এমডি হালিমের পেটে পূবালী ব্যাংক! 

  • ৭-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

নিয়ম বহির্ভূতভাবে ঋণ প্রদান, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যর্থতায় ডুবতে বসেছে দেশের  প্রথম প্রজন্মের পূবালী ব্যাংক। আর ব্যাংকটিকে গিলে খাচ্ছে দীর্ঘ দশক ধরে ব্যাংকটিতে পড়ে থাকা বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হালিম চৌধুরী। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, একজন এমডি আব্দুল হালিম একাই গিলে খাচ্ছেন ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকটিকে। নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন পূবালী ব্যাংককে। পূবালী ব্যাংকের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে ভোরের পাতার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব। 

২০১৪ সালে দেশের প্রথম প্রজন্মের পূবালী ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানতের ছিলো ১৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটি গ্রাহকদের মাঝে ১৪ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিলো। সব মিলিয়ে ২০১৪ সাল শেষে ২৪ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকার ব্যাংক ছিলো পূবালী। বছরটিতে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিলো ৩০৭ কোটি টাকা।

তিন বছর পর ২০১৭ সাল শেষে পূবালী ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত, ঋণ ও মোট সম্পদ সবকিছুই বেড়েছে। শুধু কমেছে ব্যাংকটির নিট মুনাফা। গত তিন বছর ধরেই পূবালী ব্যাংকের নিট মুনাফার পরিমান কমেছে। আর্থিক বিপর্যয়ের এ ধারাবাহিকতা চলছে চলতি বছরেও। অথচ আমানত, ঋণ ও সম্পদ বাড়ায় বিদায়ী বছর পূবালী ব্যাংকের নিট মুনাফা ২০১৪ সালের দ্বিগুণ হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো পথেই চলছে দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকটি। ক্রমশ খাদের কিনারে পৌঁছেছে পূবালী ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত তিন বছর পূবালী ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে আর্থিক বিপর্যয়ের পথে হাটছে। নিট মুনাফা কমতে কমতে অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ এ সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বাছ বিচার না করে ঋণ বিতরণের নামে ব্যাংকের টাকা বের করে নেয়ায়, সে টাকা আর ফেরত আসছে না। ফলে ক্রমেই ব্যাংকটি গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে। পূবালী ব্যাংককে ভবিষ্যতের বেসিক বা ফারমার্স ব্যাংক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৫ সালের শুরুর দিকে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আব্দুল হালিম চৌধুরীকে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির এমডির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তারা বলছেন, এমডি পদে আব্দুল হালিম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ব্যাংকটি ডুবতে শুরু করেছে। অর্থের প্রতি এমডির সীমাহীন লোভ, অনিয়ম- দুর্নীতি, অযোগ্যতা আর ব্যর্থতার বলি হচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিচেছন এমডি। ফলে কমিশনের বিনিময়ে বিতরণ করা ঋণ আর ফেরত আসছে না। বিগত তিন বছর পূবালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন আব্দুল হালিম। দুর্নীতির অর্থে দেশে বিদেশে বাড়ি, গাড়িসহ বিপুল সম্পরে পাহাড় গড়েছেন তিনি।

অনুসন্ধান করে পূবালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের এসব অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়। এমডি পদে আব্দুল হালিম দায়িত্ব গ্রহণের বছর ২০১৫ সালে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমান ছিলো ৯২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এটি ছিলো ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। কিন্তু ২০১৭ সাল শেষে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমান ছাড়িয়েছে ২ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এরপর চলতি বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আরো বেড়েছে। সে হিসেবে পূবালী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১০ শতাংশই এখন চলে গেছে খেলাপির খাতায়। এর বাইরে আায় অযোগ্য খেলাপি হয়ে যাওয়ায় পূবালী ব্যাংক অবলোপন করেছে ১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকাই বর্তমানে খেলাপি। খেলাপি হয়ে যাওয়া বিপুল অংকের এ অর্থের বড় একটি অংশ ঢুকেছে পূবালী ব্যাংক এমডি আব্দুল হালিমের পকেটে। এমডি হওয়ার আগে তিনি ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) পদে দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই পূবালী ব্যাংকে চাকরি করেছেন আব্দুল হালিম। সে হিসেবে গত এক যুগ ধরে ব্যাংকটির বেশিরভাগ বিতরণকৃত ঋণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের প্রথম সারির একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি জানান, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আব্দুল হালিম দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য হিসেবে ব্যাংকিং খাতে পরিচিত ছিলেন। অযোগ্যতার কারনে তিনি পূবালী ব্যাংক ছেড়ে দেশের অন্য কোন ব্যাংকে যেতে পারেননি। বিগত ৩০ বছর ধরে তিনি ব্যাংকটিতে পড়ে রয়েছেন। এজন্য দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি হওয়া সত্ত্বেও আব্দুল হালিমের সঙ্গ অন্য এমডিরা এড়িয়ে চলেন। অজ্ঞাত কোন একটি কারনে পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তাকে ব্যাংকটির এমডির চেয়ারে বসিয়ে রেখেছেন। এক্ষেত্রে এমডির কাছ থেকে পরিচালকদের অনৈতিক সুবিধা প্রদানের বিষয়টিও বিভিন্ন সময়ে সমালোচিত হয়েছে।

১৯৮৩ সালে সরকারি খাত থেকে বেসরকারি খাতে পূবালী ব্যাংককে ছেড়ে দেয়া হয়। ব্যাংকটির জন্ম হয়েছিলো ১৯৫৯ সালে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড নামে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রিয় অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকটির মালিকানা সরকারের অনুকুলে পূবালী ব্যাংক নামে স্থানান্তর করা হয়। দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম জ্যেষ্ঠ ব্যাংক হিসেবে পূবালী ব্যাংক সামনের সারিতে থাকার কথা। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে দেশের শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু পূবালী ব্যাংক পড়ে আছে পশ্চাতমুখি ধ্যানধারণা নিয়ে। তবে ১৯৮৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অগ্রগতির পথেই হাটছিলো পূবালী ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকটির এমডি হিসেবে আব্দুল হালিম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচেছ।

পূবালী ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন মতে, গত তিন বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরেও ব্যাংকটির আর্থিক বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-জুন) পূবালী ব্যাংক পরিচালনা মুনাফা করেছে মাত্র ২০০ কোটি টাকা। যদিও বিপর্যয় সত্ত্বেও ২০১৭ সালের একই সময়ে ব্যাংকটি ২২২ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফায় ছিলো। যেখানে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে। আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে ২০১৭ সালে বিনিয়োগকারীদের কোন ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন ঘটনা। এরআগে ২০১৬ সালেও ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিলো ব্যাংকটি। যদিও ২০১৫ সালে ১২ শতাংশ ক্যাশ ডভিডিন্ডে দতিে পরেছেলিাে পূবালী ব্যাংক। নগদ লভ্যাংশ দতিে না পারায় পূবালী ব্যাংকরে শয়োর কিনে বড় ধরণরে ক্ষতরি স্বীকার হচ্ছনে শয়োরবাজাররে ক্ষুদ্র বনিয়িোগকারীরা। ব্যাংকটির শেয়ার মূল্য বর্তমানে ২২ টাকায় নেমে এসেছে। যদিও মাত্র ছয় মাস আগেও পূবালী ব্যাংকের শেয়ার মূল্য ছিলো ৩০ টাকার বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই বছর ধরেই খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণে গড়িমসি করছে পূবালী ব্যাংক। গ্রাহকরে আমানতকে ঝুঁকিতে ফেলে ব্যাংকটি প্রভিশন সংরক্ষণে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময় নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও পরিস্থিতির বিচারে কিছুটা ছাড় দিয়েছে।

এসব অভিযোগের  বিষয়ে পূবালী ব্যাংক এমডি আব্দুল হালিম চৌধুরীকে ভোরের পাতা অফিস থেকে মঙ্গলবার রাত ৭ টা ৫০ মিনিটে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর এ প্রতিবেদক তার  ব্যক্তিগত নম্বর থেকে ৭ টা ৫১ মিনিটে কল করেন। এসময় তিনি অন্য আরেকটি নম্বরে কথা বলছিলেন। ওয়েটিং দেখার পর প্রতিবেদক আবারো ৭ টা ৫৮ মিনিটে তাকে ফোন করেন। যথারীতি পূবালী ব্যাংকের এমডি আব্দুল হান্নান চৌধুরী ফোন ধরেননি। এরপর প্রতিবেদক পরিচয় উল্লেখ করে তার বক্তব্য জানতে চেয়ে  কথা বলার জন্য রাত ৮ টা ০১ মিনিটে মোবাইলে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর করেননি।

(চলবে)

Ads
Ads