বাংলাদেশে টাকার বিনিময়ে ফেসবুক-ইমোতে সেক্সের ব্যবসা

  • ৩০-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ভিডিও আলাপনের জন্য দেশে ও বিদেশে থাকা সাধারণ বাংলাদেশিদের কাছে ইমো, ভাইবার, পাল-টক এখন বেশ জনপ্রিয়। এসব জনপ্রিয় ভিডিও চ্যাটের প্লাটফর্মগুলোতে থাকা অসতর্ক কিন্তু অতিরিক্ত আগ্রহী বাংলাদেশি পুরুষদের টার্গেট করে সাইবার সেক্সের নামে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।  এসব প্রতারণা-অপরাধের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন প্রবাসী তরুণরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী তরুণের তথ্যানুযায়ী, প্রথমে ফেসবুকে থাকা বিভিন্ন গ্রুপ-পেজে নানা রকম পোস্টের কমেন্টের ঘরে মেয়েদের নামে খোলা ফেসবুক আইডি থেকে মোবাইল নম্বর লিখে একধরনের আহ্বান জানানো হয়। আহ্বানগুলো অনেকটা এরকম,“আমার সাথে ইমো সেক্স করতে আগ্রহীরা চাইলে এই নম্বরে কল করতে পারেন।”

কোথাও কোথাও শুধুমাত্র ‘প্রবাসীদের জন্য’ এই কথাও লিখে দেয়া হচ্ছে! এমনকি ভার্চুয়াল যৌন উত্তেজনা ভিডিও নাকি অডিওতে পেতে চান এসব উল্লেখ করে আলাদা দামও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। দাম দিতে হয় উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে, বিকাশের মাধ্যমে!

ফেসবুকে কয়েকটি প্রলোভন দেখানো প্রচারণার স্ক্রিনশট
মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার অফারে অনেক প্রবাসীই এসব ফাঁদে পা দিয়ে মেতে উঠছেন ভিডিও চ্যাটে, কৌশলে অপর প্রান্তে থাকা নারী বা নারী বেশধারী ব্যক্তি সেই কথোপকথনের দৃশ্য ধারণ করে রাখছে।

সেসব ধারণ করা দৃশ্য পরবর্তীতে পাঠানো হচ্ছে আলাপের সময় বিবেচনাবোধ লোপ পাওয়া তরুণের কাছে। বলা হচ্ছে আরও টাকা না দিলে ওইসব ভিডিও অনলাইনে অর্থাৎ ফেসবুক-ইউটিউবে ছেড়ে দেয়া হবে। করা হবে ভাইরাল। এতে ভয় পেয়ে অনেকেই টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানিয়েছে কয়েকজন।

কিন্তু টাকা দিয়েও যে সবাই রেহাই পাচ্ছে না, তার প্রমাণ ভেসে বেড়াচ্ছে ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউবে। রেশমি এলন, টুনটুনি আদৃতা, অলরাউন্ডার রিয়া নামধারী কয়েকজন নারীর সঙ্গে তরুণদের ইমোসহ নানা অ্যাপে করা ভিডিও চ্যাটের রেকর্ড করা ভিডিওতে সয়লাব ইউটিউব।

ইমোতে করা ভিডিও কল রেকর্ড করে ইউটিউবে রেশমি এলনসহ নানা নামে প্রচারিত হচ্ছে অশ্লীল ভিডিও
এধরনের ভিডিও পুরোপুরি পর্নোগ্রাফি না হওয়ায় ইউটিউব এসব ভিডিও প্রকাশের অনুমোদন দিয়ে দিচ্ছে দেদারসে। কিন্তু ভুক্তভোগীর ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যাচ্ছে। সাময়িক আর্থিক ক্ষতির পর সামাজিকভাবে স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইউটিউবে প্রকাশিত ইমো ভিডিও চ্যাটের এরকম অসংখ্য ধারণ করা ভিডিও।

ভার্চুয়াল এই ফাঁদ এবং ফাঁদ মুক্তির উপায় নিয়ে কাজ করেন ই-জেনারেশন লিমিটেড-এর সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষক তামজিদ রহমান।

তিনি ফেসবুক হয়ে ইমো’র ফাঁদে জড়ানোর বিষয়ে বলেন: ইমো-হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলের ফাঁদে পড়া কয়েকটি কেস দেখেছি। দেখা গেছে প্রলুব্ধ হয়ে ভিডিও কল দেয়া ব্যক্তিদের সেসব কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করে সেগুলো ইউটিউবসহ অন্যান্য সাইটে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ধাপে ধাপে টাকা নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা। এরকম ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়ে উপায় না পেয়ে কয়েকজন আমাদের দ্বারস্থ হন।

তখন এই সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ভুক্তভোগীকে কয়েকটি উপায়ে ফাঁদ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন।

ফাঁদ মুক্তির উপায়
তামজিদ বলেন,টাকা দেয়ার পর কিংবা টাকা দিতে রাজি না হলে শেষ পর্যন্ত আপত্তিকর ভিডিওগুলো ইউটিউবসহ ইন্টারনেটের অন্যান্য ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেয় অপরাধীরা। তখন আমরা সঠিক পদ্ধতিতে লিগাল রিপোর্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে ওইসব সাইটকে ভিডিওগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানাই। সঠিকভাবে রিপোর্ট করা হলে অনেকাংশেই সাইটগুলো এসব ভিডিও সরিয়ে নেয়। ইউটিউবে ভিডিও সম্পর্কে অভিযোগ করাও সহজ। সেক্ষেত্রে অভিযোগ সুস্পষ্ট অভিযোগ করতে হবে এবং ভিডিও’র কত সেকেন্ড থেকে কত সেকেন্ডে আপত্তিকর, অশ্লীল দৃশ্য-কথোপকথন আছে তা উল্লেখ করে দিতে হবে। এভাবে সময় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেয়ার পর ইউটিউব এগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়।

এছাড়া ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারে। এই অভিযোগ দায়েরের পর বিটিআরসি কিছুটা সময় নিয়ে আপলোড করা ভিডিওগুলোর পোর্ট নম্বর সরিয়ে দিয়ে আপত্তিকর ভিডিওগুলো বন্ধ করে দেয় বলে জানান তিনি।

কারা পাতছে ভিডিও কলের ফাঁদ?
এ ব্যাপারে এই সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন: সারা দেশ থেকেই কোন ব্যক্তি এবং সংঘবদ্ধ কোন কোন চক্র এধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে জেনেছি। কয়েকদিন আগে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীসহ মৌসুমী অপরাধীদের কথা জানা গেছে। তারা গ্রুপ হয়ে এসব কাজ করে। তাদের একজন হেড থাকে। তারা ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ-পেজ থেকে প্রচারণাটা চালায়। এরা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত থেকে নানা বেনামে খোলা পেজ-আইডি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ইমো’র মতো ভিডিও কলের ফাঁদ পাতা হচ্ছে। এছাড়া স্বনামেও অনেক নারী সরাসরি এসব করে থাকেন।

ইমো’র মতো ভিডিও কলের ফাঁদে প্রবাসীদের টার্গেট হওয়ার কারণ সম্পর্কে তামজিদ বলেন: প্রবাসীদের উপার্জন বেশি অথচ অবসরে সময় কাটানোর মতো তেমন কোন কিছু করার থাকে না বেশির ভাগেরই। সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পরিবার থেকে দূরে একা থাকা। এরকম মানুষদের প্রলোভন দেখানো এবং ব্ল্যাকমেল করে বেশি টাকা পাওয়ার সুযোগ থাকে।

ইমো’র মতো ভার্চুয়াল ফাঁদ বা ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেলের বিষয়ে পুলিশের কাছেও অভিযোগ রয়েছে। এধরনের ব্ল্যাকমেল এবং আপত্তিকর ভিডিও সামাজিকমাধ্যম ও অন্যান্য ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে সজাগ থাকার কথা জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ আলিমুজ্জামান।

তিনি বলেন: অনলাইনে এরকম ভিডিও কলের ফাঁদে ফেলে হয়রানির অভিযোগ আসলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এর আগেও এরকম অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। বিকাশে টাকা নিয়ে ভিডিও এবং ভিডিও ছেড়ে দেয়ার মতো অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা জড়িতদের আটক করেছি। রেশমি এলন নামের যার তৎপরতা সবচেয়ে বেশি তাকে আইনের আওতায় আনতে আমাদের একজন এডিসি নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। আলাদাভাবে আমাদের বিকাশ নির্ভর অপরাধ তদন্তেও টিম আছে।

এধরনের অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিতে দেশে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব অপরাধে পর্নোগ্রাফি কন্ট্রোল অ্যাক্ট-২০১২, আইসিটি অ্যাক্ট আপাতত আছে এরপর ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট আসছে।

কেউ এধরনের কোন সাইবার অপরাধের শিকার হলে বা অপরাধের চেষ্টা হচ্ছে জানলে বাংলাদেশ পুলিশের ,‘Cybercrime Investigation Centre,CID,Bangladesh Police’ নামে খোলা ফেসবুক পেজে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন ডিসি আলিমুজ্জামান।

তবে আইনি জটিলতা ও সামাজিক ক্ষতি এড়াতে ফেসবুক, ইমোসহ সব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সতর্কতার সঙ্গে সচেতন হয়ে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: চ্যানেল আই অনলাইন

Ads
Ads