ইশতেহারে ‘নিরাপদ সড়ক’ : সন্তুষ্ট নন ভোটাররা

  • ২০-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

বড় কোনো প্রতিশ্রুতি পাননি রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে

:: আরিফুর রহমান ::

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত ইশতেহারে দেশের সব বড় রাজনৈতিক দলগুলো ‘নিরাপদ সড়কের’ বিষয়টিকে তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়নি। দলগুলো জনগণের কাছে যেনতেনভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তারা বলেছে, ক্ষমতায় গেলে তারা দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। দেশের বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে তেমন গুরুত্ব না পাওয়ায় অসন্তুষ্ট সাধারণ ভোটাররা। তাদের মন্তব্য, অতীতে জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে নিরাপদ সড়কের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেয়নি কোনো সরকার। এজন্য বর্তমান সরকারকে তার খেশারত দিতে হয়েছে কয়েকদিন আগে ঢাকার সড়কে দুই শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে।

তারা আরো বলেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলো যে ইশতেহার দিয়েছেন আমরা তাতে সন্তুষ্ট নই। ভোটাররা আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন, কিন্তু ভোটারদের কোনো মত নেয়নি। রাজধানীসহ সারাদেশে সড়কে দিনে গড়ে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। বেপরোয়া গাড়ি চালনা, অদক্ষ চালক, সড়কে নির্মাণ ত্রুটি, গাড়ির ত্রুটি, ট্রাফিক আইন না মানাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিদিনই সড়কে প্রাণ ঝরছে। এমন প্রাণহানি বন্ধে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি জোরালো নয়। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপাসহ সব রাজনৈতিক দল নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেবেন এমনটাই আশা করেছিলেন ভোটাররা।

এ বছরের মাঝামাঝি রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় একটি কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকেই সাধারণ মানুষের এ দাবি জোরালো হচ্ছে। জানা গেছে, ২০২০ সালের মধ্যে সড়কে দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সরকার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। ধীরগতির যান চলাচলও নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়- মহাসড়ক, পুলিশ, স্থানীয় সরকার বিভাগসহ বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার কোনো নির্দেশই মানা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ ভোরের পাতাকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেটসহ বিভিন্ন মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন অবাধে চলছে। তাতে করে প্রাণহানি বাড়ছে এবং সড়কে শৃঙ্খলাও রক্ষা হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপদ ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিশ্রুতি থাকা একান্ত জরুরি। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররাই গত কয়েকদিন আগে সড়কের বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনে নেমে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত আলোড়ন করেছিল। রাজধানীসহ সারাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে এটাই বুঝিয়েছে যে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জোরালো থাকা উচিত।’ 

অভিনয় শিল্পী, নাট্যকার, নির্দেশক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মহিলা সম্পাদক রোকেয়া প্রাচী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা নেই। শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হলে পরিবহন শ্রমিকরাও সুফল পাবে। যাত্রী সাধারাণও চাইছে নিরাপদ সড়ক। এ জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার কী থাকবে তা আসলে এ সময়ের জরুরি বিষয়গুলোর একটি। কারণ নিরাপদ সড়কের জন্য এ বছরই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হয়েছে।’

আসন্ন নির্বাচন বিষয়ে এবারই নতুন ভোটার কাজীপাড়ার বাসিন্দা রিফাত আলম সানি। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে সড়কে চলতে হয়। কারণ সড়কে শৃঙ্খলা নেই, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা নেই। তাতে যানজটের তীব্রতা বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চায় ঢাকাবাসী। দেড় কোটি মানুষের মধ্যে যারা ভোটার তারা আসলে এবার দেখতে চাইবে কোন দল থেকে ইশতেহারে এ বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং কোন দলের কর্মপরিকল্পনা উত্তম। কিন্তু আমরা বড় কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাতে আমরা খুশি না। আমরা চাই, একটি আধুনিক শহর; যেই শহরে যাবে না কারও প্রাণ, আমরা চাই আইনি বিচার। আমরা এসব ইশতেহারে অবশেষে কাকে ভোট দেবো তা এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।’

যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কের বাসিন্দা আকলিমা আক্তার। এই ভোটার বললেন, ‘গণপরিবহনকে আধুনিক কোম্পানিভিত্তিতে পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নসহ পুরো সড়কখাতে শৃঙ্খলার জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ধরে অঙ্গীকার থাকতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর; কিন্তু তা-না করে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মত-ই প্রকাশ করেছেন আমাদের কোনো দাবিই এখনও পূরণ করে নেই; তারা দাবি পূরণ করেছেন কোটা আন্দোলনকারীদের।’

তাছাড়া গত কয়েকদিন আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এর সময় সারাদেশকে একটা নিয়মের মধ্যে এনেছিলো।আজ কয়েকদিন যেতে না যেতে সেই এক-ই নিয়মে চলে এসেছে। কোনো পরিবহনই মানছে না নিয়ম; বেতনে কাজ করছে না শ্রমিকরা, চুক্তিতেই চলছে পরিরহন। কিলোমিটার হিসাব করে ভাড়া নিচ্ছে না হেলপাররা। ওয়েবিল এ নেই কোনো কিলোমিটারের হিসাব; মনগড়া ভাড়া আদায় করছে। আমরা এখনও তাদের হাতে জিম্মি।

গুলশান-১-এর বাসিন্দা ও নতুন ভোটার সুজান হক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘পরিবহন শ্রমিকদের শৃঙ্খলায় আনতে হবে প্রথমে। তবেই সড়কে শৃঙ্খলা আসবে। এ জন্য নতুন আইন কার্যকরের পাশাপাশি আর কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে তা অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ করে রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’

ইশতেহারে নিরাপদ সড়কের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য এখানে তুলে ধরা হলো-

আওয়ামী লীগ: আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে ‘নিরাপদ সড়ক আইন-২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনটি প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষপে গ্রহণ করা হবে। আগামীতে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন ধারা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে এটাকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করা হবে। এছাড়া নিরাপদ সড়কের জন্য লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ট্রাফিকব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, ফিটনেসবিহীন গাড়িকে পারমিট না দেওয়া, চালকদের লাইসেন্স প্রদানে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ, সড়ক ও মহাসড়কগুলোকে ক্রমে সিসিটিভির আওতায় আনা এবং জনসাধারণকে সচেতন করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ক্ষমতাসীন এ দলটির ইশতেহারে।

বিএনপি: বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, সড়কপথে চলাচলে বিরাজমান বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটানো হবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় পার্টি: জাতীয় পার্টির ইশতেহারে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে সব রাস্তাঘাট সংস্কার করা হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোকে কমপক্ষে ৫০ ভাগ প্রশন্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে সড়ক বিভাজক (ডিভাইডার) নির্মাণ করা হবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট: জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের ইশতেহারে নিরাপদ সড়ক, যাতায়াত এবং পরিবহনের কথা উল্লেখ করেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু-কিশোররা যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে তাদের দাবিকৃত ৯ দফা দাবির আলোকে সড়ক আইন সংশোধন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য সব রকম ব্যবস্থা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হবে বলে ইশতেহারে বলা হয়েছে।

/ই
 

Ads
Ads