চুমুর ছবিটা সাজানো ছিল, ফটোগ্রাফারের ক্ষমা প্রার্থনা!

  • ২৯-Jul-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া টিএসসিতে বৃষ্টিভেজা চুমুর ছবিটি সাজানো ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ। এছাড়া ছবি প্রকাশের পর ফটোগ্রাফার জীবন আহমেদকে মারধরের ঘটনাও ছিল ব্যক্তিগত কারণে। এ ঘটনায় নিজেকে অপরাধী স্বীকার করে সেই অনলাইন পোর্টালে আর কাজ করতে আগ্রহী নন বলে জানান জীবন নিজেই।


গত সোমবার (২৩ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে এক যুগলের বেশ কয়েকটি রোমান্টিক ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন ফটোগ্রাফার জীবন আহমেদ। পরে তার নিজের ফেসবুক আইডি থেকে ‘বর্ষামঙ্গল কাব্য… ভালোবাসা হোক উন্মুক্ত’ ক্যাপশনে চুমুর ছবিটি পোস্ট করেন। মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি, সঙ্গে যুক্ত হয় দেশের গণমাধ্যমগুলোও। প্রায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশিত হয় এ সংক্রান্ত খবর। দেশজুড়ে চলতে থাকে আলোচনা-সমালোচনা। একদিনেই পরিচিতি পেয়ে যান ফটোগ্রাফার জীবন।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। পরদিন দুপুরে টিএসসিতে গেলে জীবনকে মারধর করেন কয়েকজন ফটোসাংবাদিক। এঘটনার পরপরই জীবন পূর্বপশ্চিমের অফিসে এসে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করতে করতে জানান, ভাইরাল ছবির সিরিজের বাকি ছবিগুলো না দেয়ার কারণেই তাকে মারধর করা হয়েছে।

পাশাপশি তাকে 'সাংবাদিক নামের কলঙ্ক' আখ্যায়িত করে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং জোরপূর্বক ফেসবুকে ‘আমি সাংবাদিকতা ছেড়ে দিলাম’ স্ট্যাটাস দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ফটোগ্রাফার জীবনের অনুরোধে তার নিরাপত্তার বিষয়টি অফিসিয়ালি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় এবং আইনী ব্যবস্থার জন্য অফিসের একাধিক কর্মীসহ তাকে শাহবাগ থানায় পাঠানো হয়। পাশাপাশি তার ওপর হামলাকারী বিভিন্ন পত্রিকায় কর্মরত ফটোসাংবাদিকদের অফিসে যোগাযোগ করে তাদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানানো হয়।

তবে থানায় গিয়েই অজানা কারণে মত বদলান জীবন। এক পর্যায়ে এক সহকর্মীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে খাবার কেনার কথা বলে থানা থেকে বের হয়ে যান তিনি। এরপর তিনি আর থানায় ফিরে যাননি, এমনকি তার ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। পথিমধ্যে জীবনের মোবাইল ফোনে অসংখ্যবার কল এসেছিল বলে জানান সহকর্মীরা।

পরবর্তীতে জানা যায়, শাহবাগ থানা থেকে বের হয়ে জীবন আহমেদ মারধরকারী এক ফটোসাংবাদিকের অফিসে যান এবং তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আপোস-মীমাংসা করেন। তবে এ ঘটনা তিনি পূর্বপশ্চিম কর্তৃপক্ষকে একবারের জন্যেও জানাননি। এমনকি সেদিনের পর থেকে আর অফিসেও আসেননি।

ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য বুধবার (২৮ জুলাই) জরুরি মিটিং ডাকে পূর্বপশ্চিম। মিটিংয়ে জীবনকে উপস্থিত থেকে পুরো বিষয়টি ব্যাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানেও হাজির হননি আলোচিত ওই ফটোগ্রাফার।

পরে সেই অনলাইন পোর্টালের নিউজ এডিটরের সঙ্গে দেখা করে জীবন বলেন, তিনি অপরাধ করেছেন এবং পূর্বপশ্চিমে কাজ করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই প্রতিষ্ঠানে আর কাজ করতে আগ্রহী নন। একই কথা তিনি একাধিক সহকর্মীকেও জানান এবং নিউজ এডিটরসহ সকলের কাছে ক্ষমা চান।

এরমধ্যে বিশ্বস্ত সূত্রে পূর্বপশ্চিম জানতে পারে, ভাইরাল হওয়া ছবিটি ছিল সাজানো ও পূর্বপরিকল্পিত। ঘটনার অনুসন্ধান চলাকালে পূর্বপশ্চিমের ওয়েবসাইটে জীবনের অ্যাডমিন প্যানেল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি। কিন্তু এ ঘটনাকে জীবন আহমেদ অতিরঞ্জিত করে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন এবং এর আগে তার কাছ থেকে অফিসিয়াল ল্যাপটপ ও আইডি কার্ড ফেরত চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যমূলক।

সেই অনলাইন পোর্টাল একটি প্রগতিশীল সংবাদমাধ্যম। সম্পাদকীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রত্যেক সংবাদকর্মী জীবনকে ছবিটি তোলার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার জালিয়াতি, প্রতারণা ও দ্বিমুখী আচরণ পূর্বপশ্চিমের সহকর্মীদের বিস্মিত ও মর্মাহত করেছে।

আলোচিত ছবি ও পরবর্তী ঘটনা প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানিয়েছেন জীবনের উপর কথিত হামলায় অভিযুক্ত দৈনিক পক্ষকাল পত্রিকার সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র ফটোগ্রাফার শফিকুল ইসলাম কাজল। তিনি বলেন, ‘ভাইরাল হওয়া ছবিটি আকস্মিকভাবে তোলা নয়, এটা পূর্বপরিকল্পিত। শুধুমাত্র আলোচনায় আসার জন্যই ছবি তুলতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে টিএসসির মতো জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঘটনা সম্পূর্ণ সাজানো।’

জীবনকে মারধর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাকে কোনপ্রকার মারধর করা হয়নি। সাধারণ বাক-বিতণ্ডা হয়েছে মাত্র। সেটাও একজন সিনিয়র ফটোগ্রাফার ও বড় ভাই হিসেবে তাকে শাসন করেছিলাম। এই তুচ্ছ বিষয়টাকে জীবন ইস্যু তৈরি করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।’

শফিকুল ইসলাম কাজল বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন সেখানে (টিএসসি) আড্ডা দেই। সেটি একটি প্রগতিশীল এলাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনোই মৌলবাদীরা আস্তানা গড়তে পারেনি। কিন্তু সেখানে চুমুর ছবি তোলাটা উদ্দেশ্যমূলক। পরিকল্পিতভাবে ছবিটি তুলে সেটি ভাইরাল করে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছিল তারা। এর সঙ্গে বড় কোন সিন্ডিকেট জড়িত। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গোটা দেশকে মৌলবাদীর আস্তানা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। এভাবে শেখ হাসিনার সরকারকে বিপাকে ফেলে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ভেতর ঠেলে দিতে চায় তারা।’

জীবন আহমেদের কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে সিনিয়র এই ফটোগ্রাফার বলেন, ‘জীবনকে এর আগেও বিভিন্ন বিতর্কিত কাজের জন্য সতর্ক করা হয়েছিল। সে সবসময় আলোচনায় আসতে চাইতো। আর এজন্যই বিশেষ মহলের প্ররোচনা ও পরিকল্পনানুসারে সে এই ঘটনাটি ঘটায়। আমি নাকি তাকে মেরেছি! তাহলে বিবাদ আমার সাথে, মীমাংসাও হবে আমার সাথে। কিন্তু কই- আমি তো কিছু জানলাম না। তারা একজনের অফিসে গিয়ে বোঝাপড়া করলো, সেখানকার কথাবার্তাও গোপনে রেকর্ড করে ফেসবুকে ছেড়ে দিলো। এ থেকেই বোঝা যায়, এসবই পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো।’

ছবি নিয়ে ঝামেলায় পূর্বপশ্চিমকে জড়ানোর নিন্দা জানিয়ে নব্বই দশকের বিপ্লবী এই ছাত্রনেতা বলেন, ‘জীবন যা করেছে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে অফিসকে জড়ানো কখনোই উচিৎ হয়নি।’

Ads
Ads