পৃথিবীতে এমন কলঙ্কজনক ঘটনার নজির নেই

  • ২১-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ইব্রাহিম হোসেন

২১ আগস্ট ২০০৪ সাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশে অব্যাহত জঙ্গি হামলার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতি বিরোধী’ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। হামলার মোড় অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য নোয়াখালীর সেনবাগের সহজ-সরল জজ মিয়াকে দিয়ে ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানো হয়। হামলার ১৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনও বিভীষিকাময় সেই হামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি।

কী ঘটেছিল সেদিন? আসুন, চোখ ফেরাই সেদিকে- আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ হামলার অন্যতম অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন মুফতি হান্নান। অন্য একটি মামলায় ইতিমধ্যে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মুফতি হান্নানের ভাষ্যমতে, ঘড়ির কাঁটা তখন পাঁচটার ঘর পেরিয়ে গেছে। হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি), প্রায় ১৫ জন জামায়াত কর্মী ও অন্য হামলাকারীরা প্রস্তুত। যেহেতু মঞ্চ ছিল একটি ট্রাক। তাই শেখ হাসিনার অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। ঠিক হয়, বক্তৃতা শেষ করে মঞ্চ থেকে নামার সময় শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালানো হবে।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করলেন। তবে শেখ হাসিনা মঞ্চ থেকে নামলেন না। ফটোসাংবাদিকদের অনুরোধে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন। বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেনেড ছোঁড়ার নির্দেশ রয়েছে। গ্রেনেড ছোঁড়া হল এবং শেখ হাসিনা মঞ্চ থেকে নেমে এতক্ষণে যেখানে যাওয়ার কথা, গ্রেনেড সেখানেই ফাটল। বিকট শব্দে ভয়ার্ত মানুষ চারদিকে ছুটতে লাগল। একটার পর একটা গ্রেনেড ফাটতে লাগল। চারদিকে বইল রক্তের স্রোত। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনার চারপাশে মানববেষ্টনী তৈরি করে ফেলল। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম পুলিশ প্রটোকল না পেয়ে নিজেই পুলিশের গাড়ি ড্রাইভ করে শেখ হাসিনাকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যান। গাড়িতেও বৃষ্টির মতো চারদিক থেকে গুলি করা হল। অন্যদিকে পুলিশের নিক্ষেপ করা কাঁদানে গ্যাস অপরাধীদের ওপর না পড়ে পড়ল জনসভায় আসা কর্মীদের ওপর। কাঁদানে গ্যাসের কারণে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে গেল।

হামলায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভী রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন আওয়ামী লীগের তিন শতাধিক নেতাকর্মী। সাংবাদিক, সাধারণ মানুষও রেহাই পায়নি। বর্তমান মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য গ্রেনেড হামলার ক্ষতচিহ্ন শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন।

পুলিশ হামলার আলামত নষ্ট করার জন্য রাতেই ঘটনাস্থল পরিষ্কার করে ফেলে। হামলার মোড় অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য সাজানো হয় ‘জজ মিয়া নাটক’। ২০০৫ সালের ৬ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা বীরকোট গ্রাম থেকে থানায় ডেকে এনে দিনমজুর সহজ-সরল জজ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। এ মামলায় দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বানিয়ে সিআইডির তিন কর্মকর্তা (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) রুহুল আমিন, আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমান জজ মিয়াকে দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নেন। বিনিময়ে তার মাকে প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা করে নিয়মিত প্রদান করেন তারা। জজ মিয়াকে গ্রেফতার করার সময় তার মা জোবেদা খাতুনকে সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, আপনার ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছি। তাকে ভালো চাকরি দেব, আপনারা সুখে থাকবেন। সে অনুযায়ী রুহুল আমিনের কাছ থেকে প্রতি মাসে জোবেদা খাতুন টাকা নিয়ে আসতেন।

সহজ-সরল জোবেদা খাতুন একদিন টেলিভিশনে দেখলেন, তার ছেলেকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, তার ছেলেকে আসামি বানানো হয়েছে। এ সময় গণমাধ্যম কর্মীরা বীরকোট গ্রামে যান সংবাদ সংগ্রহের জন্য। মায়ের অনুপস্থিতিতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে জজ মিয়ার বোন খোরশেদা বেগম ভুল করে বলে ফেলে, সিআইডির দেয়া টাকা দিয়েই চলে তাদের সংসার। এভাবে ফাঁস হয় জজ মিয়া নাটক। এর পর ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট টাকা দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৪ বছর ২ মাস ২৫ দিন কারাভোগের পর ২০০৯ সালের ২৬ জুলাই কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জজ মিয়া।

পৃথিবীতে এমন কলঙ্কজনক ঘটনার নজির খুব বেশি আছে কি? এ ঘৃণ্য ঘটনার নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া উচিত ছিল অনেক আগেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। মূলত এর পেছনে রয়েছে নানা স্বার্থবাদী অপচিন্তা। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে এ সংক্রান্ত মামলা ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে নানাভাবে। এর উদাহরণ জজ মিয়া নিজে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্বিতীয় দফায় অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে গ্রেনেড হামলার নীলনকশা। আগামী মাসেই রায় হবে এ মামলার। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি ঘৃণ্য এ হামলার পরিকল্পনাকারীসহ দোষীদের।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর 

Ads
Ads