ধরাছোঁয়ার বাইরে জনতা ব্যাংক লুটের নায়ক ইউনুস বাদল

  • ৩১-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা জনতা ব্যাংককে একাই ধসিয়ে দিয়েছেন মো. ইউনুস (বাদল)। মাত্র ৬ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটি থেকে ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বের করে নিয়েছেন তিনি। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এননটেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে এ ঋণ নিয়েছেন এক সময়কার পরিবহণ শ্রমিক ও গাড়ি চোর চক্রের নেতা ইউনুস (বাদল)। হল-মার্ক  ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিকে ছাড়িয়ে যাওয়া দেশের বৃহত্তম ব্যাংক লোপাটের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সমালোচনার ঝড় ওঠেছিল সর্বমহলে। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল সরকারও। আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রীও। উল্টো সেই অর্থমন্ত্রীই সম্প্রতি আবার প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা জনতা ব্যাংকে খেলাপি হয়ে যাওয়া এননটেক্স গ্রুপের ইউনুস (বাদল) কে নতুন করে ঋণ দেয়ার সুপারিশ করাতে দেশব্যাপী সোরগোল পড়ে গেছে।  
যেখানে এখন পর্যন্ত ইউনুস বাদলের টিকিটিও স্পর্শ করতে পারেনি কেউ। রহস্যজনকভাবে থমকে গিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎপরতাও। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বিষয়টি না দেখার ভান করছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যাংক লুটের অর্থ দিয়ে সবমহলকে ম্যানেজ করে ফেলেছেন ইউনুস বাদল। উল্টো দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সর্ববৃহৎ কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর ইউনুস বাদলের ক্ষমতা আরো বেড়েছে। বর্তমানে জনতা ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী যে কোন সিদ্ধান্তেই হস্তক্ষেপ করছেন এ ব্যবসায়ী। ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারনেই এটি সম্ভব হচ্ছে।
তবে আব্দুছ ছালাম আজাদ বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক পর্ষদের নির্দেশনা অনুযায়ী এননটেক্স গ্রুপের ঋণের বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা চলছে। ওই গ্রাহকের কিছু ঋণ অন্য ব্যাংকে হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা আইন অনুাযায়ী, ঋণ আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

যেভাবে উত্থান ইউনুস বাদলের:
নরসিংদীর শিবপুরের সাদারচর ইউনিয়নের কালুয়ারকান্দায় জন্ম ইউনূস বাদলের। তার বাবা জালাল উদ্দিন ঢাকা বিদ্যুৎ অফিসে চাকরি করতেন। তার চাচাও বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন। তার আরো এক ভাই ও এক বোন আছেন। মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান ইউনূস বাদলের বেড়ে ওঠা অভাব অনটনের মধ্যে। লেখাপড়া খুব বেশিদূর এগোয়নি। বাসচালকের সহকারী হিসেবে  শুরু করেছিলেন কর্মজীবন। বাবা-চাচার চাকরির সুবাদে কাজ পেয়ে যান বিদ্যুৎ অফিসে। খোঁজ পেয়ে যান অর্থের উৎসের। দ্রুত ঘুরতে থাকে তার জীবনের চাকা।

বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব প্রয়াত আবদুল মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতার কথা শোনা যায়। বিদ্যুৎ অফিসে কাজ ছেড়ে ইউনূস বাদল নামেন ব্যবসায়। ২০০৪ সালে টঙ্গীর ভাদাম এলাকায় দুই একর জায়গা নিয়ে শুরু করেন ব্যবসায়িক কার্যক্রম। ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত ব্যবসা গড়িয়েছে কচ্ছপ গতিতে। ২০১০ সালে তার হাতে আসে ‘আলাদীনের প্রদীপ’।
 
বাদলের প্রতি জনতা ব্যাংকের উদার হস্ত

২০০৪ সাল থেকে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় প্রথম ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করে এননটেক্স গ্রুপের জুভেনিল সোয়েটার। এরপর স্বাভাবিকগতিতেই এগিয়েছে ইউনুস বাদলের ব্যবসা। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকেই রাতারাতি বদলে যায় তার ব্যবসার চেহারা। জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার বেশি ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। ২০১০ সাল থেকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণসুবিধা নেওয়া শুরু হয়। এক ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে এত টাকা দেওয়ায় নতুন ঋণ দেওয়ার সব সামর্থ্যই এখন হারিয়ে ফেলেছে জনতা ব্যাংকের শাখাটি।
২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত। এ সময় ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম ওরফে দীপু, টাঙ্গাইলের কালিহাতী আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী যুবলীগ নেতা আবু নাসের। মূলত: আবুল বারকাতের অতিউৎসাহি ভূমিকাতেই সীমাতিরিক্ত ঋণ সুবিধা পেয়েছে এননটেক্স গ্রুপ।
জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইউনুস বাদল পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে প্রথম ঋণ পান গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িংয়ের নামে। ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট ৮০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। এভাবে ঋণ বৃদ্ধি করে ৪৭৫ কোটি  টাকায় উন্নীত করায় পরের বছরই এ প্রতিষ্ঠানের দেনা একক গ্রাহকের সীমা অতিক্রম করে। তবে ঋণ কার্যক্রম বন্ধ রাখেনি অধ্যাপক বারকাতের নেতৃত্বাধীন তখনকার পর্ষদ। একক গ্রাহকের ঋণসীমা অতিক্রম করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ঋণের জন্য অনুমতি নেওয়া হয়নি। তার মালিকানাধীন আলাদা প্রতিষ্ঠানের নামে কৌশলে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণখেলাপি না করার অভিনব পন্থা হিসেবে এমন কৌশল নেওয়া হয়। ঋণের টাকায় তিনি আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। যে কারণে ওই সময়ে খেলাপি হননি। 
এননটেক্স গ্রুপকে উদার হস্তে ঋণ দেয়ার এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে পরবর্তী বছরগুলোতে। ২০১১ সালে ইউনুস বাদলের মালিকানাধীন সিমি নিট টেক্সকে ৯৫ কোটি, সুপ্রভ কম্পোজিটকে ৩৮০ কোটি এবং এফকে নিটের নামে ৯৬ কোটি টাকা দেয় পর্ষদ। পরের বছর সিমরান কম্পোজিটকে ৪৫০ কোটি, জারা নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, গ্যাট নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি এবং জেওয়াইবি নিট টেক্সকে ৯৩ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এমএইচ গোল্ডেন জুটকে ১৫১ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে লামিসা স্পিনিংকে ১৩৪ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্সকে ৩২০ কোটি, স্ট্রাইগার কম্পোজিটকে ৯০ কোটি, আলভী নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, এম নূর সোয়েটার্সকে ৬০ কোটি এবং সুপ্রভ স্পিনিংকে আরও ৪৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে আবার জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিংকে ৫৩ কোটি, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিংকে ১৫৫ কোটি, শাইনিং নিট টেক্সকে ৮৮ কোটি ও জারা ডেনিমকে দেওয়া হয় ৫৫ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে সুপ্রভ রোটর স্পিনিংকে দেওয়া হয় ৩০০ কোটি টাকা।

যেভাবে ঋণ দিল ব্যাংক

জনতা ব্যাংকের একাধিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান শেষে জানা যায়, কোম্পানিগুলোর নামে বিভিন্ন সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ব্যাংক নিজেই বাধ্য হয়ে বিদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ শোধ করে দিয়েছে। পরে গ্রাহক তা পরিশোধ করেনি। এভাবে নেওয়া ঋণসুবিধার (নন-ফান্ডেড) সব অর্থই সরাসরি ঋণে (ফান্ডেড) পরিণত হয়েছে। আবার দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনার জন্য নেওয়া চলতি মূলধনও (সিসি ঋণ) ফেরত দেয়নি।
২০১৫ সালে এননটেক্স গ্রুপের ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পুনর্গঠিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রুপটিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জনতা ব্যাংক। এ সুবিধার মানে হলো, প্রথমে শুধু কিস্তির টাকা পরিশোধ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন না দেওয়ায় বিষয়টি আটকে আছে। তবে এতে চুপ না থেকে এসব ঋণ পুনঃতফসিল করে দিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ।

জনতা ভবন করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন আব্দুছ ছালাম আজাদ। এখন তিনি এই ব্যাংকেরই এমডি। ঋণের বড় অংশই তিনি শাখা ব্যবস্থাপক থাকাকালীন সময়ে সৃষ্ট। তিনি দাবি করেন, তাঁর সময়ে খুব বেশি ঋণ দেওয়া হয়নি। তবে আব্দুছ ছালাম ছলচাতুরি করে বলেন, ঋণ কমাতে এননটেক্সকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, অন্য ব্যাংকে চলে যেতে বলা হয়েছে।

এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সমূহ: 

ইউনুস বাদলের এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছেÑলামিসা স্পিনিং, ইয়ার্ন ডায়িং, জুভেনিল সোয়েটার্স, সিমি নেট টেক্স, সুপ্রভ কম্পোজিট, এফকে নিট, সিমরান কম্পোজিট, জারা নিট টেক্স, গ্যাট নিট টেক্স, জেওয়াইবি নিট টেক্স, এম এইচ গোল্ডেন জুট, জ্যাকার্ড নিট টেক্স, স্ট্রাইগার কম্পোজিট, আলভি নিট টেক্স, এম নুর সোয়েটার্স, গ্যালাক্সি সোয়েটার, জারা লেভেল অ্যান্ড প্যাকেজিং, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিং, শাইনিং নিট টেক্স, জারা ডেনিম, সুপ্রভ রোটর স্পিনিং ইত্যাদি। গ্রুপটির চেয়াম্যান করা হয়েছে বাদলের ভাই ইউসুফ বাবুলকে। তবে ইউসুফ (বাদল) কানাডায় থাকেন।

এখন উদ্বিগ্ন পর্ষদ 

বর্তমানে এননটেক্স গ্রুপের খেলাপী ঋণ আদায় যেখানে অনিশ্চিত সেখানে আবার নতুন করে লুটেরা ইউনুস বাদলকে ঋণ দেয়ার অপচেষ্টায় উদ্বিগ্ন পর্ষদ।
বর্তমানে জনতা ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী যে কোন সিদ্ধান্তেই হস্তক্ষেপ করছেন ব্যবসায়ী নামধারী এই লুটেরা। ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ নতুন ফান্ড দেয়ার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মূলধনের দ্বিগুণ ঋণ দেওয়ার পর ২০১৭ সালে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জনতা ব্যাংকের এখনকার পর্ষদ। পর্ষদ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দফায় দফায় গ্যালাক্সি সোয়েটারসহ এননটেক্স গ্রুপের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করতে বলে। বারবার সময় নেওয়ার পর গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্ষদের সভায় তা উত্থাপন করা হয়। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে পর্ষদ। ঋণ প্রদান ও আদায় পরিস্থিতি দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ১৭ জানুয়ারি এননটেক্সের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণসহ অন্য ব্যাংকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মো. ইউনুস (বাদল) এ নিয়ে বলেন, ব্যাংক এখন অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। ব্যাংকের নির্দেশে ৮ প্রতিষ্ঠান অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের চেষ্টাও চলছে। আগামীতে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ভাই বিষয়টি দেখেছেন। তিনি ঋণ নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেননি।’ বাস্তবে তার সমস্থ ঋণ খেলাপী হতে শরু করেছে।

ভাগ্যবান উদ্যোক্তা
মো. ইউনুস (বাদল) একসময় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সামান্য কর্মচারী ছিলেন। ছিলেন নামকরা গাড়ি চোর। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এখন ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। এমডি মো. আব্দুছ ছালাম আজাদের মত ব্যক্তিদের যোগসাজসে ইউনুস (বাদল) এর উত্থান ঘটেছে। এ সময় ব্যাংক যেমন ছিল উদারহস্ত, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যানের। পিছিয়ে ছিলেন না ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। এমনকি সিবিএ নেতারাও ছিলেন তাঁর সঙ্গে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, ঋণ পেতে পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক করে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন সিবিএ সভাপতি রফিকুল ইসলাম। ১৯৭৩ সাল থেকে জনতা ব্যাংক গণতান্ত্রিক কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ, জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত) সভাপতি তিনি। তাঁর নামে করা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে নির্মিত হচ্ছে ২০১ গম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে ‘বাদল হেলিপ্যাড’।
ব্যাংকের কারসাজি
আইন  অনুযায়ী, একক গ্রাহককে ফান্ডেড, নন-ফান্ডেড মিলে একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ছিল দুই হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। আর এননটেক্স গ্রুপের মালিকানাধীন মেসার্স গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্নসহ ২২টি প্রতিষ্ঠান তিন বছরে ৮১৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার পর বর্তমানে তার কাছে ব্যাংক পাবে পাঁচ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদ্যমান মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। বিপুল অঙ্কের এ ঋণের বিপরীতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা এখন খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, গ্রাহকের ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে তিন হাজার ৫২৮ কোটি টাকার ফান্ডেড ও এক হাজার ১২০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ১১টির অনুকূলে এখনও ‘প্রকল্প পরিপূরক প্রতিবেদন’ ইস্যু হয়নি। ফলে আদৌ এসব ঋণের সদ্ব্যবহার হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত নয়। একজন গ্রাহকের কাছে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিল তা জানাতে বলা হয়েছে। আর এ ঋণ কেন্দ্রীভূত করার ফলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় ব্যাংকের ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন ব্যবস্থা কার্যকর নয়। এ অবস্থায় চিঠি পাওয়ার সাত কর্মদিববসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালার আওতায় ২০১৫ সালে এননটেক্স গ্রুপের এক হাজার ৯৪ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করে জনতা ব্যাংক। এই পুনর্গঠিত ঋণের কিস্তি না পেয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রুপটিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তির কারণে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। এরপর পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত না করেই বেলুনিং পদ্ধতিতে এসব ঋণ পুনঃতফসিল করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাব যায়। এ সুবিধার মানে হলো, এখন শুধু আসলের অংশ হিসাবে কিস্তি পরিশোধ করা হবে। পরে সুদসহ বাকি কিস্তি দেওয়া হবে।

নীতিমালায় যা আছে
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলো কোন কোন ঋণকে একক গ্রুপ হিসেবে ধরবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে ২০১৪ সালেই। এরপর থেকে ঋণ কমাতে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ সৃষ্টির সুযোগ নেই।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা নীতিমালায় বলা আছে, কোনো কোম্পানির মোট আয় বা ব্যয়ের ৫০ ভাগ বা তার বেশি যদি একক কোম্পানির সঙ্গে হয়, তাহলে উভয় সত্তাকে গোষ্ঠী বা গ্রুপ বিবেচনা করতে পারে। সে ক্ষেত্রেও উভয় কোম্পানিতে দেওয়া ঋণসীমা একক সর্বোচ্চ গ্রাহকের আওতাভুক্ত হবে। এ ছাড়া রপ্তানি খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো এক সময়ে ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণ মূলধনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দেওয়া যাবে। তবে এ ক্ষেত্রেও ফান্ডেড দায় মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুসারে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে একক গ্রাহক ঋণসীমা পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে। এখানে ফান্ডেড দায় বলতে ঋণগ্রহীতাকে দেওয়া তহবিল এবং নন-ফান্ডেড দায় বলতে ঋণপত্র, গ্যারান্টি, স্বীকৃতি বা কমিটমেন্টের মাধ্যমে তহবিল সহায়তাকে বোঝানো হয়েছে। তবে এসব লঙ্ঘন করেই এননটেক্স সংশ্লিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানের ঋণ কম দেখাতে পৃথক পৃথক গ্রুপ সৃষ্টি করা হয়।
 

Ads
Ads