নির্বাচনী ইশতেহার: লোকরঞ্জন নয়, দায়বদ্ধতাই প্রত্যাশিত

  • ২৮-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

প্রতিটি নির্বাচনেই অংশগ্রহণকারী দলগুলোর পক্ষে থেকে এমন একটি লিখিত ইশতিহার পাঠ করা হয়, যা থেকে জনগণ ধারণা নিতে পারেন দলটি সরকারে গেলে কতটা জনবান্ধব হতে পারবে কি পারবে না। যদিও আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারই ওইসব ইশতেহারের ‘ই’ও বোঝেন কি বোঝেন না, তা বিস্তর প্রশ্নসাপেক্ষ। তারপরও যেহেতু নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলের ইশতেহার দেওয়ার একটা রেওয়াজ আছে, তাই এটা না দিলেই নয়। কিন্তু সে ইশতেহার দেশের মানুষের শতভাগ বুঝুক বা না বুঝুক, যারা ইশতেহার দেবেন তারা যেন এটা শতভাগ বুঝেশুনেই দেন, আমাদের পক্ষ থেকে দলটির প্রতি থাকবে এতটুকুই সনির্বন্ধ অনুরোধ। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যে, আর যা-ই হোক, জনগণ যেন সে ইশতেহার থেকে প্রতারিত না হয়। ধোঁকা যেন না খায়, বেকুব যেন বনে না যায়। সে ইশতেহার শতভাগ না হোক সিংহভাগ যেন বাস্তবায়ন ঘটে, এমন ইশতেহারই প্রত্যাশিত। কেননা, একটি দলের নির্বাচনী-পূর্ব ইশতেহারই হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ সরকারের রূপকল্প। বলাই বাহুল্য যে, এই ইশতেহারে কী থাকবে না থাকবে তা পাঁচ বছরের জন্যই সীমিত। কেননা, সংবিধান অনুযায়ী জনগণ তাদেরকে ওই ‘পাঁচ বছর’ এর জন্যই ক্ষমতায় পাঠায়, শত বছরের জন্য নয়। অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ী জনগণের পক্ষ থেকে বরাদ্দ পাঁচ বছরে তারা কী করতে পারবে বা করবে, ইশতেহারে ততটুকুই সে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার থাকবে। শত বছরের প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার নয়। অতটুকুই যথাযথভাবে করতে পারলেই জনগণ সন্তুষ্ট। তখন এই সন্তুষ্টির পুরস্কার হিসেবেই জনগণ আবার তাদের ক্ষমতায় আনবে, তা নিশ্চয়তার সঙ্গেই বলা যায়। আর জনগণের ওপর দলগুলোর এই ভরসা আছে বলেই প্রত্যেক দলই চায় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে। তবে এর জন্য সব বিধান, বিশেষ করে আচরণবিধি মেনেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হতে হবে। অসংবিধানিকভাবে, বলপূর্বকভাবে বা কোনো প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নয়। 

আমরা দেখি যে, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে ছিল তাদের ইশতেহারে ঘোষিত ২১ দফা। যেখানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতিসহ গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সবার জন্য বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, রাজবন্দিদের মুক্তি ইত্যাদি অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। ইশতেহার বস্তুতপক্ষে ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক দলের একইসঙ্গে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার। আগামী বছর তারা সরকারের রুটিন কাজের বাইরে আরও কোন কোন কাজ বিশেষভাবে করবেন তার বিবরণী তাতে থাকে। জনগণ এটার ভিত্তিতেই তাদের কাজের বিচার করবে।

কিন্তু এসব ভুলে গিয়ে প্রার্থীরা যখন নিজ এলাকার সমস্যা নিরসন ও উন্নয়নের এতসব গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন যে, তখন আমরা এই ভেবে বিস্মিত হই, নেতারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তা তো পূর্ণ করতেই লাগবে শত বছর! কিন্তু জনগণ তো তাকে ক্ষমতায় পাঠাচ্ছে মাত্র পাঁচ বছরের জন্য। কেন সে এমন গালভরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আওড়াচ্ছে! আমরা প্রত্যাশা করব কোনো নেতা যেন এমন প্রতিশ্রুতি না দেন, যা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রতিশ্রুতি দিতে হবে সাধ্যের ভেতরে থেকেই, সাধের ভেতরে থেকে নয়। কেননা, সময়ে সময়ে সাধ এতো লম্বা হয়ে যায় যে, তা শত বছরের পূর্ণ করা সম্ভব নয়। সত্যি বলতে কি, মানুষ অধিকাংশ রাজনীতিকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে এই গালভরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের জন্যই। ফলে রাজনৈতিক দলের ঘোষিত ইশতেহার নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। এমনকি যিনি দলের পক্ষে থেকে টিভি পর্দার সামনে বসে ওই ইশতেহার পাঠ করেন তিনি তা পাঠের আগে আদৌ দু-একবার পড়ে দেখেন কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ আছে।
কাজেই আমরা মনে করি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অর্থবহ করতে হলে শুধু ওই টিভি পর্দার সামনে বসে পাঠই নয়, বরং ভোটের বেশ আগেই দল বা জোটের ইশতেহার তথ্যমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া উচিত। এর ভিত্তিতেই হওয়া উচিত দলের প্রচার। তাতে মানুষ প্রার্থী ও দলের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতির বিষয়েও সজাগ-সচেতন হবে। তখন রাজনৈতিক দলের ওপর জনগণের কাছে একটা জবাবদিহির দায়ও ভর করবে। 

গত কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে, বড় দুই দলের ইশতেহারে ইতিহাস এবং ভাষাগত কিছু পার্থক্য থাকলেও তাদের কর্মসূচিতে তেমন একটা পার্থক্য নেই। দেশের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারগুলো ভালোভাবে নিশ্চিত হওয়া দরকার, কর্মসূচি বাস্তবায়নে দক্ষতা ও দুর্নীতির বিষয়টিও বিশেষ বিবেচনায় থাকা উচিত। তাতে ভোটাররাও প্রার্থী ও দল বাছাই করতে গিয়ে আরো বেশি পরিপক্বতার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ আমরা এমনভাবে ইশতেহার, প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকারগুলো দেখতে চাই না, যা না বুঝতে পারে জনগণ চিরকালই ‘বোকা’ই থেকে যায়। 

আমরা মনে করি নির্বাচনকালীন ইশতেহার প্রকাশ শুধু একটি রেওয়াজ রক্ষার মধ্যেই সীমিত থাকতে পারে না। এটি হওয়া উচিত একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রামাণ্য দলিল। এ নিয়ে সমাজে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনার ঐতিহ্য তৈরি হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় হবে। আজ-কালের মধ্যেই সব দল ও জোটের নির্বাচনী ইশতেহার ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হবে আশা করছি। এরপর তথ্যমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা এগুলোর ওপর আলোচনা করবেন। বিচার-বিশ্লেষণ করবেন। তা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াই হোক আর প্রিন্ট মিডিয়া বা অনলাইন মিডিয়াতেই হোক। সেসব আলোচনা, বিচার-বিশ্লেষণও যেন স্বচ্ছতাপূর্ণ হয়, সে প্রত্যাশাও থাকবে আমাদের। আবদ্ধ চিন্তা-চেতনায় যুক্ত না থেকে বরং মুক্ত আলোচনার সূচনা করলে তখন ভোটাররা উপকৃত হবেন, ভোটার হিসেবে পরিপক্ব হতে পারবেন। যা সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতেও তা সহায়ক হবে হবে বলে আমরা আশা করছি।

Ads
Ads