শুরু হলো কোটামুক্ত চাকরির যুগ

  • ১৯-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

রাজনৈতিক আন্দোলনের বাইরে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে দেশের ইতিহাসে পর পর দুটো ঘটে যাওয়া ছাত্র আন্দোলন স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। একটি বড়দের ছাত্র আন্দোলন আরেকটি ছোটদের ছাত্র আন্দোলন। ছোটদের ছাত্র আন্দোলনে পরে বড়রা যোগ দেওয়ার ঘটনাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে। এর মধ্যে একটি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারবিষয়ক আন্দোলন অন্যটি হচ্ছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন। দুটো ছাত্র আন্দোলনই প্রাথমিকভাবে সফল বলতে হবে। এই সাফল্যের অংশ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে সংসদে আইন পাস করা হয়েছে। আর গত সোমবার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা থাকবে না- এ সুপারিশ করেছে কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা বিষয়ে গঠিত কমিটি। 

এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের জানান, নবম থেকে ১৩তম গ্রেডের সব পদ মেধার ভিত্তিতে পূরণ করা হবে। এতে কোনো মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে না। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের সংক্রান্ত এক প্রশ্নে তার মন্তব্য ছিল- ‘এখন কোটা না থাকলেও চলতে পারবে।’ তবে গতকাল প্রতিবন্ধী আইন অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে এক শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি।

এখন আমরা ধরে নিতে পারি, যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। যেটা আন্দোলনে যাওয়া ছাত্রদের প্রধান দাবি। বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ৫৫ শতাংশ নিয়োগ হয় অগ্রাধিকার কোটায়। বাকি ৪৫ শতাংশ নিয়োগ হয় মেধা কোটায়। এ নিয়ে উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে গত এপ্রিল মাসে। তাদের আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল অবিস্মরণীয়। অনেক জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এ ইস্যুতে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। যদিও একপর্যায়ে সরকারের তরফে অভিযোগ উঠতে থাকে, ‘একটি ধান্ধাবাজ মহল দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য এ জনপ্রিয় আন্দোলনকে কাজে লাগাচ্ছে।’ তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একপর্যায়ে ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জানিয়ে দেন ‘সরকারি চাকরিতে কোনো কোটাই আর থাকবে না’- যে বক্তব্য নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ বা আবেগের অতিশয়োক্তি বিশেষ। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার গঠিত কমিটির সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণারই প্রতিফলন ঘটেছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’র নেতারা প্রথম শ্রেণির চাকরিতে কোটা না থাকার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। এ জন্য তারা দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারিরও আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এ আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রেফতারকৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি করেছেন তারা। তবে আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনে হামলা এবং গুজব রটিয়ে দেশকে অরাজক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে তৎপর ছিল, নিশ্চিত প্রমাণসাপেক্ষে তাদের আইনের আওতায় আনা যেতেই পারে।

তবে কোনোভাবেই সন্দেহবশত কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়। লঘুপাপে গুরুদ-ও প্রত্যাশিত নয়। কেননা, আমাদের সবাইকে এটা কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না যে, কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। আর জনগণের আন্দোলন বলতে যা বোঝায় সেখানে এই ‘স্বতঃস্ফূর্তি’ই প্রধান শর্ত। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ আন্দোলনেই থাকে ‘চাপিয়ে দেওয়া’র ঘটনা। আর এই ‘চাপিয়ে দেওয়া’র বিষয়টি কখনোই ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ঘটনা হতে পারে না। এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনে ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা বাদ দিলে এ আন্দোলন ছিল যথেষ্ট শান্তিপূর্ণ। দলমত নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তাতে সাড়া দেয়। আর এটা বুঝেই প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দেন, ‘সরকারি চাকরিতে কোনো কোটাই থাকবে না।’ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়ে সরকারও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য তো বটেই, আমরা মনে করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এ আন্দোলন শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। 
 

Ads
Ads