ধইঞ্চার জীবন-রহস্য: এই সাফল্য যেন বিফলে না যায়

  • ২৪-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা এখন একের পর এক চমকপ্রদ আবিষ্কার করে চলেছেন। আর এর মধ্যদিয়ে প্রমাণিত হয়ে উঠছে যে, মেধায় বাংলাদেশও আর পিছিয়ে নেই। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পেলে এ দেশও বিশ্বকে অনেক কিছু দিতে পারে। 

উদ্ভিদতাত্ত্বিক দিক থেকে যদিও পাটের মাসতুতো ভাই ধইঞ্চা, তদুপরি এর আদর সেই তুলনায় অনেক কম। ‘সোনালি আঁশ’ পাট যতটা আদরণীয়, ‘সবুজ সার’ ধইঞ্চা সে তুলনায় একেবারেই অবহেলিত। সে জন্যই দেখা যায়, রাজনীতিতে যখন কোনো কর্মী উপেক্ষিত থাকেন তখন তিনি রাগত কণ্ঠে অন্যদের শুনিয়ে বলেন, ‘আমি কি ধইঞ্চা’ যে আমাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে? বা কেউ যদি অনুরূপ অবহেলিত থাকেন তখন বলা হয় ওরা তো ‘ধইঞ্চা’ মাত্র- এ ছাড়া কারো কাছে ওদের কানাকড়িরও মূল্য নেই। সেই অবহেলিত ধইঞ্চার যেন এবার সুদিন ফিরেছে। পাটের পর আবিষ্কার হয়েছে এবার এই ধইঞ্চারও ‘জিনোম কোড’।  

অস্বীকার করা যাবে না যে, পাট যেভাবে সরাসরি ‘অর্থকরী’ ফসল, ধইঞ্চার সুফল সেভাবে সরাসরি পাওয়া কঠিন। কিন্তু ভূমির মানোন্নয়ন ও সংরক্ষণে এর অবদান সুদূরপ্রসারী। ধইঞ্চা থেকে মাটিতে উৎসারিত নাইট্রোজেন কৃত্রিম রাসায়নিক সারের মাধ্যমে পেতে কেবল বিপুল খরচ হয় না, ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে উর্বরতা শক্তিও। পরিবেশ ও প্রতিবেশগত সুফল বিবেচনায় যে কারণে এর নাম ‘সবুজ সার’। ভূমি ক্ষয় রোধেও ধইঞ্চার যে অবদান, নদীমাতৃক বাংলাদেশে তা অর্থ দিয়ে পরিমাপের অবকাশ নেই। নদীভাঙন রোধে লোকায়ত ব্যবস্থা ‘বান্ধাল’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধইঞ্চার গুরুত্বও ভুলে যাওয়ার নয়।

এটা অত্যন্ত খুশির খবর যে, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা পাটের পর এবার ধইঞ্চারও জিনোম কোড বা জীবন-রহস্য উন্মোচন করতে পেরেছেন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের আমরা অভিবাদন জানাই। পাশাপাশি বর্তমান সরকারকেও আমরা সাধুবাদ জানাতে চাই। পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন থেকে আমেরিকার বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন সেন্টার থেকে কোড নম্বর পাওয়া পর্যন্ত যেভাবে আর্থিক ও নীতিগত সহযোগিতা ধরে রাখে, তার সুফল এখন আমাদের হাতের নাগালেই। পাটের সূত্র ধরে এখন ধইঞ্চার জীবন-রহস্যও উন্মোচিত হলো। এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এই সহযোগিতা চলমান থাকলে এ দেশের অন্যান্য ফসলের জীবন-রহস্য উন্মোচনও সহজ হবে। 

এখন প্রয়োজন এসব সাফল্যের সুফল ভোগ করা।  এতোদিন ধরে যে ধইঞ্চার অবহেলিত উদ্ভিদ হিসেবে ছিল এখন থেকে তার সদ্ব্যবহার উদ্দেশে এর চাষেও মনোযোগ দিতে হবে। আমরা মনে করি, ধইঞ্চার জিনোম কোড উন্মোচনের খবর যেমন অনুপ্রেরণাদায়ক, তেমনই বাড়তি দায়িত্বের কথাও মনে রাখতে হবে। এ কথাও ঠিক যে, নগদ লাভ সীমিত থাকায় চাষিরা ধইঞ্চা চাষে ততটা উৎসাহী নয়। যেখানে কি-না খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমিই সীমিত হয়ে পড়ছে, সেখানে ধইঞ্চার জন্য জমি বের করা তো মুসকিলও বটে। কিন্তু আমরা যদি এই ব-দ্বীপের ভূমির উর্বরতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই; যদি সর্বনাশা রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাই; তাহলে ধইঞ্চা চাষ বৃদ্ধির বিকল্প নেই।  আমাদের মনে রাখতে হবে বিজ্ঞানের প্রায় সব আবিষ্কার মানব কল্যাণই বয়ে আনে। অকল্যাণ নয়। ধইঞ্চার জীবন-রহস্যের আবিষ্কারও তাই। এখন যদি সবুজ সার হিসেবে ব্যবহার উদ্দেশে এর চাষাবাদ বাড়ানো না যায়, তাহলে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব যে মাঠেই মারা যাবে, কোনোই সংশয় নেই।

Ads
Ads