নয়াপল্টনের হামলায় লাঠি তৈরি ছিল ৭ দিন আগে

  • ১৯-Nov-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ আশপাশের এলাকায় গত ১৪ নবেম্বর বুধবার পুলিশের ওপর হামলা ছিল ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনার অংশ। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘটনার অন্তত এক সপ্তাহ আগে বাঁশের লাঠিগুলো বানানো হয়। এরপর সেগুলো রাতের আঁধারে আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে পল্টনসহ আশপাশের এলাকায় থাকা বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুকিয়ে রাখা হয়।

কিছু বাঁশের লাঠি মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত লাঠিগুলো নানাভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উর্ধতন চৌকস কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, জব্দকৃত বাঁশের লাঠির অধিকাংশই শুকনো। লাঠিগুলো যে পরিমাণে শুকনো তাতে সেগুলো অন্তত এক সপ্তাহ ধরে তৈরি করা বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো হামলায় ৭ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা বাঁশের লাঠি ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত দূর থেকে পুলিশের গায়ে আঘাত করতেই এমন ব্যবস্থা। এমনকি আগ থেকেই গাড়ি পোড়ানোর জন্য পেট্রোল যোগাড় করে রাখা হয়েছিল। সেই পেট্রোল হামলার সময় পুলিশের দুটি গাড়িতে ঢেলে দেয়া হয়। পরে তাতে আগুন দেয়।

ঘটনার দিন পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিএনপি নেতাকর্মীরা রাস্তা অবরোধ করেন। পুলিশ স্বাভাবিক কারণেই বাধা দেবে, আর তখনই পুলিশের ওপর হামলা হবে। যেমন পরিকল্পনা তেমন কাজ। পুরোপুরি পরিকল্পনামাফিক হামলাটি চালানো হয়। হামলার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত বিএনপি নেত্রী নিপুন রায়সহ ৭২ জনের মধ্যে ৪৫ জনকে পাঁচ দিনের রিমান্ড ও বাকিদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে আদালত।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলায় জড়িত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ছেলের বউ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নিপুন রায় চৌধুরীসহ ৭২ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ ও ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় দায়েরকৃত তিনটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। হামলার অভিযোগ ছাড়াও বিস্ফোরক আইনে মামলাগুলো করা হয়েছে। মামলায় মির্জা আব্বাস, রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতাসহ ৪৮৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলা তিনটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পূর্ব বিভাগ।

শুক্রবার আসামিদের ঢাকার সিএমএম আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন করলে বিচারক বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে নিপুন রায় চৌধুরীসহ ৪৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বাকিদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

তদন্তকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মূলত বিএনপির টার্গেট নির্বাচন একমাস পেছানো। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন যাতে একমাস পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়, তারই পরিবেশ সৃষ্টি করতে বুধবার পরিকল্পিতভাবে পুলিশের ওপর হামলাসহ নানাভাবে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এমন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিএনপি এগোচ্ছে। পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাসকে। তার পরিকল্পনাতেই পুরো হামলার ঘটনাটি ঘটানো হয়।

সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্তত সপ্তাহখানেক আগে ঢাকার রামপুরাসহ আশপাশের এলাকা থেকে বাঁশের লাঠি বানানো হয়। সেই লাঠি ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে জড়ো করা হয় পল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ আপশাশের বিএনপি-জামায়াত-শিবির ও তাদের মতবাদে বিশ্বাসী ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে। আর সকাল থেকেই এসব লাঠি যেসব জায়গায় রাখা হয়েছে, তার আশপাশের গলিতে অবস্থান নেন অন্তত পাঁচ শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মির্জা আব্বাস স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ হাজার লোকের একটি শোডাউন মিছিল নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তারা ইচ্ছেকৃতভাবেই রাস্তা অবরোধ করে অবস্থান নেন। রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, স্বাভাবিক কারণেই পুলিশ নেতাকর্মীদের রাস্তা থেকে সরে যেতে বলবে। আর সেই সুযোগকে পুঁজি করে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হবে। হয়েছেও তাই।

হামলায় গুরুতর আহত হয়ে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শিবলী নোমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতাকেও ফেল করে দিয়েছে হামলার পরিকল্পনা ও কৌশলটি। তিনি স্বাভাবিক কারণেই ওই সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সঙ্গে ফোর্স নিয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এ সময় মির্জা আব্বাসের মিছিল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে থামে। নেতাকর্মীরা ইচ্ছে করেই রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় যানজটের সৃষ্টি হয়। তিনিসহ উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তারা নেতাকর্মীদের খানিকটা রাস্তা ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। যাতে কোন মতে হলেও গাড়িগুলো চলতে পারে। এছাড়া এমন স্লোগান ও শোডাউন নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের শামিল বলেও নেতাকর্মীদের বিষয়টি সদয় দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করেন।

এমন অনুরোধ হিতে বিপরীত হয়। নেতাকর্মীরা কোন প্রকার বাগবিতন্ডা ছাড়াই তার ওপর হামলে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গলি থেকে বড় বড় বাঁশের লাঠি নিয়ে পুলিশের ওপর চোখের পলকে আচমকা মারাত্মক হামলা চালায় তারা। এমন আচমকা হামলায় পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে পুলিশ। ১৫ থেকে ২০ জন করে নেতাকর্মী একেকজন পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘেরাও করে মারধর শুরু করে। এরপর দূর থেকে বড় বড় লাঠি দিয়ে পুলিশের গায়ে আঘাত করতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে পুলিশ। উপায়ান্তর না দেখে পুলিশ নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে থাকে। আমাকে মাঝখানে ফেলে বিএনপি নেতাকর্মীরা মারধর করে। পরে আশপাশে থাকা পুলিশ সদস্যরা গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে। দূর থেকে বড় বড় বাঁশের লাঠি দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানোর কারণে হামলাকারীদের আটক করা যাচ্ছিল না। তাদের কাছাকাছিই যাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা মাত্রই তারা দূর থেকে বড় বড় বাঁশের লাঠি দিয়ে পুলিশের গায়ে আঘাত করছিল। এমন সময় তারা পুলিশের দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি গেলে তাদের গাড়ি যেতে দেয়নি। ফলে গাড়ি দুটি বিকেল চারটা নাগাদ জ্বলে।

তিনি বলেন, অন্তত একহাজার লোক পুলিশের ওপর হামলা চালায়। তাদের কাজই ছিল পুলিশের ওপর হামলা করা। হামলাকারীদের মধ্যে অন্তত ৫শ’ জনের হাতে বড় বড় বাঁশের লাঠি ও লম্বা লম্বা কাঠের লাঠি ছিল। এ ধরনের লাঠি ইতিপূর্বে কোনদিনই হামলায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি। এসব লাঠি আগে থেকেই আশপাশের এলাকায় জমা করে রেখেছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এছাড়া শত শত ইট দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করা হয়েছে। এসব ইট আগ থেকেই পুলিশের ওপর হামলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যোগাড় করে রাখা হয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ এত ইট ওই এলাকার কোথাও জমা রাখার কোন তথ্য মেলেনি। এমনকি এত বাঁশের লাঠিও কোথাও স্বাভাবিকভাবে থাকার কোন তথ্য মেলেনি। হামলাটি একেবারেই পরিকল্পিত।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হামলাটি একেবারেই যে পূর্বপরিকল্পিত তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ হামলাকারীরা আগ থেকেই গাড়ি পোড়ানোর জন্য পেট্রোল যোগাড় করে রেখেছিল। সেই পেট্রোলই পুলিশের দুটি গাড়িতে ঢেলে দিয়ে আগুন দেয়া হয়। আর তাতেই গাড়ি দুটি পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে যায়।

বিষয়টি সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, হামলার ঘটনায় প্রচুর সিসি ক্যামেরা, তাদের নিজস্ব ক্যামেরা ও মিডিয়ার ক্যামেরার ফুটেজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া নানা ছবির পর্যালোচনা চলছে। রিমান্ডে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে বিশেষ অভিযান চলছে।

ঘটনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি সমর্থকদের সংঘর্ষ এবং পুলিশের ওপর হামলা ছিল নগ্ন ও পৈশাচিক। মূূলত ইস্যু তৈরির করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে হামলাটি করা হয়েছে। জননিরাপত্তা বিঘিœত করে দেশে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই এমন মারাত্মক হামলা চালানো হয়েছে। ওই দিনের ঘটনা ছিল বড় ধরনের একটি হামলার পূর্বপরিকল্পনার অংশ।

গত ১৪ নবেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে পুলিশ ও নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ঘে পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৩০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। ওইদিন সবমিলিয়ে অর্ধশত মানুষ আহত হন।

পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকা ৪৫ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন নিপুন রায় চৌধুরী, সাবেক ছাত্রদল নেতা মনোজ সরকার, নেত্রকোনা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট খালিদ সাইফুল্লাহ, ছাত্রদল নেতা ফাহিম হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা মশিউর রহমান, ছাত্রদল নেতা উৎপল সরকার, বিএনপি নেতা সুফিয়ান, জাকির হোসেন, হানিফ উদ্দিন ওরফে রানা, ঢাবির মহসিন হল শাখা ছাত্রদল নেতা মাহবুব মিয়া, আনিসুর রহমান, ছাত্রদলের সহ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডাঃ আতিকুর রহমান তালুকদার, মাইনুল হাসান মোহন, আনোয়ারুল হক ও মোহাম্মদ সুরুজ মন্ডল।

সাত কার্যদিবসের মধ্যে তিন কার্যদিবসে ২৭ জনকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আসামিরা হচ্ছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আনিছুজ্জামান খান বাবু, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ডাঃ নিজাম উদ্দিন, ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার হারুন অর রশিদ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাহারুল আলম বাহার, বিএনপির সক্রিয় কর্মী আলমগীর হোসেন, সোনাগাজী পৌর বিএনপির সভাপতি হোসেন আহম্মদ, বিএনপির সক্রিয় কর্মী তারিকুল ইসলাম, বালিয়াকান্দার যুবদলের সহ-সভাপতি আরিফুজ্জামান, খায়রুল কবির কাজল, বিএনপির সক্রিয় কর্মী মুসা আহম্মেদ, আবু বক্কর সিদ্দিক, এসএম নাজমুল হোসেন, মাসুদ রানা, কেএম তারিকুল ইসলাম আরিফ, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে শামীম, রকিব আল মান্নান, সাইফুল আলম গজনবী চয়ন, ছাত্রদল নেতা মোঃ মোখসেদ আলম জুয়েল, নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদল সভাপতি ফরিদ হোসেন বাবু, জামায়াতের রোকন জাহিদুল ইসলাম মামুন, ছাত্রদল নেতা মোঃ রুবেল বেপারি, টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল কবির, ঢাকার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ আসাদুজ্জামান লিপু, দারুস সালাম থানার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মোঃ ইকবাল হোসেন স্বপন, চাঁদপুর জেলার দক্ষিণ মতলব থানা থানার কাদেরগাঁও ইউনিয়নের বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ জিলানী তালুকদার, কাদেরগাঁও ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ লিটন মজুমদার ও বিএনপি সদস্য মোঃ সোহাগ।

Ads
Ads