উচ্চপ্রবৃদ্ধি ও বেকার সংখ্যা: সিপিডির প্রতিবেদন গনায় নিতে হবে

  • ১২-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ০৯:২৩ pm
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বর্তমানে গোটা দেশে বেকার রয়েছে ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। গতকাল মঙ্গলবার সংসদে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দেন। দেশে বেকার রয়েছে এটা বিবিএস আরও ক’বছর আগে থেকেই বলে আসছে। এই তথ্যে বোঝা যাচ্ছে, দেশে যেন বেকার প্রায় একই সংখ্যায় রয়ে গেছে। প্রায় বাড়েও নি, প্রায় কমেও নি। কিন্তু বেসরকারি তথ্যমতে এই হিসাব আরও ভয়াবহ। অর্থাৎ সরকার প্রকৃত হিসাব চেপে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সিপিডি যে তথ্য দিয়েছে তাতে বোঝা যায় দেশের প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। আমাদের দেশের রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত যেমন অবাধে মিথ্যাচার চলে তেমনি তারা যখন ক্ষমতাসীন হয় তখনো তাদের সরকারি তথ্যে-উপাত্তে প্রতিনিয়ত প্রকৃত তথ্য আড়াল করার চর্চা চলে। এভাবেই জনগণকে একটা ধোকার মধ্যে রাখা হয়। এই যে প্রকৃত তথ্য আড়াল করা এটা কি দুর্নীতি নয়? আর তাই বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারের হিসাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশে চাহিদা অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আর তাই বিদ্যমান বেকার কর্মীদের সঙ্গে প্রতি বছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও অনেক বেকার কর্মী। এভাবে নতুন নতুন বেকার যুক্ত হওয়ার ফলে দেশের প্রকৃত বেকারের সংখ্যা আরও অনেক হওয়ার কথা।

কিন্তু শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী যে হিসাব দিলেন তা কি বাস্তবতার সাথে আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ? যদি তারা প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করেন তাহলে বুঝতে হবে তারা জাতির সঙ্গে কানামাছি খেলছেন। এভাবে প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করলে কি জাতির কোনো উন্নতি হবে নাকি আরো অবনতি হবে? তখন এর দায় কে নেবে? 

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাহিদামতো নতুন কর্মসংস্থান না হওয়ায় দেশে বিদ্যমান বেকার কর্মীদের সঙ্গে প্রতি বছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও আট লাখ কর্মক্ষম মানুষ। কাক্সিক্ষত মাত্রায় কর্মসংস্থানহীন এ প্রবৃদ্ধি এখন দেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিপিডির ‘কাক্সিক্ষত সামাজিক উন্নয়নের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি : বিষয়াদি এবং অগ্রাধিকার’ শীর্ষক প্রতিবেদন ও সংলাপে কর্মসংস্থান সংকটের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের সামনে আরও যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেসব বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। দেশে প্রবৃদ্ধি এমন হতে হবে যাতে নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্য দূর হয়। এজন্য শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। একইসঙ্গে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় যাতে কমে আসে সেজন্যও সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

সিপিডির প্রতিবেদনে দেশে ধনী-দরিদ্র বৈষম্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন হলে দেশে অতিদরিদ্রের সংখ্যা দ্রুত কমবে। সিপিডির প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বলা হয়েছে, দেশের হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও সেগুলোর মানসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু কমানোসহ স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও রয়েছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব। তবে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কাজেই এ খাতকে আরও ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নয়তো বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা সেভাবে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন না। ফলে বেকারের সংখ্যা উত্তরোত্তর এভাবে বাড়তেই থাকবে। তখন আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যাবে না। বিবিএস বা সংসদ থেকে বেকারের সংখ্যা প্রতিবছর একই হিসাব ২৬/২৭ লাখের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ানো হোক না কেন, তাতে কিন্তু বেকারত্বের আগুন নেভানো যাবে না। যেমন, আগুন ছাই চেপে ঢেকে রাখা যায় না। কর্মসংস্থানহীনতাও তাই।    

Ads
Ads