তিন প্রজন্মের স্যার আইয়ুব বাচ্চু

  • ২০-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: আবেগ রহমান ::

গান বাঁধা ছিল আইয়ুব বাচ্চুর জন্য একটা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার মাত্র। ক্যারিয়ারে সঙ্গীতের সব ক্ষেত্রেই তিনি সমানতালে বিচরণ করেছেন। এজন্য জীবদ্দশায় অনেকের চক্ষুশূলও হয়েছিলেন। 

সঙ্গীত ক্যারিয়ারে যে মাধ্যমেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। বরং একটা যুতসই প্রশ্ন হতে পারে, সঙ্গীতের কোথায় তিনি হাত দেননি! এককথায় বলা যেতে পারে, সব শাখাতেই তিন পটুয়া ছিলেন। সঙ্গীতে পটুয়া আইয়ুব বাচ্চু জিঙ্গেল মাস্টার ছিলেন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও করেছেন।

একক, ব্যান্ড, মিক্সড আর ডুয়েট অ্যালবামে এবি প্রায় তিন দশক অডিও বাজারে রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। সিনেমার প্লেব্যাকে ‘অনন্ত প্রেম’, কিংবা ‘আম্মাজানের’ মতো গানগুলো এখনও গণমানুষের মুখে মুখে। তিনি সমানতালে সব বাদ্যযন্ত্রও বাজাতে পারতেন।

এককথায় তিনি গিটারিস্ট, বেইজ গিটারিস্ট, কি-বোর্ডিস্ট কিংবা ড্রামার সবারই আইকন ছিলেন। তাঁকে অনুকরণ-অনুসরণ করে শত শত তরুণ সঙ্গীত ক্যারিয়ারে ঝুঁকেছেন। সঙ্গীতে শত শত ছাত্র তৈরি হয়েছে। যেমন সোলস ব্যান্ডের গিটারিস্ট পার্থ বড়ুয়া তাঁর সরাসরি ছাত্র। এমন অসংখ্য উদহারণ রয়েছে। তাঁর সুর-সঙ্গীতে একক ক্যারিয়ার গড়েছেন আজকের শিল্পী তপন চৌধুরী, নাসিম আলী খান, এসআই টুটুল, হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল, আলম আরা মিনু, ঝলক, শফিক তুহিন, রুপম, আরিফ সুজন, কানিজ সবুর্ণা, প্রমুখ। সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তিনি খ্যাতির তুঙ্গে ছিলেন সবসময়। তপন চৌধুরী ও কুমার বিশ্বজিতের স্রোতানন্দিত অসংখ্য গানের সঙ্গীত পরিচালক আইয়ুব বাচ্চু।

সবার কাছে ব্যান্ড সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি মূল ঘরানার সাথে সবকিছু ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলেছিলেন। সুবীর নন্দীর মতো শিল্পীদের সঙ্গে তিনি সমানতালে কাজ করে গেছেন। একটা সময় অডিও বাজারে তাঁর সুর-সঙ্গীত ছাড়া অন্য কিছুর চাহিদাই ছিল না। তাই বলা চলে, বাংলাদেশের সঙ্গীতে আইয়ুব বাচ্চুর মতো বহুমাত্রিকতা আর দ্বিতীয় কারও ছিল না। আসলে সঙ্গীতের সব শাখাতে তাঁর বিচরণ নিয়ে লিখে শেষ করা যাবে না। তিন দশক ধরে ঘুম ছাড়া বাকি সময় তিনি মিউজিকেই ডুবে ছিলেন। নিজে গেয়েছেন, অন্যদেরও তিনি ব্যস্ত রেখেছিলেন।

এককথায় তিন প্রজন্মের ভক্তদের 'স্যার' আইয়ুব বাচ্চু। সমকালে সহকর্মীদের কাছে সবচেয়ে ঈর্ষণীয় একজনই- তিনি আইয়ুব বাচ্চু। ভক্তদের বিশাল সীমারেখা পেরিয়ে সতীর্থদের মাঝেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে উদ্যমী, প্রাণবন্ত। সতীর্থদের সবাইকে ধরে ধরে অ্যালবামে একসঙ্গে গেঁথেছেন, গাইয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর কালজয়ী সেই তুমি, কষ্ট পেতে ভালোবাসি, এখন অনেক রাত, মেয়ে, কেউ সুখী নয়, হাসতে দেখ/গাইতে দেখ, তিন পুরুষ, এক আকাশ তারা, ঘুমন্ত শহরে, রূপালি গিটার, উড়াল দেব আকাশে, একচালা টিনের ঘর, তারা ভরা রাতে, ও দুনিয়ার মানুষ ও ভাই, মন চাইলে মন পাবে, বাংলাদেশ, মাধবী’র মতো গানগুলো সবার মুখে মুখে। ৮০’র দশকের শেষ প্রান্ত থেকে আজ অবধি সব বয়সীদের মধ্যেই এলআরবি ব্যান্ডদল কিংবা আইয়ুব বাচ্চুর গানের উন্মাদনা চলছেই।

হিসেব করলে তিন দশক, কণ্ঠের যাদুতে তিন প্রজন্মকে সম্মোহন করে গেছেন। কনসার্টে আরও তেজদীপ্ত, ক্ষিপ্রতা, অভিনব বহিঃপ্রকাশ রক সঙ্গীতের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর তারণ্যে ভরপুর তাঁর প্রতিপক্ষ কেবল তিনি নিজেই ছিলেন। কনসার্টে এই চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কনসার্ট করে গেছেন।

সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট রংপুরে গানবাংলা চ্যানেলের আয়োজনে কনসার্টে অংশ নিয়ে ১৮ আগস্ট মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ২০০৯ সালে প্রথমবার স্ট্রোক করেছেন, ২০১২ সালে ফের ফুসফুসে পানি জমে মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসেন। এরপর গান-বাজনার ব্যস্ততা আরও বাড়িয়ে দেন। সমানতালে অন্যদের সঙ্গে অসুস্থ শরীর নিয়েও টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছুটেছেন। অবশেষে থামল তাঁর রূপালী গিটার। বাংলাদেশের সঙ্গীতে তাঁর মতো কর্মবীর আর একজনও নেই। একদিনের জন্যও তিনি বিশ্রামে ছিলেন না। হয় স্টুডিও ওয়ার্ক, না হয় কনসার্ট- সারাক্ষণ নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে মেতেছিলেন। কর্মবীরের মৃত্যু কাজের মধ্যে হবে- এটাই তো প্রত্যাশিত।

সব মিলিয়ে তাঁর ৬৭টি গিটার রয়েছে। বাসায়, স্টুডিওতে সবসময় কোলে গিটার থাকত। প্রিয় বন্ধু মহসিন খান আইয়ুব বাচ্চু সম্পর্কে বলেন, ‘গিটার, গিটার, গিটার। তাঁর জীবনে আর কিছু ছিল না। এখন সরকার যদি চায়, সংরক্ষণের জন্য এগুলো সব আমরা দিয়ে দেবো।’ বিচ্ছিন্নভাবে শুধু গিটার শো করেছিলেন, তবে গিটারের একক প্রদর্শনীটা আর হলো না। তবে নিশ্চয় তাঁর অগণিত ছাত্ররা প্রিয় ‘স্যারে’র গিটারের একটা প্রদর্শনী করবেনই।

Ads
Ads