মাদকের ভয়াল থাবায় নারায়ণগঞ্জ: ৩২’শ মামলায় গ্রেফতার ৪২৪১, ২৫ কোটি টাকার মাদক দ্রব্য উদ্ধার

  • ২৬-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: শওকত আলী সৈকত, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি::

দেশের অন্যতম ধনী জেলা নারায়ণগঞ্জকে মাদক পাচারের ক্ষেত্রে বিশেষ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক পাচারকারীরা। ফলে এ অঞ্চলে মাদকের বিস্তার কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হওয়ায় যুব সমাজের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এত করে সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে ব্যাপকভাবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে কয়েকদিন বন্ধ থাকলেও পরবর্তীতে পুরোদমে আবার শুরু হচ্ছে মাদক পাচার।

নারায়ণগঞ্জ জেলার ৭টি থানার মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও রূপগঞ্জ থানা এলাকা সরাসরি রাজধানী ঢাকার সাথে যুক্ত। এর মধ্যে সোনারগাঁ উপজেলা হয়ে দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, রূপগঞ্জ উপজলা হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং নদীপথে নারায়ণগঞ্জ জেলা শহরের সাথে বিভিন্ন জেলার আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থা চালু আছে।

রাজধানীর খুব নিকটবর্তী জেলা শহর হওয়ায় ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো হয়ে নারায়ণগঞ্জকে নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদকব্যবসায়ীরা। ভারত থেকে ফেনসিডিল আর মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার হয়ে যেসব মাদক বাংলাদেশে আসে সেগুলোর ডিস্ট্রিবিউশন (বন্টন) পয়েন্ট হিসেবে মাদকব্যবসায়ীরা  নারায়ণগঞ্জকেই  ট্রানজিট রুট হিসেবে বেঁছে নিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই নয় মাসে পুরো জেলায় অভিযান চালিয়ে ২৫ কোটি ২৩ লাখ ১২ হাজার ৫৫৫ টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। নারায়ণগঞ্জের থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি), মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর ও র‌্যাবের নেতৃত্বে ৩২০৯টি মাদক বিরোধী অভিযানে ৩২০৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত ৪ হাজার ২৪১ জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।  

আইন শৃংখলা বাহিনীর এ অভিযানগুলোতে ১৮ হাজার ৭১ কেজি (৪৮৪ মন) গাঁজা (১মন = ৩৭.৩২ কেজি), ৭ লাখ ৪৩ হাজার ২৩৭ পিছ ইয়াবা, ৮৮৩১ বোতল ফেনসিডিল, ১৬৯৩ গ্রাম হেরোইন, ২৫১৭ ক্যান বিয়ার, ১৩৪২ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়েছে। 

সূত্রমতে, আশির দশক থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পর বাংলাদেশে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে মূলত নারায়ণগঞ্জকে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। প্রথমদিকে কুমিল্লা ও ফেনী সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে পাচার হয়ে হেরোইন আসতো। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার অভিযানের মুখে হেরোইন আসা কিছুটা কমলেও শুরু হয় ফেনসিডিল পাচার। দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও এ রুট দিয়ে মাদক পাচার বন্ধ করা যায়নি। আর ২০০৭ সালের দিকে কক্সবাজার  টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িয়ে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ ঘটে  ইয়াবার।

গত নয় মাসে যেসব মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলোর সিংহভাগই উদ্ধার করেছে জেলার সাতটি থানা পুলিশ। জেলা পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, সাতটি থানার পুলিশের অভিযানে ৩১৩ কেজি গাঁজা, ২ লাখ ৭৫ হাজার পিছ ইয়াবা, ৪৬৬৭ বোতল ফেনসিডিল, ১৩৪৯ গ্রাম হেরোইন, ১৬১১ ক্যান বিয়ার এবং ২৫৭ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করেছে যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি ২৫ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া মাদক বিক্রির নগদ ৩ লাখ ৫ হাজার টাকাও তারা উদ্ধার করেছে।

এছাড়া জেলা গোয়োন্দা (ডিবি) পুলিশের অভিযানগুলোতে ১৩৫ কেজি গাঁজা, ৮৪ হাজার ২১৯ পিছ ইয়াবা, ১৫৭৮ বোতল ফেনসিডিল, ১৭১ গ্রাম হেরোইন, ৭৫২ ক্যান বিয়ার, ২৭০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করেছে যার আনুমানিক মূল্য ৩০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৫০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবে মাদকব্যবসায়ীরা নারায়ণগঞ্জকে ব্যবহার করলেও মাদক ব্যবসাতে জড়িত পড়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। চলতি বছরের ২০ আগষ্ট ১০ হাজার পিস ইয়াবা ও মাদক বিক্রির ২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৫০ টাকাসহ সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ডিবি’র সাবেক উপ-সহকারী পরিদর্শক (এএসআই) সালাউদ্দিন (৩৮) ও তার সহযোগী রনিকে (৩২) র‌্যাব গ্রেফতার করার পর বিষয়টি প্রকাশ্য হয়।

এর আগে ৮ মার্চে  বন্দর উপজেলা ১ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা মূল্যের ইয়াবা ও নগদ পাঁচ লাখ টাকাসহ সদর মডেল থানার উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) সোহরাওয়ার্দী আলম রুবেলকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ডিবি পুলিশের সূত্রে জানা যায়, এক নারীকে আটকে রেখে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে- এমন অভিযোগের ভিত্তিতে এএসআই  সোহরাওয়ার্দী রুবেলের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ অভিযানে তার বাসা থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা ও নগদ পাঁচ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

মাদকের বিশেষ ট্রানজিট নারায়ণগঞ্জ হলেও এখানে তেমন জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছেনা জেলা মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর। তাদের কার্যক্রম অনেকটা নিষ্ক্রিয় বলা চলে। জেলা মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর গত নয় মাসে মাত্র ১১৩টি অভিযান চালালেও উল্লেখযোগ্য কোন সফলতা নেই। এই ১১৩টি অভিযানে মাত্র  ১৮ কেজি গাঁজা, ১৪ হাজার ২১৯ পিছ ইয়াবা, ১৬৫ গ্রাম হেরোইন, ৩৬০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করেছে, যার আনুমানিক মূল্য হবে ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা র‌্যাব গত নয় মাসে ১১৪টি মাদকদ্রব্য উদ্ধার অভিযানে ভালো সফতলা রয়েছে। ১১৪টি অভিযানে তারা ১৭ হাজার ৬০৫ কেজি গাঁজা, ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৩ পিছ ইয়াবা, ২৫৮৬বোতল ফেনসিডিল, ৮ গ্রাম হেরোইন, ১৫৪ ক্যান বিয়ার, ৪৯৫ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করেছে, যার আনুমানিক মূল্য হবে ১১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৭ হাজার ১০৫ টাকা।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনাই প্রমাণ করে নারায়ণগঞ্জকে এখনো গোল্ডেন ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদকব্যবসায়ীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে জামিনে বেরিয়ে আসছে মাদকের পাচারকারীরা। আর যারা কারাগারে রয়েছে, তারা সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রন করছে তাদের মাদক ব্যবসা। নতুন বাহক দিয়ে ভিন্ন পদ্ধতিতে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে আড়ালেই থেকেই যাচ্ছে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রকারী মূলহোতারা।

নারায়ণগঞ্জকে মাদকের গোল্ডেন ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়া হবেনা বলে জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান পরিস্কার। মাদক ব্যবসায়ের সাথে যারাই যুক্ত থাকুক সেখানে পুলিশ সদস্য হোক বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হোক  কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি আরো জানান, জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় মাদকের ১২৬০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলাতেই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা করা হয়েছে। যারা একাধিক মাদক মামলার আসামী রয়েছে তাদের মনিটরিং করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এর পাশাপাশি আমরা প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি এলাকায় মাদক নির্মূলে সভা ও সমাবেশ করছি। আমরা চেষ্টা করছি মাদকের সাথে যুক্তদের পুর্নবাসনের চিন্তা ভাবনা করছি।

জনসাধারণ ও প্রশাসনের সম্মেলিত উদ্যোগে এ সমস্যা সমাধান করা অনেকটাই সম্ভবপর হবে বলে তিনি মনে করেন। মাদক নির্মূলে সমাজের সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে এসে আইন শৃংখলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহবান জানান জেলা পুলিশের এই কর্মকর্তা।

Ads
Ads