‘তিনফসলি জমিকে শিল্পায়ন থেকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া আমার মূল চ্যালেঞ্জ’

  • ৬-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ০৯:২৪ pm
Ads

ভোরের পাতার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যক্ষ মহিব্বুর রহমান মহিব এমপি

রাজনীতিবিদের পাশাপাশি অধ্যক্ষ মহিব্বুর রহমান মহিব পেশায় একজন শিক্ষক। যিনি প্রথমবারের মতো পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিতে সরাসরি জড়িত এই রাজনীতিবিদের সঙ্গে আলাপকালে তার শৈশবের কথা; রাজনীতিতে হাতেখড়ি সংসদ সদস্য হিসেবে নিজ এলাকার মাটি ও মানুষের জন্য তার করণীয় তুলে ধরেছেন অধ্যক্ষ মহিব্বুর রহমান মহিব পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধূলসার গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আলহাজ জালাল উদ্দিন আহম্মেদ। মাতা সাহিদা বেগম। নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্যের সঙ্গে রাজনৈতিক এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আবেগ রহমান।

ভোরের পাতা :রাজনীতিতে অনেকদিন, সেটা কি ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল কিংবা কবে থেকে এই ইচ্ছেটা হয় যে রাজনীতির সঙ্গে জড়াবেন? 
মহিব্বুর রহমান মহিব :একদম ছোটবেলা থেকেই আমি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, মোটামুটি সত্তর সালের দিকে, তখন থেকে আমি হাইস্কুলে ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। তারপর একে একে কলেজজীবনে রাজনীতি শেষ করে পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রলীগ শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলাম। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখার সমাজকল্যাণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়ে বর্তমানে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হয়েছি। আর সর্বশেষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় এবং জনগণের সমর্থনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমি সংসদ সদস্য হয়েছি। 

ভোরের পাতা :ছোটবেলা কীভাবে কেটেছে? ছোটবেলার কিছু স্মৃতি বলুন।
মহিব্বুর রহমান মহিব :আমার ছোটবেলার পুরো সময়টা মূলত গ্রামেই কেটেছে। ছাত্র হিসেবে খুবই মেধাবী ছিলাম। কোনোদিন ক্লাসে সেকেন্ড হইনি, বরাবর ফার্স্ট হয়েছি। একে তো ফার্স্টবয়, তার ওপর হাইস্কুল ছাত্রলীগের সভাপতি সবমিলিয়ে অল্প বয়সেই খুব নামডাক ছিল। একটা স্মৃতি যদি বলতে চাই, তখন আমার বয়স বারো কি তেরো হবে। এটা বাহাত্তর সালের কথা। আমাদের এলাকায় কোনো শহীদ মিনার ছিল না। এলাকার মানুষ খুবই ধর্মভীরু ছিল, তারা ভাবত শহীদ মিনার মানে পূজা করা বা ধর্মবিরোধী কাজ। আমি তখন হঠাৎ ২১ ফেব্রুয়ারির আগের দিন চিন্তা করলাম নিজের উদ্যোগে শহীদ মিনার বানাব। আমার বাড়ি থেকে ২০০ গজ দূরে অকেজো কিছু ইট ছিল। আমি ৩০০ ছেলে জোগাড় করে ফেললাম। রাত দুইটা থেকে কাজ শুরু করে দিলাম। ৩০০ ছেলে লাইন ধরে হাতে হাতে ইট পৌঁছে দিলো, অন্যদিকে রাজমিস্ত্রিরা তাদের কাজ করতে থাকল। ফজরের আজানের সময় কাজ শেষ হলো। সবাইকে নিয়ে পরে আশপাশের চারটা গ্রাম ঘুরে প্রভাতফেরি করলাম আর শহীদ মিনারে ফুল দিলাম। একা দায়িত্ব নিয়ে পুরো সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে শহীদ মিনার বানালাম আবার মাইক নিয়ে আলোচনা সভাও করলাম। যেহেতু আমার ডাকে সকল তরুণ একাত্ম হয়ে গেল তখন আর কারো সাহসই হয় নাই প্রতিবাদ করার। সেই শহীদ মিনার এখনো আছে। 

আরো একটি ঘটনা ছিল, দেশ স্বাধীনের পরে হঠাৎ করেই ডাকাতি আর ব্যভিচারটা বেড়ে গেল আমাদের এলাকায়। সমাজে একটা বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এলাকার যে চেয়ারম্যান, সেও সমাধান করতে পারছিল না। এলাকার মানুষ তখন আমাদের ডাকত। আমি বলতাম, আমরা যাব সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমাদের জন্য শুধু হালকা খাবারের ব্যবস্থা করে রাখবেন। তা ধরেন এই একবেলা খাওয়ার বিনিময়ে আমরা যেতাম। মুরব্বিদের ডেকে বলতাম আমাদের সামনে বিচার করেন। আমরা যেহেতু তরুণ, আমাদের ভয়ে কেউ কোনো অন্যায় করার সাহস পেত না। আর আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে আসতাম। তা একবার কুয়াকাটার কাছে এক ব্যক্তি খুবই খারাপ কাজ করে যাচ্ছিল। চেয়ারম্যান সেটা সামলাতে না পেরে আমার কাছে আসল। আমরা বললাম খাবারের বিনিময়ে আমরা যাব। আমরা যাওয়ার পর দেখি লোকটাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের ভয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে। আমি গ্রামের চৌকিদার-দফাদারকে ডেকে বললাম খুঁজো। পুরো এলাকা খুঁজেও পাওয়া গেল না। পরে একজন বলল বিলের মধ্যে হতে পারে। লোক নামিয়ে বিল খুঁজেও না পেয়ে পরে দেখি এক খালের মধ্যে শাপলার নিচে নাক উঁচু করে বসে আছে। তারে তখন উঠিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে আসলাম।

ভোরের পাতা :ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার মতো বিষয়টি নিয়ে এখন সংসদ সদস্য হিসেবে কীভাবে কাজ করবেন?
মহিব্বুর রহমান মহিব :আমার এলাকায় আমি সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছি। আর তা সম্ভব হয়েছে আমার এলাকার স্থানীয় সচেতন জনগণ এবং আমাদের জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য। তিনি এলাকায় বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা দিয়েছেন, যা জনসাধারণের মন ছুঁয়েছে। তাছাড়া চারটা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রাবন্দর, কুয়াকাটার মেরিন ড্রাইভ সবকিছু নিয়ে যে বিপ্লব ঘটছে তাতে মানুষ চোখ বন্ধ করে নৌকায় ভোট দিয়েছেন। আমি আগেও জনসাধারণের জন্য কাজ করে গিয়েছি, এখনো তাই করব; আরো উদ্দীপ্তভাবে করব। কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে সকল ধরনের কাজ আমি করব। এমনকি অচিরেই এলাকার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে যেসব সমস্যা আছে আমি তার সমাধান করে দেবো।

ভোরের পাতা :আপনি তো একজন শিক্ষক। সে বিষয়টা যদি একটু বলতেন?
মহিব্বুর রহমান মহিব :আমাদের গ্রামটা একদম সাগরপাড়ে। আমাদের গ্রামের পরে আর কোনো গ্রাম নেই। সেখানে আমি আমার বাবার নামে আলহাজ জালাল উদ্দিন কলেজটি প্রতিষ্ঠা করি এবং সেখানকার অধ্যক্ষ আমিই। আমাদের গ্রাম থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো কলেজ নেই। তাছাড়া বরিশাল বিভাগের মধ্যে আমার এই কলেজটি একাধিকবার দশম অবস্থানের মধ্যে আসছে। আরো একটি বিষয় আপনাদের জানাতে চাই যে, ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি এই কলেজে সকল ছাত্রছাত্রীকে বিনা বেতনে পড়াশোনা করিয়েছি। ২০১৫ সালের পর থেকে নামেমাত্র একটি বেতনকাঠামো করেছি। তাও সর্বোচ্চ বৃত্তির ব্যবস্থা রেখেছি। জনগণের জন্য কাজ করার মানসিকতা আসলে পরিবার থেকেই এসেছে। বিভিন্ন গঠনমূলক সমাজসেবার সঙ্গে আছি আজ প্রায় পনেরো-বিশ বছর। প্রত্যেক বছর শীতের সময় প্রতিটা ইউনিয়নে আমি নিজে গিয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ করি। 

ভোরের পাতা :বঙ্গবন্ধু আর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো স্মৃতিচারণ যদি করেন?
মহিব্বুর রহমান মহিব :বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে স্মৃতি বলতে ৭ মার্চের ভাষণ শুনতাম। কিন্তু আমাদের এলাকা এত দুর্গম যে, আমাদের শহরে আসতেই প্রায় একদিন লাগত। বয়স আর দূরত্বের কারণে আর কোনোদিন দেখা হয়ে ওঠেনি। আর নেত্রীর কথা যদি বলতে হয়, তাহলে ২০০৪ সালের একটি ঘটনা বলতে চাই। নেত্রী কুয়াকাটা আসলেন। ১০ নম্বর বিপদ সংকেত। অন্যান্য নেতা-নেত্রীকে রেখেই চলে গেলেন। কিন্তু নেত্রী গেলেন না। তিনি বললেন, এখানে যারা বাস করে তারাও বিপদে রয়েছে, তাদের ছেড়ে আমি যাব না। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। তখন আমি আরো কিছু যুবলীগ নেতাকর্মী নিয়ে এসে সারারাত নেত্রীকে পাহারা দিলাম। একদিকে ১০ নম্বও বিপদ সংকেত, আর ঝড় অন্যদিকে নেত্রী ছাদে গিয়ে গান গাইছেন আমার সোনার বাংলা...।

ভোরের পাতা :আপনার এলাকার কিছু অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণ চলছে। কয়েকদিন যাবত ধানখালিতে তিনফসলি জমি অধিগ্রহণ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে সভা-সমাবেশ দেখা যাচ্ছে, জমি দিতে রাজি নয় বলে তারা কাফনের কাপড় মাথায় দিয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি?
মহিব্বুর রহমান মহিব :জমি না দিলে গুলি করে দেবে, এমন ভয় দেখিয়ে মানুষদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। আর সব থেকে বড় বিষয় হলো, সরকার যদি উন্নয়নের জন্য জমি নিতে চায় তখন তো আসলে কিছু করা যায় না। উন্নয়নের জন্য তো জমি দিতেই হবে। কিন্তু তার মধ্যে যদি তিনফসলি জমি থাকে, তাহলে আমি অধিগ্রহণ করতে দেবো না।  

ভোরের পাতা :নির্বাচনের আগে ইশতেহারে বাসখালী ইউনিয়নে তিনফসলি জমি অধিগ্রহণ বন্ধে এলাকাবাসীকে যে কথা দিয়েছিলেন, তা কতটুকু রক্ষা করবেন আপনি?
মহিব্বুর রহমান মহিব :নির্বাচনী ইশতেহারে যে কথা দিয়েছিলাম তা আমি অবশ্যই রক্ষা করব। এছাড়াও পর্যায়ক্রমে কলাপাড়া উপজেলা সদরে একটি দ্বিতল কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করব। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে যথাযথ ব্যবস্থা করব। সরকারি খাস জলাভূমি জনগণের মাছ শিকারের সুযোগ নিশ্চিত করব। বিভিন্ন এলাকায় টোলমুক্ত কৃষিবাজার স্থাপন করব। সøুইস সংযুক্ত খাল ইজারামুক্ত করব। এলাকার ছোট-বড় সকল বেদখলকৃত খাল দখলমুক্ত করে খননের মাধ্যমে সচলের উদ্যোগ গ্রহণ করব। তিনফসলি জমিকে শিল্পায়ন থেকে রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করব। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকের উৎপাদিত কৃষি বিপণনকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করব। মধ্যস্তত্বভোগী দালালদের দৌরাত্ম্য হ্রাস করে মূল ক্রেতার সঙ্গে কৃষকদের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

ভোরের পাতা : আপনাকে ধন্যবাদ।
মহিব্বুর রহমান মহিব : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Ads
Ads