অশন্তোষ বাড়ছে মনোনয়ন নিয়ে

  • ৩০-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: কাওসার মাহমুদ ::

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফন্টের দলীয় মনোনয়নে বিতর্কিত দলছুট ও জঙ্গী কানেকশনে অভিযুক্ত নেতাদের দলীয় ও জোটগত মনোনয়ন দেওয়ায় বিভিন্নকারণে বিতর্কিত নেতাদের জয়জয়কার।

দেশের একতৃতীয়াংশ আসনগুলোতে উভয় জোটে বিতর্কিত এমন নেতাদের দলীয় মনোনয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী আসনগুলোতে উভয় জোট্ইে অশন্তোষ ধানা বেঁধে উঠছে। আওয়ামী জোটের অধিকাংশ বিতর্কিত এমপি ও বিএনপি জোটে দলছুট, জামায়াত-শিবির ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযুক্ত নেতারা দলীয়  মনোনয়ন পাওয়ায় তৃণমূল নেতা-কর্মীরা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেন না ওইসব প্রার্থীদের। ফলে যেসব স্থানে পুরানো দলীয় কোন্দল রয়েছে, ওই স্থানে আগুণে ঘি ঢেলে দেওয়ার অবস্থা হয়েছে। এছাড়া নতুন নতুন আসনে বিদ্রোহ ও দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠছে। তৃণমূললের মনোনয়ন বঞ্চিত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র বলছে, গত বুধবার সারাদেশে ৩হাজার ৫৬প্রার্থী  মনোনয়ন দাখিল করেছে স্ব স্ব রিটর্নিং কর্মকর্তার কাছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন চূড়ান্তের পরেও ৭টি আসন ছাড়া প্রতিটি আসন থেকে একাধিক মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। বিভিন্নস্থানে মনোনয়ন বঞ্চিতরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে ঘোষিত প্রার্থীর বিরোধিতা করে আসছে।

এছাড়া দলের  বিদ্রোহী প্রার্থী  হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পদত্যাগ করেছে একাধিক নেতা। অধিকাংশ স্থানে দলের সিন্ধান্ত মেনে নিয়ে বিদ্রোহ না করলেও চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রার্থীর পক্ষে বিরোধিতা করা নিয়ে টেনশনে রয়েছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। ক্ষমতাসীন দল গত বছর থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলেও বিএনপি নির্বাচন না করার কথা বলে আসছিল বারবার।

শেষতক কোনো উপায় না পেয়ে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে বিএনপি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বিক্রির পরই প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা নিয়ে টেনশনের মধ্যে দিন কাটছে দলের হাইকমান্ডের। দলের থেকে কঠোর নির্দেশ থাকলেও বিদ্রোহ ঠেকাতে হিমশিম খেতে হতে পারে এ দলটিকে। মনোনয়ন নিশ্চিত হলেও শেষ মূহুর্ত্বে প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। তবে তাতেও তেমন একটা পরিবর্তন আসবেনা বলে মনে করেন  নেতারা। তৃণমূলের মতামতের বাইরে গিয়ে প্রার্থী দেওয়ায় তাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয়দের দূরত্ব রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই দূরত্ব নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলেও জানান একাধিক তৃণমূল নেতা। এখনো মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মাঝে একে অপরের বিরোধী ভাব রয়েছে।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন খুব কঠিন নির্বাচন হবে। খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। প্রার্থীর বিরোধিতা কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থী হলে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে। আওয়ামী লীগের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হবে।’ কিন্তু নেত্রীর এসব নির্দেশের পরও তৃণমূলে শেষ পর্যন্ত  দলের সভানেত্রীর এ নির্দেশ কতটুকু পালন করে সেটি দেখার বিষয় বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের চিঠি দেয়া নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। বিভিন্ন দলছুট নেতা ও জঙ্গী সম্পৃক্ততার অভিযুক্ত এবং জামায়াত-শিবিরকে মনোনয়ন দেওয়ায় বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন নেতা-কর্মীরা। এদেও মধ্যে পটটুয়াখালী-৩ আসনে গোলাম মাওলা রনি ও চট্টগ্রাম-৫ আসনে জঙ্গি অর্থায়নে অভিযুক্ত ব্যরিষ্টার ফারজান শাকিলা মনোনয়ন পাওয়ায় সারা দেশে ঘওে বাইরে সমালোচনার শীকার হচ্ছে বিএনপি জোট।

এছাড়া দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলেন এমন অনেক নেতাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়নি। উল্টো যারা অতীতে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে আয়েশে দিন কাটিয়েছেন তাদের অনেকেই বাগিয়ে নিয়েছেন মনোনয়ন। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। বিশেষ করে সংস্কারপন্থীদের শেষ সময়ে দলে সক্রিয় করেই মনোনয়নের চিঠি দেয়ার বিষয়টি তারা সহজে মেনে নিতে পারছেন না। আবার অনেক আসনে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে সিনিয়র-জুনিয়র মানা হয়নি। অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর আসনে একাধিক বিকল্প রাখা হয়েছে। আবার অনেক সাবেক এমপিকে দলীয় মনোনয়নের চিঠিই দেয়া হয়নি।

সূত্র জানায়, নানা কারণে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আওয়াল মিন্টুসহ এক ডজন সিনিয়র নেতা এবার নির্বাচন করছেন না। কয়েকজন মনোনয়নপত্রই তোলেননি। এর মধ্যে রয়েছেন- দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী। মনোনয়নপত্র তুলেও নির্বাচন করছেন না যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল। আবার সাবেক এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েক নেতাকে মনোনয়ই দেয়া হয়নি। নজরুল ইসলাম নির্বাচন না করলেও তাকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড সম্ভাব্য প্রার্থীদের যে তালিকা করেছিল এর বাইরেও অনেককে বিকল্প হিসেবে চিঠি দেয়া হয়েছে। প্রতি আসনে একাধিক বিকল্প দেয়ার নামে গুলশান কার্যালয়ের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণহারে চিঠি দেয়ায় নির্বাচন নিয়ে দলের একটি অংশের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।  প্রতি আসনে একাধিক বিকল্প থাকায় আসল প্রার্থীরাও রয়েছেন আতঙ্কে। লবিং-তদবির বা আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে বিকল্প প্রার্থীকে আসল প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে এ বিষয়ে সুজন (সুসাশনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ভোরের পাতা’কে বলেন, দলগুলোর একাধিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পেছনে হয়তবা কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে এর আঁচ পড়েছে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেও উপর। কারণ হিসেবে দলগুলোর উচ্চ পর্যায় থেকে কর্মীদের কোন কোন ব্যখ্যাও দেওয়া হয়নি। তবে আপাতত দৃষ্টিতে বলা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এসব  দূরুত্ব তৈরিতে দলগুলো কি পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Ads
Ads