স্মার্ট মন্ত্রিসভা: প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতার পরিচয়

  • ৭-জানুয়ারী-২০১৯ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

একঝাঁক (৩১) নতুন মন্ত্রীর শপথের মধ্য দিয়ে শুরু একাদশ সংসদ সদস্যদের নিয়ে গড়া নতুন মন্ত্রিসভার পথচলা। যাতে আবার প্রথমবারের মতো সাংসদ হয়েই মন্ত্রিত্ব লাভের স্বাদ গ্রহণ করেছেন অনেকে। এটাই ছিল একাদশ সংসদ সদস্যদের নিয়ে গড়া মন্ত্রিসভার চমক। যা দুদিন আগেই সরকারের সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন। আমরা বিনা দ্বিধায় এবারের মন্ত্রিসভাকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে স্মার্ট মন্ত্রিসভা বলতে পারি। দু-চার জন ছাড়া যাদের বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র, সজ্জন। যাতে বাদ পড়েছেন বেশ কিছু রাঘব ও হেভিওয়েট মন্ত্রীসহ ৩৬ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী। যাদের মধ্যে এমনসব মন্ত্রীও রয়েছেন যারা ছিলেন বরাবর বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত। অনেকে ধারণা করেছিলেন ওই বিতর্কিত মন্ত্রীরা এবার সংসদ নির্বাচনেও বাদ পড়তে পারেন। কিন্তু তা না হওয়ায় অনেকেই শেখ হাসিনার প্রতি হতাশ হয়েছিলেন। কিন্তু তারা মন্ত্রিসভা থেকে ঠিকই বাদ পড়লেন।

এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ক্ষমা করেননি। এরা অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত বক্তব্যদানের জন্যও সমালোচিত ছিলেন। বলাই বাহুল্য, বাদ পড়া মন্ত্রীদের প্রায় সবাই ‘আনস্মার্ট’ ছিলেন। তাদের বচনবাচনও ছিল আনস্মার্ট, রুরাল, গাড়লস্বভাবের। এদের কারো ভাষা, আচার-আচরণ এতোটাই আফ্রিকার জঙ্গলের বর্বরপ্রকৃতির ছিল যে, তাদের কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় ‘শিক্ষার্থী’ মরে, আর সে মন্ত্রী পরমানন্দচিত্তের সঙ্গে হাস্যরস করে। ব্যঙ্গরস করে। যেমন সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। এজন্য এবার একবাক্যে সকলের প্রত্যাশা ছিল তার মন্ত্রিত্ব যেন বাদ যায়। যে কারণে তখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই বিরক্ত হয়েছিলেন। হ্যাঁ, হয়তো সেকারণেই তার বাদ পড়াটা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। আর সেটাই হয়েছে।   

ফলে এবারের সংসদ নির্বাচনের প্রকৃতি নানা মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও নতুন স্মার্ট মন্ত্রিসভা দেখে দেশের তরুণসমাজসহ সবাই একবাক্যে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। কেননা, এর আগের কিছু কিছু মন্ত্রী ছিলেন যাদের বক্তব্যের প্রকৃতি দেখে খোদ সরকারদলীয়সহ প্রায় সবাই চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে আছেন, মোহাম্মদ নাসিম, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, আবুল মাল মুহিত, মতিয়া চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু প্রমুখ। এরা সময়ে সময়ে এমন সব বক্তব্য দিতেন যে তারা যেন ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ করতেন। সবকিছুকেই যেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। পারলে হয়তো তারা খোদ প্রধানমন্ত্রীকেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন, এমনই প্রকৃতি ছিল তাদের। বিশেষ করে সাবেক নৌমন্ত্রী তো সেরকমই। প্রধানমন্ত্রীকেও উপেক্ষা করে নেপথ্যে থেকে দেশজুড়ে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়ে দেশের মানুষকে চরম ভোগান্তিতেও ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু তিনিসহ তারা মোটেও ভাবতেন না যে, দেশ আর আগের ষাট দশকের মতো গ্রাম্য অবস্থায় নেই। গ্রামেও পৌঁছে গেছে শহরের ছোঁয়া। নিম্ন শ্রেণির পরিবারেও উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু ওইসব মন্ত্রী যেন চিরকালের জন্য গ্রাম্যই থেকে গেলেন। নয়তো একজন মন্ত্রী কী করে বলতে পারেন, ‘৩০ তারিখের পর ওদের সবাইকে ‘কবর’ দিবো’? এ কেমন হিংস্রভাষা! তিনি কি ‘গোরখোদক’ নাকি মন্ত্রী? একজন মন্ত্রী কী করে বলতে পারেন যে, ২৭ তারিখের পর, ৩০ তারিখের পর ওদের সবাইকে দেশ ছাড়া করবো, এলাকা ছাড়া করবো, যারা নৌকায় ভোট দেবেন না, তারা সবাই নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যাবেন’, দেশ ছেড়ে চলে যাবে- এসব কি কোনো সভ্য মন্ত্রীর বক্তব্য হতে পারে নাকি আদিম রাজরাজরা যুগের ‘বর্বর বক্তব্য’ হতে পারে? সে মন্ত্রী তো সুস্পষ্টভাবেই বর্ণবাদী! উন্নত বিশে^ হলে নিশ্চয়ই তাকে কারাগারে পোরা হতো। সেটা যখন পোরা হয়নি, তারপরও এহেন মন্ত্রীদের যখন ‘বহিষ্কার’ করা হয়েছে এতেই দেশবাসী মহান প্রভুর কাছে শোকরিয়া জ্ঞাপন করছে!

আরেকটি বিষয় ছিল দুর্নীতি। যাদের বিদায় করে দেওয়া হয়েছে তাদের অধিকাংশই ছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত। এবারের নির্বাচনের হলফনামায় দেখা গেছে তারা কীরকম অর্থবিত্তে ফুলেফেঁপে উঠেছেন। ওটা তো হলফনামায় প্রকাশিত রূপ। কিন্তু বাস্তবের রূপটা তো দেশবাসী জানেন না। নিশ্চয়ই তাতেই প্রধানমন্ত্রী আঁচ করতে পেরেছেন। অনেকের তো কয়েকশ গুণ অর্থবিত্ত বেড়েছে। সেক্ষেত্রে সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান তো সবাইকেই ছাড়িয়ে গেছেন।

এক্ষেত্রে তারা যদি আরো পাঁচ বছর মন্ত্রিত্ব ভোগ করার সুযোগ পেতেন তাহলে কোনোই সংশয় নেই তারা গত দশ বছরে যা কামিয়োছেন তার দশবিশগুণ বেশি কামাতেন। দেশটাকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলতেন। তাদের বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের সে স্বপ্ন চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছেন। এখন আমরা প্রত্যাশা করবো, দুদক যেন তাদের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসেব নেন। তাদের কাউকেই যেন ছাড় না দেওয়া হয়। তাহলেই আমরা মনে করবো সরকার প্রকৃত অর্থেই সুশাসনের দিকে এগিয়ে চলেছেন।

Ads
Ads