বিজয়ের মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সশ্রদ্ধ সম্মান

  • ১-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

শুরু হয়েছে বিজয়ের মাস। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটা ডিসেম্বর মাস হলেও আমাদের কাছে এর বিশেষ তাৎপর্য হিসেবে বিজয়ের মাস হিসেবেই আদৃত। ইংরেজি বছরের শেষ এই মাসটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উজ্জ্বলতম একটি মাস। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে গৌরবজনক বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়েই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটেছে বাংলাদেশের। বলা যায় একপ্রকার জীবনবাজি রেখেই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে তাড়িয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার শপথ নিয়েছিল দেশের বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। বিজয়ের মাসের সূচনার দিনটিকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয় কয়েক বছর আগে। আমরা মনে করি, বিজয়ের এই মাসের প্রথম দিনটি মুক্তিযোদ্ধা দিবস করার তাৎপর্য অপরিসীম। আমরা জানি যে, একটা সময় এমন ছিল, যখন মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য নতুন প্রজন্মকে জানানো হতো না। 

একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু এই একাত্তর হঠাৎ করে আসেনি। একটা ধারাবাহিক আন্দোলন আর সংগ্রামের পথ বেয়েই এমন এক পর্যায়ে আসতে হয়েছিল। এরপরই আন্দোলন-সংগ্রামের এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ এসে যায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী মাথা গরম করে চূড়ান্ত হার্ড লাইনে যায় বাঙালির বিপক্ষে। আর তাতেই সুযোগ এসে যায় বাঙালির জন্য পাল্টা আঘাতের। দেশ বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন করার লড়াইয়ের। তারই চূড়ান্ত রূপ একাত্তর। একাত্তরের ইতিহাস বলতে গেলে তার সঙ্গে আসে তার পূর্ববর্তী ইতিহাসও। সে ইতিহাস থেকেও বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। মুদ্রার এক পিঠের অপর পিঠ থাকেই। একে অস্বীকার করা যাবে না। সেই পিঠের নামই হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। 

প্রাথমিক পর্যায়ের সূচনাপর্বের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সেই ভাষা আন্দোলনটিই পরবর্তীতে বেগবান স্রোতের মতো বাহিত হয়ে পৌঁছেছিল একাত্তরে এসে। এই পথের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে ছয় দফার আন্দোলন। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে রয়েছে এদেশের মানুষের বহু ত্যাগ, বহু অশ্রু, অনেক জীবনদানের ঘটনা। ছয় দফার আন্দোলনের সঙ্গে এক পর্যায়ে যুক্ত হয় এগারো দফার আন্দোলন। আর ১৯৭০ সাল। সে বছর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন এবং সে নির্বাচনে দেশের মানুষের বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের ঘটনা। 

তারপর একাত্তরের মার্চ। ১ মার্চ। এলো ৭ মার্চ। সেদিনের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং তাতে সুস্পষ্ট ঘোষণা ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এলো ২৫ মার্চ। পাকিস্তানি বাহিনীর সুপরিকল্পিত সামরিক আক্রমণ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো পাকিস্তানে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো চূড়ান্ত অধ্যায়- যার অপর নাম প্রতিরোধ, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, দেশ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ।

এই যুদ্ধে রুখে দাঁড়াল এ দেশের বীর সন্তানরা। এরাই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস বারবার বিকৃত করা হয়েছে। স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর নাম পর্যন্ত মুছে ফেলা হয় এসব  বিকৃত ইতিহাসে। 

কিন্তু যার ডাকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র, ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশ থেকে শত্রু বিতাড়নের ইস্পাতকঠিন শপথ নিয়ে। এনেছিল ৯ মাসের যুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আজকের বিজয়ের মাস, ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ। নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করল হানাদাররা ঢাকানগরীর রেসকোর্স তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

দেশ শত্রুমুক্ত হলো। স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ হলো। অর্জিত হলো মহান বিজয়। এসব গৌরবের ইতিহাসকে কতোদিন কাদের পক্ষে আড়াল করা সম্ভব? সুখের বিষয়, সেইসব দিন বিগত আজ। আজ নবীন প্রজন্মও জানতে পারছে সঠিক ইতিহাস। গৌরবের অধ্যায় সৃষ্টির সেই বিজয়ের মাস শুরু হলো। এ মাসের প্রথম দিনটি মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালনের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল সেটা ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। আরও ব্যাপকভাবে সরকারি উদ্যোগে এই দিবস প্রতিবছর পালন করার উদ্যোগ নেওয়া হোক। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো ধরে রাখার ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হোক। মুক্তিযোদ্ধাদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নিলে তাদের মহান কীর্তির প্রতিই সম্মান জানানো হয়। বিজয়ের মাসে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান।

Ads
Ads