তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা, নদী দখলকারীরা নির্বাচন ও ঋণের অযোগ্য: হাইকোর্ট

  • ৩-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ০৯:৪১ am
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

নদী দখলকারীদের নির্বাচন করা ও ঋণ গ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসাথে রায়ে ঢাকার তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে দেশের সকল নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়কে রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে ‘আইনগত অভিভাবক’ ঘোষণা করা হয়েছে।

নদী রক্ষা কমিশন যাতে নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেজন্য আইন সংশোধন করে ‘কঠিন শাস্তির’ ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে সরকারকে। পাশাপাশি জলাশয় দখলকারী ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের তালিকা প্রকাশ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে বলা হয়েছে হাই কোর্টের রায়ে।

রোববার (০৩ ফেব্রুয়ারি) তুরাগ নদী রক্ষায় একটি রিট মামলার বিচার শেষে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাই কোর্ট বেঞ্চ থেকে ঐতিহাসিক এ রায় আসে।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে তুরাগ নদীর অবৈধ দখলদারদের নাম ও স্থাপনার তালিকা হাই কোর্টে দাখিল করেছিল বিচার বিভাগীয় একটি তদন্ত কমিটি। ওই তালিকায় আসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা পরে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হন।

উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট গত বুধবার নদী রক্ষায় রায় ঘোষণা শুরু করে। সেদিনই তুরাগ নদীকে ‘লিগ্যাল পারসন’ বা ‘জুরিসটিক পারসন’ ঘোষণা করা হয়, যা দেশের সব নদ-নদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে রিটকারীপক্ষের আইনজীবী জানান।

আইনের চোখে ব্যক্তি দুই ধরনের- নেচারাল পারসন ও লিগ্যাল পারসন। একজন মানুষ ‘নেচারাল পারসন’ হিসেবে যেসব আইনি সুবিধা ভোগ করেন, ‘লিগ্যাল পারসন’ এর ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনি অধিকার প্রযোজ্য হয়।

জীবন্ত সত্তা হিসেবে মানুষ যেমন সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে, আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করায় নদীর ক্ষেত্রেও তেমন কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হবে।

এ মামলার অবশিষ্ট রায় গত বৃহস্পতিবারই ঘোষণা করার কথা থাকলেও জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন বা বিদ্যমান আইনের সঙ্গে রায়ের নির্দেশনা যেন সাংঘর্ষিক বা পরস্পরবিরোধী না হয়, সে জন্য সময় নেয় আদালত। এরপর রোববার বিস্তারিত নির্দেশনা সহ রায় ঘোষণা করা হয়।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে এ মামলার শূনানি করেন মনজিল মোরসেদ। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একরামুল হক, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পূরবী রানী শর্মা ও পূরবী সাহা।

আদালত বলেছে, দেশের সকল নদ-নদী খাল-বিল জলাশয় রক্ষার জন্য ‘পারসন ইন লোকো পেরেনটিস’ বা আইনগত অভিভাবক হবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।

এর ফলে দেশের সকল সকল নদ-নদী খাল-বিল জলাশয়ের সুরক্ষা, সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শ্রীবৃদ্ধিসহ সকল দায়িত্ব বর্তাবে নদী রক্ষা কমিশনের ওপর।

নদী রক্ষা কমিশন যাতে কার্যকর একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পাবে, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে চার দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, নদ-নদী, খাল-বিল জলাশয় দখলের অপরাধে ‘কঠিন সাজা ও জরিমানা’ নির্ধারণ করতে হবে। সে অনুযায়ী তদন্ত ও বিচারের আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এসব বিষয় যুক্ত করে ২০১৩ সালের নদী রক্ষা কমিশন আইন সংশোধন করে ছয় মাসের মধ্যে তা হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করতে হবে।

আদালত বলেছে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সকল নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবস্থান চিহ্নিত করে একটি ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি করতে হবে। সেই ডেটাবেইজ দেশের সকল ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

নদী ও জলাশয় দখল বন্ধ করতে কিছু প্রতিরোধমূলক নির্দেশনাও আদালত দিয়েছে।

১) নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের নামের তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

২) নদী বা জলাশয় দখলকারী বা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীরা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন না। ঋণ দেওয়ার সময় আবেদনকারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আছে কি না তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

৩) জাতীয় বা স্থানীয়- কোনো ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে নদী দখল বা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ থাকলে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।

৪) দেশের সকল সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে একদিন এক ঘণ্টা ‘নদী রক্ষা, সুরক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ’ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্লাস নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে।

৫) দেশের সকল শিল্প কারখানার সকল শ্রমিক কর্মচারীর অংশগ্রহণে প্রতি দুই মাসে এক দিন এক ঘণ্ট সচেতনতামূলক সভা বা বৈঠক করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে।

৬) দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে প্রতি তিন মাসে একবার নদী বিষয়ে দিনব্যাপী সভা-সমাবেশ করতে হবে। সরকারকে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ‘তুরাগ নদীর অবৈধ দখলদার’ হিসেবে নাম আসায় যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এই রিট মামলায় পক্ষভুক্ত হয়েছিলেন, তাদের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে ৩০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছে আদালত।

রায়ে বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে বিবাদীরা স্থাপনা সরিয়ে না নিলে সরকার বিবাদীদের খরচেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ব্যবস্থা করবে। বিবাদীদের মধ্যে কেউ সরকারি ইজারার মাধ্যমে নদী তীরের জমি দখল করে স্থাপনা তৈরি করে থাকলে সেই ইজারাও বাতিল বলে গণ্য হবে।  

হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করলেও তুরাগ নদী নিয়ে এই রিট মামলা একটি চলমান মামলা হিসেবে বিবেচিত হবে যেন আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন সময় সময় পর্যালোচনা করা যায়। রায়ের একটি অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও পাঠাতে বলেছে আদালত, যাতে এ রায়ের ভিত্তিতে তিনি অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

Ads