আজও কি নারীরা সুরক্ষিত?

  • ২৪-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ থেকে ২৩ বছর আগের কথা। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ১৪ বছর বয়সী ইয়াসমিন দিনাজপুরের দশমাইলে নিজ বাড়িতে ফিরছিল। পথিমধ্যে একদল পুলিশ তাকে পুলিশ ভ্যানে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সরল মনে ভ্যানে চরে বসে ইয়াসমিন। তখনো জানত না সে, আর কখনো বাড়ি পৌঁছানো হবে না তাঁর। ভ্যানের তিন পুলিশ সদস্য পৈশাচিক নির্যাতন করে ইয়াসমিনকে, এরপর হত্যা করে ফেলে রেখে যায় রাস্তার পাশে।

রক্ষকের ভক্ষক হয়ে ওঠার এই ঘটনা তখন দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। গর্জে ওঠে দিনাজপুরের মানুষ। ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মৃত্যবরন করেন সাতজন। ইয়াসমিন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের সেই ঘটনাকে স্মরণ করার জন্য এরপর থেকে ইয়াসমিন হত্যার দিনটিকে প্রতি বছর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

ইয়াসমিন হত্যাণ্ডের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় দুই যুগ। এর মধ্যে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, কন্যা শিশুর অধিকারের মতো ইস্যুগুলোতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি লাভ করেছে। এই সময়টাতে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে, নারীও আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, সপ্রতিভ। কিন্তু এত কিছুর পরও কি বলা যায়, নারীরা বাংলাদেশে সুরক্ষিত? বলা কি যায় রোধ করা সম্ভব হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতা? দুঃখজনকভাবে উত্তরটা নেতিবাচক ভাবে দিতে হবে।

২০১৫ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) একটি বিস্তারিত জরিপ পরিচালনা করে। সেই ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ কিশোরী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ কিশোরী জীবনে কোনো না কোনো সময় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়।

আবার গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়টি জাতীয় পত্রিকার সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে এক হাজার ৮৮৭টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

চলতি বছরেও নারী নির্যাতনের চিত্রটি আশঙ্কাজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১৮৭ জন নারী। নিপীড়নের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ জনকে আর দুজন আত্মহত্যা করেছেন। বছরের প্রথম তিন মাসে ৪৪ জন নারীকে হত্যা করেছেন তাঁদের স্বামী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫০ জন নারী যৌন নিপীড়ণের স্বীকার হয়েছেন যার মধ্যে একজন নারী আত্মহত্যা করেছেন। যৌতুকের জন্য ২১ জন্য নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, হত্যাও করা হয়েছে ২১ জনকে।

এসব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে নারী নির্যাতন বন্ধে আমাদের এখনো অনেক পথ হাঁটতে হবে।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বর্তমান সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন প্রচলিত আইনের পাশাপাশি নির্যাতনের স্বীকার নারী ও শিশুদের জন্য টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১০৯২১ নম্বর চালু করেছে সরকার। এই নাম্বারে ফোন করে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু, তাদের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট সবাই প্রয়োজনীয় তথ্য, পরামর্শ, সেবা ও সহায়তা সম্পর্কে জানতে পারবে। তবে জনসচেতনতা এবং নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন ব্যাতীত নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

Ads
Ads