উপমহাদেশের সব চাইতে উচুঁ ঐতিহ্যবাহী শ্রীনগরের শ্যামসিদ্ধির মঠ

  • ১৭-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ০৯:১৭ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: শ্রীনগর (মুন্সিগঞ্জ)প্রতিনিধি :: 

বাংলাদেশের স্থাপত্য শিল্পে সম্মৃদ্ধ অ লগুলোর মাঝে ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর হলো অন্যতম। ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুরে পুরাকীর্তি ও স্থাপত্য শিল্পের কথা বলতে গেলে শ্যামসিদ্ধির মঠের নাম অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের বেষ্টনীতে আবৃত্ত শ্যামসিদ্ধির মঠটি লিভার্টি অফ ষ্ট্রেচুর মত দাঁড়িয়ে আছে আড়িয়ল বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। আড়িয়ল বিলের মনোমুগ্ধকর অনাবিল পরিবেশ দেখে মনে হয় প্রতিনিয়ত শ্যামসিদ্ধি গ্রামের মঠটিকে হাতছানি দিয়ে ডেকে বেড়ায়।

ঐতিহ্যবাহী মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার অর্ন্তগত শ্যামসিদ্ধি গ্রামে মঠটি অবস্থিত। শ্যামসিদ্ধি গ্রামের ধনাঢ়্য পরিবারের সন্তান শম্ভুনাথ মজুমদার তার স্বর্গগত পিতার স্বপ্নাদেশ পেয়ে তার স্মৃতি অক্ষুন্ন রাখার জন্য ১৭৫৮ইং বাংলায় ১২৪৩ সালে মঠটি নির্মান করেন। লাল ইটের তৈরী সুউচ্চু মঠটি বাহিরের দিক থেকে দেখতে ঠিক অষ্টাভূজাকার। মঠের সমুন্নত চূড়ার ওপর ছিল একটি কলস ও ত্রিশূল। কলসটি ভেঙ্গে গেছে কিন্তু লোহার ত্রিশূলটি এখনো আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে।

শ্যামসিদ্ধি মঠ সমন্ধে বিভিন্ন লেখকদের বই থেকে পাওয়া তর্থ্য অনুযায়ী মঠটির উচ্চতা প্রায় ২৪০-২৪২ ফুট, প্রত্যেক দিকের বর্গাকার ভূমির দৈর্ঘ্য ২১ ফুট, মঠের ভিতরে ক্ষেত্রফল ৩২৪ বর্গফুট এবং প্রবেশদ্বারের উচ্চতা ২৭ ফুট। মঠটির গায়ে সোনারং অ লের কিছু স্থাপত্য কর্মের নমুনা আছে যা দেখতে ঠিক ফনা বিশিষ্ট সর্পমূর্তি ও লতাপাতার অলংকরনের নকশা দিয়ে সজ্জিত। অষ্টাভূজাকার দেয়ালের প্রত্যেকটিতেই জানালার মত প্যানেল আছে সেগুলো খোলা যায়না।

বিক্রমপুরের হিন্দু রাজা রায় বংশধররা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি রক্ষার্থে এ অ লে বহুমঠ ও মন্দির নির্মান করেন। যেমন তালতলার ফেগুনাসার মঠ,তাজপুরের সরকার বাড়ীর সরকারদের মঠ, সোনারংয়ের মন্দির, আউটশাহীর মঠ,তেহরিয়ার মঠ,মাইজপাড়ার জোড়া মঠ,ষোলঘরের পাকিয়াপাড়ার সাদা মঠ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। শ্যামসিদ্ধি গ্রামের মঠটির মধ্যে গৌরিপটে একটি শিব লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত ছিল। শিব লিঙ্গটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৩ফুট । সনাতন ধর্মালম্বী মানুষ এই মঠটি শিব মন্দির বলে থাকে। মঠটির উচুঁ শিখরটির চারিপাশে ঘিরে থাকা অনেক ছিদ্র দেখতে পাবেন, যার মধ্যে বাসা বেঁধেছে অজ¯্র পাখি, সন্ধ্যা হতেই ঝাঁক বেঁধে ফিরে আসে নীড়ে। প্রতি বছর শিব চর্তুদশীতে বহুদূর দূরান্ত থেকে এসে হিন্দু সম্প্রাদায়ের কুমারী মেয়েরা সাতপাক ঘুরে সারারাত শিবের মাথায় মাথায় জল ঢালেন, তাদের বিশ^াস শিবের পূজা করলে সুদর্শন স্বামী পাওয়ার বর লাভ করা যায়। মঠের একপাশে একটি বিদ্যালয় বিরাজমান,আরেক পাশে বিশাল এক মাঠ। সে মাঠে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় দিন থেকে বৈশাখী মেলা (গোলইয়ার) বসে দেশের বিভিন্ন অ ল থেকে সে মেলা দেখতে অনেক লোক সমাগম হয়।  

এর ফলে শ্যামসিদ্ধি গ্রামটি পরিনত হয় এক মিলন মেলায়। বিক্রমপুরের মানুষ মনে করেন শ্যামসিদ্ধি গ্রামের মঠটি ভারতের দিল্লীর কুতুব মিনারের চেয়ে উঁচুতো বটেই এটি সমগ্র দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উঁচু মঠ। ধ্রুব তাঁরার মত আলো প্রজ্জলিত করে শ্যামসিদ্ধি গ্রামের মঠটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপশালী রাজার মত। শ্যামসিদ্ধির মঠটি বর্তমানে কৃষ্ণ মন্ডলের স্ত্রী পারুল রানী মন্ডল মঠের পূজার কার্যাদি পরিচালনা করেন। মঠের শিব লিঙ্গটি মহা মূল্যবান কালো কষ্টি পাথরের ছিল ১৯৯৫ সালে ৩০ শে সেপ্টেম্বর শিব লিঙ্গটি চুরি হয়ে যায়।

জরাজীর্ণ মঠটির নিচের কিছু অংশ সরকারি অনুদানে সংস্কার করা হয়েছে ইট সিমেন্ট বালু টাইলস পাথর দিয়ে। মঠের ভিতরে প্রবেশ করা ভাংঙ্গা দরজা জানালা গুলোও লাগানো হয়েছে নতুন করে। পুরাকীর্তির ঐতিহ্য বহন করা মঠটি দেখার জন্য দেশ তথা বিদেশ থেকে ও অনেক পর্যটক ছুটে আসেন শ্যামসিদ্ধি গ্রামে। অনেকেই মঠটির পুরাকীর্তি সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে এসে হতভাগ হয়ে যান। যখন দেখে মঠটির প্রবেশদ্বারসহ চারিপাশ টাইলস পাথর লাগানো। ভ্রমন পিপাশু অনেকে মঠটি দেখতে এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন  মঠটিকে ইট সিমেন্ট বালু টাইলস পাথর দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। যা সঠিক হয়নি।  এতে করে মঠটি হারিয়েছে পুরাকীর্তির নির্দেশন।

যদি সঠিক ভাবে এ জরার্জীণ মঠটি সংস্কার করা যায় তবে শ্যামসিদ্ধি গ্রামের মঠটি পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে।

শ্যামসিদ্ধির মঠটি শুধু বিক্রমপুরের নয় সারা বাংলাদেশের নয় সমগ্র দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে এটি ঐতিহ্যবাহী মঠ। এই মঠ আমাদের গর্বের বস্তু। শ্যামসিদ্ধি গ্রামের মঠটি যথাযথা রক্ষনাবেক্ষন করা না হলে এটি কালের গর্বে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। 

Ads
Ads