ফ্রিডম হাইস গবেষণা: গণতন্ত্রবিমুখ বিশ্বে উন্নয়নই মূলমন্ত্র! 

  • ৬-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ১০:৪৩ pm
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

গণতন্ত্রের মহান প্রবক্তা আব্রাহম লিঙ্কনদের যুগ বোধহয় আজকের যুগে এসে ‘মিথ’ হতে চলেছে। কেননা, গোটা বিশ্বই এখন গণতন্ত্রের প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ছে। গত ১৩ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে এ অবস্থাই লক্ষ করা যাচ্ছে। বৈশ্বিক গণতন্ত্র নিয়ে গবেষণাকারী প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের সদ্য-প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এমনই চিত্তাকর্ষক তথ্য ওঠে এসেছে। ২০১৮ সালের গণতন্ত্র পরিস্থিতির ওপরে প্রকাশ করা এই প্রতিবেদনটিতে যা আলোকপাত করা হয়েছে তাতেই স্পষ্ট মানুষ এখন গণতন্ত্র নয়, উন্নয়নতন্ত্রের প্রতিই আকর্ষিত। যার প্রবক্তা হিসেবে ষাট দশকে স্পেনের ফ্রাংকো, পাকিস্তানের আইয়ুব খান প্রমুখ স্বৈরশাসকদের শাসননীতিতে ওঠে এসেছিল। 

তবে বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে, সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর থেকে, গোটা দুনিয়ায় নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি একটা ঝোঁক তৈরি হয়। ফলে বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি হান্টিংটন এই সময়কালকে ‘গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউ’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। এই সময়কাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে একনায়কতান্ত্রিক ও সামরিক শাসনের অবসান ঘটতে থাকে। পরিবর্তে গণতন্ত্রের উত্থান ঘটতে থাকে। তবে এ সময়কালে এমনও দেখা যেতে থাকে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা একনায়কেরা বিশ্বের দাবির মুখে কোনো উপায় না পেয়ে তাদের হাতে কুক্ষিগত ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে থাকেন। কিন্তু নতুন শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যেন সেই বিশ্বরাষ্ট্রগুলোই সলিড স্বৈরতান্ত্রিক না হলেও একটা ছদ্ম স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যেতে শুরু করছে। কারণ এই সময়ে দেশে-দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের একধরনের অনীহা-উদাসীনতা চলে আসছে। যে কারণে ২০০৮ সালের দিকে পশ্চিমা অর্থনীতিতে মন্দা শুরুর পর থেকে গণতন্ত্র চর্চাকারী দেশগুলিতেও এই প্রবণতা দেখা দেয়। গণতন্ত্র-বিশেষজ্ঞ ল্যারি ডায়মন্ড একে ‘গণতন্ত্র-ঘাটতি’ হিসাবে চিহ্নিত করেন। এবার ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনেও এই ‘ঘাটতি’ বহাল থাকার বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, গত বছরটিতে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার বিচারে সর্বমোট ৬৮টি দেশে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনমন ঘটেছে। অবশ্য এর বিপরীতে ৫০টি দেশে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। অবনতি দেখা দিচ্ছে বিকাশমান গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে। শুধু তাই নয়, অনেক পরিণত গণতান্ত্রিক দেশেও এই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনমন চলছে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের দেশে-দেশে উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদীদের রাজনৈতিক উত্থানের ঘটনা। রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের মতো দেশগুলিও গণতন্ত্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। ফ্রিডম হাউস বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের অবনমন চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে ছয়টি বিশেষ ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। তা হচ্ছে- নির্বাচন, সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট মেয়াদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অভিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণ, বিদেশিদের নিরাপত্তা ও জাতিগত নির্মূলকরণ। যেমন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা বিতাড়নের নামে জাতিগত নির্মূল চলছে।

ফ্রিডম হাউসের গবেষণা থেকে এখন এটাই স্পষ্ট হচ্ছে, পৃথিবীর অনেক দেশের শহুরে সুশীল সমাজ যতটা হালকা চালে গণতন্ত্রকে দেখেন, বুঝেন- ব্যাপারটা কিন্তু অতো বাস্তব নয়। গণতন্ত্র সম্ভব এটা যতোই তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ দেওয়া হোক না কেন বাস্তবতার সঙ্গে কিন্তু এর কোনোই মিল নেই। কেননা, মানুষের প্রজনন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয় না, জৈবিক নিয়মেই ঘটে থাকে। এই জৈবিক নিয়মই অত্যন্ত জটিল। গণতান্ত্রিক সূত্র দিয়ে তা গণতান্ত্রিক শাসকদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব নয়।

ফলে ফ্রিডম হাউসের গবেষণা থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, গণতন্ত্র আজ একটা ফাঁকা বুলিতে পর্যবসিত হয়েছে। এটা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিচারেও স্পষ্ট হয়। গত এক দশকে যেরকম নির্বাচন হয়ে গেল এটাই যদি গত এক/দেড় দশক হতো তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ঘোলাটে হতো! বা বর্তমান শাসকদল ব্যাতীত ভিন্ন কোনো দলই যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতো তাহলে কেমন পরিস্থিতি দেখা দিতো। কাজেই রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বিকাশ অনায়াস করতে চাইলে গোটা সমাজদেহে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। এমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে যাতে অংশীজনদের প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশীদারিত্ব বুঝে নিতে পারে। তাহলেই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সংস্কৃতির পথ প্রশস্ত হতে পারে।

Ads