প্রশ্নবিদ্ধ ডাকসু নির্বাচন : তিক্ততায় শেষ, নহে মধুরেণ সমাপেৎ

  • ১৩-মার্চ-২০১৯ ০৯:১৮ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

সেই সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই নির্বাচনই গত সোমবার চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি ও অনিয়মের মধ্যদিয়ে শেষ হলো। দীর্ঘ ২৮ বছরের অধরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ, ডাকসু নির্বাচন ধরা দিল ঠিকই কিন্তু শেষপর্যন্ত এখানেও অধরাই রয়ে গেল সুষ্ঠু নির্বাচনের। অথচ আশা করা হচ্ছিল দেশের ছাত্ররা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনীতিকদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তুলে ধরবে। তার ওপর দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন ঘিরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আবেগী উচ্ছ্বাসও ছিল। আশা ছিল ঐতিহ্যের ডাকসু সক্রিয় হবে। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে ক্রীড়া-সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রে ডাকসু ভূমিকা রাখবে। কিন্তু দেখা গেল সে আশায় গুড়ে বালি। নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণের আগে ও মাঝে যে অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো ঘটল, তাতে সচেতন মহল যারপরণাই হতাশ।  কেননা নির্বাচনের বিসমিল্লাতেই একটি হলে বস্তাভর্তি ব্যালট পেপার উদ্ধারের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে ভোটগ্রহণ শুরু হয় তিন ঘণ্টা দেরিতে। রোকেয়া হলেও ব্যালট পেপারভর্তি ট্রাংক ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় প্রায় তিন ঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়।

এই রোকেয়া হলেই আক্রান্ত হয়েছেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সহসভাপতি প্রার্থী। ব্যাপক অনিয়ম, ভোটগ্রহণে বাধা এবং কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বাম ছাত্রসংগঠনগুলো নিয়ে গঠিত প্রগতিশীল ছাত্রজোট। ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদলও। ডাকসু নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন সমর্থিত প্যানেলের এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নতুন করে নির্বাচন দাবি করেছেন তারা। তবে শেষপর্যন্ত সে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। উত্তেজনার পারদ নামলো ছাত্রলীগের নেতা শোভন ও নব নির্বাচিত ভিপি নুরল হক নূরুর কোলাকুলির মধ্যদিয়ে। 

ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষেরও বিপুল আগ্রহ ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, ডাকসুর পর দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে নির্বাচন হবে। ছাত্ররাজনীতির বন্ধ দ্বার খুলে যাবে। ক্রীড়া-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মেধাবী তারুণ্যের বিকাশ ত্বরান্বিত করবে ডাকসু নির্বাচন। সঙ্গতকারণেই এই নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত সতর্ক ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত ছিল।

‘অনেকেই এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করবে’- এই দায়সারা জবাব দেওয়ার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর জানা আবশ্যক। প্রশ্নটি হচ্ছে, এসব ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার জন্য কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরই। কাজেই নির্বাচন যাতে কেউ ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ না করতে পারে সেভাবেই তাদের সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যা-যা প্রয়োজন তার সবই করা উচিৎ ছিল। যেহেতু সেটা তারা করতে পারেনি কাজেই ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণভাবে তাদেরই বহন করতে হবে। এখানে আমাদের প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি এক্ষেত্রে যথোপযুক্ত পরিপক্কতার পরিচয় দিতে পেরেছে? নাকি ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে আগে থেকেই তুষ্টচিত্তে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিল তারা?

আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশের ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ডাকসু। কারো স্বেচ্ছাচারিতার বলি হিসেবে ডাকসুকে কিছুতেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। ব্যর্থ হতে দেওয়া ঠিক হবে না। নয়তো আগামী প্রজন্ম সত্যিকারের নেতা থেকে বঞ্চিত হবে। আর এর দায় তাদেরই নিতে হবে, যারা এমন সম্মানজনক দায়িত্ব পেয়েও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। 

Ads
Ads