মাত্র ৩০ মিনিটেই ডাক্তার শিক্ষক ব্যাংকার

  • ২৮-Jul-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ভোরের পাতা ডেস্ক
ডা. গোলাম কিবরিয়া। ৫ বছর ধরে বিশেষজ্ঞ এই চিকিত্সক প্র্যাকটিস করছেন ঢাকার মিরপুরে। র্যাব-৪ এর ভেজালবিরোধী মোবাইল কোর্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মিরপুরের স্টেডিয়াম-সংলগ্ন পিসিল্যাব নামের প্রাইভেট চেম্বারে হানা দেয়। র্যাব সেখান থেকে ডা. গোলাম কিবরিয়াকে গ্রেফতার করে। র্যাবকে তিনি জানান, তিনি ভারত থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। এ সংক্রান্তে তিনি এমবিবিএস ও মেডিসিন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রির সার্টিফিকেট দেখান। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর র্যাব জানতে পারে সার্টিফিকেট জাল। পরে গোলাম কিবরিয়া স্বীকার করেন, তিনি ১২ হাজার টাকায় এই সার্টিফিকেট কিনেছেন। আর এই সার্টিফিকেট তৈরি করতে লেগেছে আধা ঘণ্টা। মাত্র আধা ঘণ্টায় তিনি হয়ে ওঠেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। কমল কৃষ্ণ পাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জাল করে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে বেসরকারি একটি ব্যাংকে বড় পদে চাকরি করে আসছেন। কিন্তু তিনি ধরা পড়েছেন। তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। মারুফ আহমেদ। ২০০২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হন। পরে একটি বুটিকশপে সেলসম্যানের কাজ নেন। ছয় বছর ধরে তিনি সেখানে কাজ করছেন। প্রতি বছরই সামান্য বেতন বাড়ে। কিন্তু কোনো প্রমোশন নেই। কারণ তার কাছে উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নেই। তাই প্রমোশনও হচ্ছে না। উপায় না পেয়ে তিনি এক বন্ধুর পরামর্শে নীলক্ষেতের একটি কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে যোগাযোগ করেন। পরে ১০ হাজার টাকায় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (এসএসসি ও এইচএসসি) জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে অফিসে জমা দেন। এর দুই বছর পর তিনি ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জাল করে সৈয়দপুর মহিলা মহাবিদ্যালয়ে একজন প্রভাষক চাকরি খুইয়েছেন। শুধু টাকা খরচ করলেই মিলছে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডসহ সরকারি- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও মেডিকেল কলেজের সনদ। মিলছে জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংক সার্টিফিকেটসহ যেকোনো সনদ। এসব সনদ এত নিখুঁতভাবে তৈরি, খোলা চোখে দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো জাল! তফাত শুধু একটাই, এই সনদটির বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ, হল অফিস ও প্রশাসনিক ভবনে রেকর্ড নেই। চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই না করলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আধা ঘণ্টায় তৈরি করা সার্টিফিকেটে একেকজন হয়ে উঠছেন ডাক্তার, ব্যাংক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তা।  এই জাল সনদে চলছে শিক্ষকতা, ব্যাংকার ও ডাক্তারির মতো পেশা। রয়েছে জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদও। ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি করছেন সরকারি কর্মকর্তাও। জাল সনদে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ে কর্মরত আছেন অনেকেই! এমন অনেক ঘটনা বিভিন্ন সময় ফাঁস হয়েছে। পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের অভিযানে এই চক্রের একাধিক সদস্য আটক হলেও থেমে নেই দৌরাত্ম্য। এদের সঙ্গে কম্পিউটার দোকান মালিক ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী জড়িত বলে একাধিক তদন্তে জেনেছেন গোয়েন্দারা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী চক্র নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেট, গাউসুল আজম মার্কেটে অবৈধভাবে জাল সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের নথি তৈরির কাজ করে আসছে। তবে এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়টি প্রশাসনসহ অনেকে জানলেও চক্রটি থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ জালিয়াতি আটকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতাও সন্তোষজনক নয়। মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযানেই সীমাবদ্ধ সংস্থাটি। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ভোটার আইডি কার্ড, স্কুল, কলেজ, থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের জাল সার্টিফিকেট তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি এমবিবিএস কোর্সের সার্টিফিকেটও মিলছে অহরহ। নীলক্ষেত যেন জাল সার্টিফিকেটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। র্যাব-পুলিশ প্রায় অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের ধরে সাজা দিচ্ছে। কিন্তু তাতেও থেমে নেই জাল সনদ তৈরির সিন্ডিকেট। মাত্র ১২ হাজার টাকায় মেলে চিকিত্সকের সনদ! সূত্র জানায়, নীলক্ষেতে দিনে কাজের অর্ডার নিয়ে রাত ৮টায় মার্কেট বন্ধ হওয়ার পর অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগ নিয়ে চলে সার্টিফিকেট তৈরি ও কেনাবেচার রমরমা ব্যবসা। ৩ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এসব সনদে নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা বসিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিদিন আড়ালে আবডালে চলছে অবৈধ এ রমরমা ব্যবসা। খুবই গোপনে বিভিন্ন কৌশল আর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু অসাধু চক্র দিনের পর দিন অবৈধ এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এতে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।  জাল সনদ প্রমাণের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা চাকরি খুইয়েছেন। একই কারণে বিদেশে অধ্যয়নরত অনেকে হারিয়েছেন ছাত্রত্ব। কত লোক জাল সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরি করছেন তার কোনো পরিসংখ্যানও কারও কাছে নেই। বিভিন্ন সময়ে জাল সনদে চাকরির অভিযোগে কর্মস্থল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন অসংখ্য পেশাজীবী। তাদের মধ্যে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিত্সকসহ নানা পেশার লোকজন রয়েছেন।

বেশিরভাগ লোকই জাল সনদ ব্যবহার করে বিদেশে চাকরি করে থাকেন। কেউ ধরা পড়েন, কেউ পড়ছেন না। ২০১০ সালে জনতা ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সনদ যাচাই করলে তা জাল প্রমাণিত হয়। অথচ তিনি জাল সনদেই দীর্ঘদিন চাকরি করছিলেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ‘জাল সার্টিফিকেট তৈরির মতো অপরাধ আমাদের সমাজে এখনো ব্যাপকভাবে বাড়েনি। তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তা বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কারণ এতে যুবসমাজ মারাত্মকভাবে প্রতারিত হচ্ছে। কঠোর আইন আর সামাজিক সচেতনতাই এটিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এর প্রচলন এখনই বন্ধ করতে না পারলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Ads
Ads