ভিপি জিএস পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। তারা নিজেরা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন, শোভন সেখানে সে পরিমাণ ভোট পাননি। বিজয় একাত্তর হলে শোভনের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে জয়ী জিএস নাজমুল হাসান নিশান মোট ভোট পেয়েছেন ১৩২৭। কিন্তু শোভন পেয়েছেন মাত্র ৬৬৪ ভোট। ফজলুল হক হলে জিএস মাহফুজুর রহমান পেয়েছেন ১১৮২ ভোট। আর শোভন পেয়েছেন ৫১২। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ভিপি শরিফুল ইসলাম শাকিল ৮২৬ ভোট, শোভন পেয়েছেন মাত্র ৪৪৪ ভোট। রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের নিজের আবাসিক হল হাজী মুহাম্মদ মহসীন হলে শোভনের প্রার্থী ভিপি শহীদুল হক শিশির পেয়েছেন ৭৬০ ভোট। কিন্তু নিজ হলেই শোভন পেয়েছেন মাত্র ৪৬৩ ভোট। শোভনের নিজ হলেই তার প্রতিদ্বন্দ্বি নুরুল হক নূরু পেয়েছেন ৫১২ ভোট। ফলে নিজের আবাসিক হল হাজী মুহাম্মদ মহসীন হলেই নিজের বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারেননি ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে শোভনের প্রার্থী  ভিপি মুজাহিদ কামাল উদ্দিন পেয়েছেন ৯৬৬ ভোট। কিন্তু শোভন পেয়েছেন মাত্র ৫১৪ ভোট। 

এই পাঁচটি হলে ছাত্রলীগের মনোনীত এবং শোভনের পছন্দের প্রার্থীরা মিলে যে ভোট পেয়েছেন সেখানে শোভন তাদের চেয়ে ২৪৬৪ ভোট কম পেয়েছেন। যদি হলগুলোতে শোভনের প্রার্থীতের সমান ভোটও তিনি পেতেন তাহলে নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নূরুকে ৫৩১ ভোটের ব্যবধানে হারতে সক্ষম হতেন। নূরু ভোট পেয়েছেন মোট ১১০৬২ এবং শোভন পেয়েছেন ৯১২৯  ভোট।  এক্ষেত্রে শোভনের নিজের লোকজন যারা নিজেদের জন্য ভোট টানতে পেরেছেন কিন্তু কেন্দ্রীয় ভিপি পদে শোভনের জন্য ভোট টানতে পারেননি। শোভনের পরাজয়ের মূল কারণ এটি। হলের নেতাদের এমন বিশ্বাসঘাতকার কারণেই তিনি মূলত পরাজিত হয়েছেন। 

এদিকে, ডাকসু নির্বাচনের আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নূরুর সঙ্গে প্রকাশ্যে বৈঠক করেছেন জিএস হিসাবে নির্বাচিত এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এ বৈঠকটি নিয়ে অনেকে ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন। কিন্তু বৈঠকের বিষয়টি আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের জানিয়েই করেছিলেন। এমনকি বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও জানতো। বৈঠকে কোনো ধরণের ষড়যন্ত্র করা হয়নি এবং অনেকের উপস্থিতিতেই সেই বৈঠক হয়েছিল। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের পরামর্শেই নূরুকে ছাত্রলীগের প্যানেলে একটি সম্পাদকীয় পদে মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে সেখানে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রলীগের অন্য দুই নেতার বিরোধিতার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। ফলে ভিপি পদে শোভনকে পরাজিত করেছেন নূরু। 

অন্যদিকে, শোভন ও রাব্বানীর প্রাপ্ত ভোট ব্যবধান বিবেচনা করলেও দেখা গেছে, শোভনের পরাজয়ের জন্য কোনোভাবেই রাব্বানী দায়ী নয়। হল ভিত্তিক তাদের প্রাপ্ত ভোটে খুব বেশি ব্যবধান নেই। রাব্বানী ১০৪৮৪ ভোট পেয়েছেন আর শোভন পেয়েছেন ৯১২৯ ভোট। ছাত্রলীগের যে অংশটি শোভনকে হারানোর জন্য কাজ করেছে, তারা রাব্বানীকেও হারাতে চেয়েছিল। স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী আসিফুর রহমান আসিফ ৪ হাজার ভোটের বেশি না টানলে এই ভোটগুলোর বেশির ভাগই রাশেদের পক্ষে যেত। তাহলে রাব্বানীও পরাজিত হতেন। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্কের কারণে শোভনের চেয়ে ১৩৫৫ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

Ads
Ads