এবারের নির্বাচনে যেসব কারণে বিদেশি প্রতিনিধিরা আসছেন না!

  • ১৫-Nov-২০১৮ ১২:০০ pm
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

বড়দিন বা ইংরেজি নববর্ষের ছুটি নয়, বরং বাংলাদেশের পরিবর্তিত অবস্থানের জন্যই বিদেশি কূটনীতিকরা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাজ্যের একাধিক কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য পাওয়া যায়।

কূটনীতিকরা বলছেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মোটামুটি স্বনির্ভর একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। কাজেই এ দেশের গণতন্ত্র রক্ষা কিংবা নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, সেটি নির্ধারণ করবে দেশের জনগণ। এ বিষয়ে আমাদের খুব বেশি আগ্রহ নেই। দেশে যেন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকে। গণতান্ত্রিক রীতি-বিধি অক্ষত ও পরমত সহিষ্ণুতা থাকে। অন্যের মতামত দমন করা থেকে যেন বিরত থাকে। নির্বাচন একটি দেশেরে আভ্যন্তরীণ বিষয়। কাজেই, কোনো দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা নাক গলাতে চাই না।

ইইউ’র একজন প্রতিনিধি জানান, ‘বড়দিন বা নববর্ষের ছুটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ না করার ক্ষেত্রে কোনো ইস্যু নয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন আমরা পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। কারণ সে সময় ইইউ’র কাছ থেকে বাংলাদেশের সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩ মিলিয়ন ইউরোর বেশি। সেটি এখন কমে ১ মিলিয়ন ইউরো’র ও নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহায়তাই স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। সে সময় বাংলাদেশ ইইউ’র সাহায্যের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল ছিল। ইইউ’র অনেকগুলো প্রকল্প সে সময় বাংলাদেশের বিবেচনাধীন ছিল। সে সময় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত একটি অনির্বাচিত সরকার ছিল। তাই, এ ধরনের নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, সেটি দেখা প্রয়োজন ছিলো। তবে, তখনকার প্রেক্ষাপটের তুলনায় বর্তমানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

এবারের নির্বাচন কেন পর্যবেক্ষণ করবে না ইইউ, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উন্নতি করেছে, সেটি ঈর্ষণীয়। বিশ্বে উন্নয়নের জন্য সংগ্রাম করা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ ‘রোল মডেল’ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু্, ইইউ’র ওপর নির্ভরশীল নয়, তাই বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা বা নির্বাচনী কার্যক্রমে তদারকি করা, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার শামিল বলেই ইইউ মনে করছে।

মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক বিভাগের একজন কর্মকর্তাও একই মত পোষণ করে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকুক। মানবাধিকার, আইনের শাসনসহ অন্যান্য মানবিক সুযোগ-সুবিধাগুলো অব্যাহত থাকুক। আমরা আশা করছি, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হচ্ছে কি না, সেটি বিচারের দায়িত্ব দেশের জনগণের। সেজন্য নির্বাচন যদি জানুয়ারিতেও হয়, সেক্ষেত্রেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কোনো প্রতিনিধি পাঠাবে না।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি ঈর্ষণীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কোনো অভিপ্রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

কানাডার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সিডা’র একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যে সকল দেশ আমাদের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, যে সব দেশে আমাদের অর্থ জনগণের কাজে ব্যবহৃত হয় – সে সব দেশেই আমরা সাধারণত, নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠাই। বাংলাদেশ যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ, কাজেই বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে কানাডার কোনো অংশীদারিত্ব নেই।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের একজন কূটনীতিক বলেন, যুক্তরাজ্য কিংবা ভারতের নির্বাচন কীভাবে হবে, সেটি কি অন্য দেশের কূটনীতিকরা পর্যবেক্ষণ করে সার্টিফিকেট দেবে। বাংলাদেশের অবস্থানের কারণেই আমরা এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না।

কাজেই বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যে দাবি করে আসছে ছুটির কারণে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা থাকতে পারবে না, সেটি সত্য নয় বলে কূটনীতিকরা জানিয়েছেন। পরিবর্তিত অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কোনো প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করছে না। নির্বাচন পর্যবেক্ষকের জটিলতা নিয়ে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ও নিছক নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন।

Ads