ড. কামালের কফিনে পেরেক

  • ২৩-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ভোরের পাতা ডেস্ক
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পরে অনেকটাই রাহুমুক্ত হতে চলেছে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ চলা। অবশেষে মাটি আর আগুন ছাড়াই খুব উন্নত মানের কিন্তু হাল্কা ইট তৈরী করবে বাংলাদেশ। আগামী জানুয়ারী মাসে ট্রায়াল প্রডাকশন শুরু করলেও জুলাই থেকে তা বানিজ্যিক উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স দেবে সারাদেশে, হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট(এইচবিআরআই)। জাইকার সহায়তায় জাপানী প্রযুক্তির মাধ্যমে গত প্রায় ৪ বছর ধরেই অনেক চেষ্টার ফলে এই চরম সম্ভাবনাময় প্রকল্পের পাইলটিং শুরু করতে যাচ্ছে পূর্ত মন্ত্রণালয়।

স্টোন চিপ্স বা স্টোন ডাস্ট ছাড়াই শুধুমাত্র নদীর ড্রেজিং সয়েল দিয়ে অর্থাৎ নদী খননের মাধ্যমে প্রাপ্ত বালিমাটি দিয়ে ইট তৈরী করা হবে। যার ওজন হবে মাটির তৈরী ঈটের চেয়ে বেশ কম, কিন্তু শক্তিশালী। এখানে ইট তৈরিতে জ্বালানী হিসেবে কিছুই ব্যবহার হবে না। তবে এই ইট তৈরিতে খুব সাধারণ একধরনের বিদ্যুৎচালিত মেশিন আর কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করা হবে, শুকানো হবে ঘরের মধ্যে। এটা দিয়ে নানা সাইজের ইট তৈরী সম্ভব হবে। আবার একই মেশিন দিয়ে বিকল্প স্টোন চিপ্স তৈরী করা যাবে কম খরচে। বর্তমানে আমরা দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে ব্যবহারের জন্য ভিয়েতনাম, ওমান, থাইল্যান্ড, ভারত থেকে উন্নত মানের যেসব স্টোন চিপ্স আমদানী করে বড় বড় ভবন, ব্রীজ, রাস্তা, ইত্যাদি নির্মাণ করি তাতে দেখা যায় যে, এসব স্টোন চিপ্স এর পিএসআই (প্রেসার পার বর্গইঞ্চি) থাকে ৫০০০। কিন্তু উল্লেখিত নন-ফায়ারড ব্রিক্স মেশিন ব্যবহার করে ইচ্ছা মত আমরা ৩০০০ থেকে ১০,০০০ পিএসআই ক্ষমতার চিপস তৈরী করতে পারবো পরীক্ষিত জাপানী প্রযুক্তি দিয়ে।

জাপানের GOTO এবং TAKAHAMA নামের দুইটি কোম্পানিকে এই কারিগরি সহায়তার জন্য জাইকা মনোনীত করেছে। অনেক বাধা পেরিয়ে মেশিনগুলো এখন এইচবিআরআই এর আঙ্গিনায়। একটা কোম্পানি তার ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে তাঁর ব্র্যান্ডের মেশিন ইন্সটলেশনের কাজ শেষ করেছে, আরেকটা আগামী মাসেই শেষ হবার কথা। এর ফলে, যত ঝামেলাই হউক না কেন, এইচবিআরআই ট্রায়াল প্রোডাকশনে যেতে পারবে আগামী জানুয়ারী ২০১৯ থেকে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জুলাই ২০১৯ থেকে বাংলাদেশী বেসরকারী কোম্পানীদের জন্য ফর্মুলাসহ নন-ফায়ারড ব্রিক্স (আগুনে না পুড়িয়ে ইট তৈরী) প্রস্তুত করার প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হবে। দেশের বিভিন এলাকায় নদী তীরবর্তী এলাকায় তখন এসব নন-ফায়ারড ব্রিক্স তৈরী করার কারখানা তৈরী হবে। তবে বালিমাটির প্রকার ভেদে একেক এলাকার জন্য ফমূলাও ভিন্ন হবে, তারই বিস্তারিত গবেষণা হবে এইচবিআরআইতে। ফলে বাঁচবে নদী, লাখ লাখ লোকের কর্ম সংস্থান হবে, শহরমূখী জনস্রোত কমবে, কমবে বস্তি, বাঁচবে পরিবেশ, চরমভাবে কমে যাবে পরিবেশ দূষণে মারা যাওয়া মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা (প্রায় ৮০ হাজারের বেশী মানুষ মারা যান পরিবেশ দূষণ জনিত কারণে)। এছাড়াও প্রতি বছর বিপুলহারে আবাদী জমি নষ্ট হওয়া বন্ধ হবে, কেনোনা মাটির তৈরী ইট পোড়ানো আর দরকার হবে না।

একটা পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। একরে হিসেব করলে বাংলাদেশের মোট ভূমির পরিমাণ ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার একর। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, বছরে বাড়ছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। বছরে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এক হাজার হেক্টর জমি। নির্মাণ কাজের কারণে বছরে বিলীন হচ্ছে তিন হাজার হেক্টর জমি। গেল ৩৭ বছরে শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে! পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যে দেশে মোট ইট ভাটার সংখ্যা ৪ হাজার ৫১০ উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির হিসেবে ইট ভাটার সংখ্যা ৬ হাজারের অধিক। মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ৫০ হাজার একর আবাদি জমি এই ইট ভাটাগুলোর দখলে রয়েছে। প্রতিটি ইট ভাটায় বছরে গড়ে ৭৫ হাজার করে ইট প্রস্তুত হলে এবং ইট প্রতি গড়ে সাড়ে তিন কেজি করে মাটি ধরলে এতে প্রায় ১৫ কোটি মেট্রিক টন মাটি লাগে। এর ফলে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। উন্নয়নের ধাক্কায় শামিল হতে বাড়ছে রাস্তাঘাট। সে ক্ষেত্রেও শাবল/কোদাল চালানো হচ্ছে কৃষি জমির ওপর। এখনো আলোর মুখ দেখেনি ‘জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০’ এবং ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১০’।

আমরা মুখে মুখে বলি সোনার বাংলায় আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সোনা। কিন্তু আমরা তা চিনে নিতে পারি না। আমরা চিনি না, কোনটা সম্পদ, আর কোনটা অনাদরে অবহেলায় পড়ে আছে যুগ যুগ ধরে। এমনই একটা সম্পদ আমাদের দেশে বর্ষায় উজানের ঢলে নেমে আসা লক্ষ কোটি টন পলিমাটি আর বালি, পাথরের কণা। যা আমাদের নদী ভরাট করে, নদীর ভাঙ্গন লক্ষ লক্ষ মানুষকে করে গৃহহারা, উদ্বাস্তু। যারা ভাসতে ভাসতে একসময় শহরের বস্তিবাসী হয়ে ওঠে। বস্তিকে ঘিরেই গড়ে ওঠে অপরাধ আর নানা অপকর্মের কেন্দ্রস্থল, জন্ম হয় নতুন নতুন অপরাধীর। অসৎ মানুষের টাকা আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবেও কাজ করে।

২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ঢাকা শহরের ৫০ শতাংশ হেরোইনের জোগান আসে শুধু আগারগাঁওয়ের বিএনপি বস্তি থেকে। অবৈধ এই বস্তি কোন ক্ষমতাসীন সরকার উচ্ছেদ করতে পারে নি। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বস্তিবাসীর মালিকের পক্ষের আইনজীবী হয়েছেন ড. কামাল হোসেন গং। যিনি বিদেশে যাবার ওজুহাতে অনৈতিকভাবে আবেদনের পর আবেদন দিয়ে মামলার শুনানীর সময় বাড়িয়ে মোটা অংকের টাকা আয় করেন। একারণে হেরোইনের ব্যাবসা থাকে চালু, আর এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত সবারই আয় হয় বেশুমার। ফলে, সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঐ জায়গার দখল পেতে। ইতোমধ্যে হেরোইনের জোগানদার আর ব্যারিস্টার সাহেবদের পকেট মোটা হয়, দেশের হয় বিপুল ক্ষতি। এইচবিআরআইএর ৫০ একর জমির প্রায় তিন দিক ঘিরে ১৫ একর জমিতে অবৈধ বস্তি ও মার্কেট গড়ে তুলেছে অপরাধীরা। এঁদের বড় অংশ তোলা হয় জাইকার প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের জন্য পরিদরশন শেষে। ছুটির দিনের দুই রাতে মাঝেই জাইকার প্রকল্পের নিরাধারিত স্থান বস্তিতে উঠে সয়লাব হয়ে যায়। ঢাকার কল্যাণপুরে এইচবিআরআই এর বেদখল জমি উদ্ধারে ২২ জানুয়ারী ২০১৬ তারিখে উচ্ছেদ অভিযান চালায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। উচ্ছেদে গেলে আবার ড. কামাল হোসেন এসে উচ্ছেদ ঠেকিয়ে দেন আদালতের মাধ্যমে। ঝুলে যায় একটা অমিত সম্ভাবনার প্রকল্প। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও একটার পর একটা আবেদন দিয়ে সময় বাড়িয়েছেন ড. কামাল হোসেন, বিচারপতিরা প্রায় সবাই আইন পেশায় তার জুনিয়র, তিনি এই অনৈতিক সুযোগটাই নেন। এর আগে এই প্রকল্পটি নারায়ণগঞ্জে করতে গেলেও প্রায় একই ধরণের সমস্যায় পড়ে পূর্ত অধিদপ্তর। তাই এটি এইচবিআরআই এ স্থানান্তর করা হয়।

নগরায়ণে ভবন তৈরিতে ইট বা ব্লক অন্যতম উপাদান। উন্নত দেশগুলোতে মাটি পোড়ানো ইট অনেক আগে থেকেই নিষিদ্ধ। কারণ, পাথর থেকে জটিল প্রক্রিয়ায় মাটি তৈরী হতে লাগে হাজার হাজার বছর। সেই মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরী করার কোন মানে হয় না, যদি বিকল্প থাকে। উন্নত দেশে বালি আর পলিমাটির সাথে কিছু কেমিক্যাল আর অন্য কিছু উপাদান মিলিয়ে পোড়া মাটির ইটের চেয়ে উন্নত ইট বানানো হয়। তাতে দুটো লাভ, এক হচ্ছে তাদের নদীগুলোতে ড্রেজিং খরচে উঠে আসে ইট তৈরির কাঁচামাল। ফলে ইট তৈরির খরচ হয় কম। অন্যদিকে, নদী ভাঙ্গন কমে যায়, মানুষ আর বাস্তুহারা হয় না। ইউরোপের দেশগুলো এখন আমাদের মত দেশ থেকে পলিমাটি আর বালির ইট বা ব্লক আমদানী করতে চায়, এর চাহিদাও ব্যাপক। ভারতে ইতোমধ্যে এই ধরণের কিছু ফ্যাক্টরীর কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও এটি শুরু করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকার কল্যাণপুরে এইচবিআরআই এর জমিতে এই রিসার্চ করার জন্য জাপান ও চীন উদ্যোগ নিলেও আমাদের আইনজীবী ড. কামাল হোসেন আর তার সহযোগিদের কারণে সম্ভব হয়নি এতদিন। গত ২৫ বছরের বেশী সময় ধরে ড. কামাল হোসেন বস্তিবাসীর সেবা করছেন বলে গত ২৮ মার্চ ২০১৭ সিপিডি আয়োজিত এক গোল টেবিল বৈঠকে তিনি নিজে মুখে দাবী করেন। এর অর্থ এই যে, গত ২৫ বছরের বেশী সময় ধরে তিনি বস্তি বানিজ্যে নিয়োজিত ও অন্যান্য অপরাধীদের সহায়তা করছেন টাকার বিনিময়ে, উন্নয়ন ব্যহত করে, আইনী সহায়তার নামে।

কল্যাণপুরে এইচবিআরআইএর কাজ হলো এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার নদী থেকে ড্রেজিং থেকে পাওয়া পলিমাটি আর বালি সংগ্রহ করে ইট তৈরির একাধিক ষ্ট্যাণ্ডার্ড ফর্মুলা তৈরী করে তা বেসরকারী খাতে ছড়িয়ে দেবে। তখন রেডিমেড পোশাক শিল্পের মত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে নতুন সম্ভাবনার উন্নত ইট/ চিপ্স তৈরির শিল্প। তৈরী হবে ভবন তৈরির সস্তা কাঁচামাল, যা আমাদের দেশের অন্যতম সমস্যা। হবে বেশুমার রপ্তানী, তৈরী পোশাকের মত বালি আর পলিমাটির তৈরী উন্নত ইট। সস্তায় গ্রাম এলাকায় পাকা বাড়ি তৈরী সহজ হবে, ফলে আবাসন কাজে ব্যবহার হওয়া আবাদী জমি নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পাবে। ইতোমধ্যেই সরকার আইন করেছেন যে অনাবাদি জমিতে, মানে দেশের বিভিন্নস্থানে জেগে ওঠা চর এলাকার প্রায় ১০০টি স্থানে গড়ে তোলা হবে শিল্পাঞ্চল বা স্পেশাল ইকোনমিক জোন, যাতে আবাদযোগ্যা কৃষি জমি নষ্ট না হয়।

মাটি আর আগুন ছাড়াই খুব উন্নত মানের কিন্তু হাল্কা নন-ফায়ারড ইট তৈরীর এইচবিআরআইএর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থ হলো দেশের উন্নয়ন বিরোধী ড. কামাল হোসেনের গংদের অসৎ উদ্দেশ্যের কফিনে একটা বড় পেরেক ঢুকানো।

Ads
Ads