রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন: কোনোভাবেই ‘স্থগিত’ করা যাবে না

  • ১৪-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

আজ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপ। তবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী এই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার মধ্যেই শুরু হয়েছে নতুন উদ্ভূত সংকট। বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে যে অনেক রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের ভয়ে তাদের ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। এ খবর আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না।

যৌথ কর্মদলের প্রথম সভায় বাংলাদেশের পক্ষে আট হাজার রোহিঙ্গার যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে ‘যাচাই-বাছাই’ করে প্রথম ধাপে সাড়ে চার হাজার ফেরত নিতে সম্মত হয়েছিল মিয়ানমার। চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন ১৫০ জন করে ফিরে যাবে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলে আজই চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ১৫০ রোহিঙ্গা ফিরে যাচ্ছে। তবে এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মিশেল বাশেলেট বলেছেন, রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগে ফেরত পাঠানো হলে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা ওই জনগোষ্ঠীর জীবন ফের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে বাংলাদেশে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সকল বাধা উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে, মিশেল বাশেলেট তার বিবৃতিতে বলেছেন, শরণার্থীদের বলপূর্বক ফেরত পাঠানো হলে তা হবে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’।

এখনও তাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত মিয়ানমার সরকার নেয়নি। সেখানে তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ফলে সেখানকার পরিবেশ রোহিঙ্গাদের কতোটা অনুকূলে থাকবে সে উদ্বেগ থেকেই জাতিসংঘ এই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ বরাবরই জানিয়ে আসছে যে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, কাজেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানও মিয়ানমারকেই নিতে হবে। এতে বাংলাদেশের করণীয় কিছু নেই। এদিক থেকে বাংলাদেশ সরকার অবশ্যই যৌক্তিক অবস্থানে রয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে এতোদিন যে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বহীন ছিল তখন কোথায় ছিল এই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ? এখন বাংলাদেশের ওপর প্রায় বারো কোটি রোহিঙ্গার বোঝা চাপিয়ে তারা কতোদিনে তাদের ‘নাগরিকত্ব’ আদায় করবে? এতোবড় একটা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কেন মাত্র একটি ছয় লাখ বর্গমাইলের দেশকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য করতে এতো সময় লাগবে? এ অবস্থায় এহেন ছুতা ধরে যদি ফের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত রাখা হয় তাহলে বরং সেটা মিয়ানমারকেই উৎসাহিত করা হয়। কারণ তারা তো এমনিতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া মাসের পর মাস বিলম্বিত করে আসছে। আর তারা এটাই চায়। এখন কি তবে জাতিসংঘ তাদের সেই ইচ্ছাকেই আরো প্রলম্বিত করতে চায়? এ দিকে ক্যাম্প থেকে শত শত রোহিঙ্গা পালাতে শুরু করেছে। এটা বাংলাদেশ সরকারের জন্য নতুন সংকটের সৃষ্টি হবে। সামনেই নির্বাচন। এখন সুযোগসন্ধানীরা তাদেরকে ব্যবহার করে নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অচলাবস্থার সৃষ্টির প্রয়াস পায় কিনা সেটাও ভেবে দেখতে  হবে।   

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, নিবন্ধিত ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র সাড়ে চার হাজার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রেই যদি এই পরিস্থিতি হয়, তাহলে বাকিরা যাবে কীভাবে? আমরা এও জানি, শরণার্থী শিবিরের বাইরে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে। গত বছর নতুন করে সহিংসতার আগে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ গত দুই-তিন দশকে নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আনুকূল্য নিয়ে মূল স্রোতে মিশেও যেতে পেরেছে। গত বছর আসা রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও কি একই পরিণতি চাইছে কেউ কেউ? আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সমাজ, শৃঙ্খলা ও অর্থনীতির জন্য এই প্রবণতা ভয়ানক হতে বাধ্য। আমরা নিশ্চয়ই নিপীড়িত একটি জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল। আমরাও চাই মিয়ানমারের সব নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা সহকারে বসবাস করুক; কিন্তু সেই দায় কাঁধে নেওয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছে রাখাইনের অঘটনমুখর ও অনিশ্চিত জীবনের তুলনায় হয়তো শরণার্থী জীবনই শ্রেয় মনে হয়েছে। আমরা দেখছি, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষও এটা বলতে চাচ্ছে যে, রাখাইনের পরিস্থিতি এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের অনুকূল নয়। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কর্মরত উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের কাছে এখনই প্রত্যাবর্তন শুরু না করার দাবিও জানিয়েছে। 

আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিষয়ে ইতোমধ্যে যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যত কঠিনই হোক তার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। অন্যথায় ইতোমধ্যে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো মিয়ানমারের পক্ষে ঠুনকো অজুহাত তুলে হাত গুটিয়ে বসে থাকা সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের কার্যকর প্রত্যাবর্তনে মিয়ানমারের ওপরই চাপ সৃষ্টি করতে হবে জাতিসংঘসহ  এ যাবৎ বাংলাদেশের অনুকূলে থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। 

তাছাড়া মিয়ানমার যে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের  দৃশ্যমান ‘আন্তরিকতা’ দেখাচ্ছে, তাতেও সবার প্রত্যাবর্তনে অনেক দিন লেগে যাবে। কখনো এমনও হতে পারে যে কোনো ছুতায় তা আবার স্থগিতও করে দিতে পারে। সে আর অস্বাভাবিক কি। কাজেই তখন স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশেও রয়ে যাবে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে অবস্থানকালে তাদের খাদ্য, বাসস্থানসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠবে।

বাংলাদেশকে এমনিতে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এখন উটকো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমরা চাই না অনাকাক্সিক্ষত নতুন কোনো সংকট জড়িয়ে যাক। কাজেই জাতিসংঘ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি এখানে অবস্থানরতদের মানবিক সহায়তাও অব্যাহত রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখতে হবে দু’তরফেই।  রোহিঙ্গা প্রর্ত্যাবর্তন স্থগিতের নামে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যও অনুকূল হতে পারে না।
 

Ads
Ads