শপথ নিলেন সাংসদরা: অভিনন্দন জনপ্রতিনিধিদের

  • ৩-জানুয়ারী-২০১৯ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সারাদেশে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়ে গেল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। আগামী সোমবার মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আমাদের পক্ষ থেকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। এবার গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন নারী ও তরুণ ভোটারসহ সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত।

এই কলামে আমরা নারীদের পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে ভোটদানে সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। ইসি সে নিরাপত্তার কোনোই কমতি না রাখায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি নারী ভোটারের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটদানের হার ৮০ শতাংশের কিছু বেশি, যা এ দেশের ইতিহাসেই নজীরবিহীন ঘটনা। অর্থাৎ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি বিবেচনায় একাদশ জাতীয় নির্বাচন সবদিক দিয়েই অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে মনে করি আমরা। যদিও বিরোধী দল তথা ঐক্যফ্রন্ট দাবি করছে এ নির্বাচনে তাদের স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ নিয়ে তারা গতকাল ইসিতে স্মারকলিপিও পেশ করেছে। তবে ইতোমধ্যেই বিশ^নেতৃবৃন্দ এ নির্বাচনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং শেখ হাসিনাকে হ্যাট্রিক জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। 

 এবারের নির্বাচনে ১৯৭০ সালের মতো আওয়ামী লীগ মহাবিজয় লাভ করিয়াছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে তারা এককভাবেই পেয়েছে ২৫৯টি আসন। আর মহাজোটগতভাবে তাদের মোট আসনসংখ্যা ২৮৮টি। এই নিরঙ্কুশ জয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের এই ভূমিধস বিজয়লাভে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে দেশে-বিদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিপুল জনপ্রিয়তা এবং তার সরকারের প্রচেষ্টায় দেশের বিস্ময়কর উন্নয়ন অভিযাত্রা। পক্ষান্তরে বিরোধী পক্ষ নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই ছিল রাখালবিহীন পশুপালের মতো ছন্নছাড়া। তাদের নেতৃত্বহীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা, জনবিচ্ছিন্নতা, ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট দিতে না পারা, প্রচার-প্রচারণায় অবহেলা ইত্যাদি নানা কারণেই তাদের ভরাডুবি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। 

ভোটগ্রহণের কয়েকদিন আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা তাদের প্রার্থী ও পোলিং এজেন্টদের সকাল সকাল কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালটবাক্স খালি আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশনা দেন। রাত জেগে কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কথাও বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেশের ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্রের প্রায় কোথাও এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

একটি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দলের এজেন্ট এবং ১৪ হতে ১৭ জন অস্ত্র ও লাঠিসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থাকেন। এবার এর বাইরেও ছিল সশস্ত্র বাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের টহল। এহেন প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বের তথা পশ্চাৎপদ উন্নয়নশীল একটি দেশে যতটা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করা যায়, তার বেশি প্রত্যাশা করাও বোকামি বলে আমরা মনে করি। এমনকি ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় গণতান্ত্রিক দেশেও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কেবলমাত্র ইউরোপের দেশগুলোতেই প্রায় শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির পাওয়া যায়। সুতরাং দুঃখজনক হলেও বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার ঘটনা আমাদের উপমহাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিরই অংশ বলেই মেনে নিতে হবে। আর আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতার ভাষাও কিন্তু এই সংস্কৃতির প্রকাশক। যা আমরা প্রায়শই তাদের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে প্রকাশ হতে দেখি। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের নির্বাচনও সহিংসতামুক্ত নয়। আমরা তাদের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের ভাষার দিকেও সেটা মিলিয়ে দেখতে পারি। যা ইউরোপের রাজনৈতিক নেতাদের মুখে তেমন একটা দেখা যাবে না। অর্থাৎ সে হিসেবে গুটিকয় ব্যতিক্রম দেশ বাদ দিলে একটি পারফেক্ট বা শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন বর্তমানে বিশ্বের কোথাও অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় না।

কাজেই এবারের নির্বাচনে ঘটে যাওয়া ভুল থেকে আমাদেরও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নেতাকর্মীদের আচার-আচরণে, ভাষা ব্যবহারে আরও আধুনিক হতে হবে। সুসভ্য হতে হবে। পাশাপাশি দেশের ভোটারদের সচেতন হতে হবে। ভোটারদের মনে রাখতে হবে, মানুষের ভাষা, আচার-আচরণেই পরিস্ফূট হয়, সে ব্যক্তি কতটা সুসভ্য, মার্জিতজ্ঞানসম্পন্ন ও আধুনিক। যে দলের ভেতরে এরকম নেতার সমাবেশ বহুল পরিমাণে থাকবে, মনে করতে হবে তারাই একটি অনাধুনিক দেশকে উন্নত রুচিসম্পন্ন করতে সক্ষম। তারাই দেশের জনগণের প্রতি অধিকতর দায়িত্ববান হবেন। আর এভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা জোরদার হতে পারবে। পশ্চাৎপদ মানুষের দ্বারা আর যাইহোক নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। তারা শত উচ্চশিক্ষিত হলেও সম্ভব না। তারা স্রেফ ‘গোবরে পদ্মফুলের’ মতো। তাদের পক্ষে চরিত্রের উন্নতি ঘটানো সম্ভব নয়। এখন আমরা প্রত্যাশা করব যে, আগামী নতুন সরকারের সক্রিয়তায় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। আর তা বজায় থাকলেই উন্নয়নের ধারায়ও আরও গতিশীলতা দেখা দেবে।

Ads
Ads