>>আইন মানছে না চালক-পথচারী কেউই
>>সিগন্যাল বাতি নিয়ে বিভ্রান্ত পথচারীরা 
>>জেব্রা ক্রসিংয়ের নিয়ম মানে না কেউ
>>অনেকেরই জানা নেই ট্রাফিক আইন

:: আরিফুর রহমান ::

শিক্ষার্থীরা একটা ‘বিপ্লব’ করে যাওয়ার পরও ঢাকার রাজপথে এখনো ফেরেনি শৃঙ্খলা। পরিবহন চালক আর পথচারী- কেউই মানছেন না নিয়ম-কানুন। এমনকি ট্রাফিক আইনে কী আছে তাও জানেন না অনেকে। নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো চলেন তারা। পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে এখনো পার হন রাস্তা। পরিবহন চালকের অধিকাংশই তোয়াক্কা করেন না ট্রাফিক আইন। সড়কে বিশৃঙ্খলা ‘নিয়মিত অনিয়মে’ পরিণত হয়েছে। এ কারণেই কমছে না দুর্ঘটনা। জেব্রা ক্রসিং পথচারীর পারাপারের জন্য। সাধারণত স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল বা যেখানে লোক চলাচল বেশি, সেখানে সহজে পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং দেওয়া হয়। নিয়ম হলো জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে এসে গাড়ি নির্দিষ্ট গতিসীমার নিচে নিয়ে আসবে, যাতে সহজেই রাস্তা পারাপার হতে পারেন পথচারীরা। জেব্রা ক্রসিং ছাড়াও পথচারী পারাপারের জন্য রয়েছে আন্ডারপাস ও ওভারব্রিজ। কিন্তু পথচারীরা জেব্রা ক্রসিং, ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস ব্যবহার না করে রাস্তার যেখানে-সেখানে ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন প্রতিনিয়িত।

অন্যদিকে যানবাহনের চালকরাও পথচারী পারাপারের স্থান জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামাতে চান না। অন্যান্য স্থানের মতো দ্রুতগতিতেই ছুটে চলেন। মাসব্যাপী ট্রাফিক সচেতনতা কর্মসূচি চালুর পর গত কয়েকদিন রাজপথ পর্যবেক্ষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

রাজধানীর বেশিরভাগ জেব্রা ক্রসিং তিন রাস্তা, চৌরাস্তা কিংবা রাস্তার মোড়ে দেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, যানবাহন চালকদের অধিকাংশই এসব জেব্রা ক্রসিংয়ের তোয়াক্কা করছেন না। রাজধানীর পল্টন মোড়, শাহবাগ মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, সংসদ ভবনসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে গাড়ি থামতে সিগন্যাল দিলেও যানবাহনগুলো জেব্রা ক্রসিং পার হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো সময় বাস ও প্রাইভেট কারগুলো ক্রসিং পার না হয়ে জমি দখলের মতো ক্রসিং দখল করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে। এর মধ্য দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে পথচারীদের।

বায়তুল মোকাররম এলাকায় দেখা গেছে, আসলাম মিয়া নামের একজন পথচারী ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে নিজের ইচ্ছে মতো রাস্তার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাচ্ছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার তাড়াতাড়ি যাওয়া দারকার। কি করব বলেন, যেতে তো হবে। জানি এটা আমার ভুল, তারপরও তাড়াহুড়ো করে এই পথ বেছে নিতে হয়েছে।’ শাহবাগ মোড়ে এমনিভাবেই রাস্তা পার হচ্ছিলেন ব্যাংকার করিম হোসেন।

তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে তো আর পার হতে মন চায় না। পথচারী পারাপারের জায়গাটা কোথায়? জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাহারি রঙের বাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল। কেউ কি মানছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সেই স্মরণীয় নিয়ম-কানুন?।’ এ সময় দেখা গেল, কয়েকটা গাড়ি মোড় অতিক্রম না করেই ফার্মগেটমুখী রাস্তার জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা শুরু করল। অথচ একটু সামনেই বাস স্টপেজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সামনের ওভারব্রিজ থেকে শুরু হয়ে হাসপাতাল গেট পর্যন্ত বাস স্টপেজ। এখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে কোনো বাসকেই দেখা যায়নি। অধিকাংশই শাহবাগ মোড় থেকে যাত্রী তুলছে। পরীবাগ এলাকায় সিগন্যাল পড়লে এ স্টপেজের সামনে বাসগুলো থামছে। অন্যথায় স্টপেজে না দাঁড়িয়ে চলে যাচ্ছে। জেব্রা ক্রসিং দখল করে যাত্রী নিতে দেখা গেছে মিরপুর ও বিমানবন্দর রোডের বাসগুলোকেও। রাস্তায় সম্প্রতি পুলিশের পক্ষ থেকে ‘বাস স্টপেজ শুরু’ আর ‘বাস স্টপেজ শেষ’ নির্দেশনা লাগানো হয়েছে। এই নির্দেশনা একদমই মানছে না পরিবহন চালকরা।

এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ‘এয়ারপোর্ট-বঙ্গবন্ধু এভিনিউ’ পরিবহনের একটি বাসের চালক-হেলপার দুজনেই বললেন, ‘আগে যাত্রীদের সচেতন করুন, যাত্রীরা মোড়ে দাঁড়ায় বলেই আমরা থামিয়ে উঠাই।’ এ ব্যাপারে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মিরপুরের বাসিন্দা রতন হোসেন বলেন, ‘আসলে যেখানে বাস স্টপেজ, সেখানে দাঁড়ালে কোনো বাস পাওয়া যায় না। বাসগুলো স্টপেজে থামে না।’

বাংলামোটরের জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হচ্ছিলেন বৃদ্ধ কামাল হোসেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাঁটুর সমস্যার কারণে ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার হতে পারি না। এজন্য জেব্রা ক্রসিংটাই হচ্ছে আমার ভরসা। কিন্তু জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করাও নিরাপদ নয়। জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর এলোমেলো হয়ে গাড়ি থাকে। কখন কি ঘটে যায় এমন আতঙ্ক নিয়েই রাস্তা পার হতে হয়।’

মিরপুর-সদরঘাট রুটের বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসের চালক কাইয়ুম ইসলাম বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনা ঘটুক সেটা আমরা কোনোভাবেই চাই না। পথচারীরা খেয়ালখুশিমতো রাস্তা পারাপারের ফলে কখনও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার এসে পড়ে চালকদের ওপর।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাস্তায় বাস চলছে। হঠাৎ পথচারী রাস্তায় নেমে হাত উঠিয়ে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হতে লাগল। কারও গাড়ির ব্রেক দুর্বল হলে তখন গাড়ি তার ওপর উঠে যেতে পারে। আর ঘটে যেতে পারে অনাকাক্সিক্ষত বড় ধরনের দুর্ঘটনা।’

বাংলামোটর মোড়ে পথচারী আবদুল বাতেন বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল দেওয়ার পরও জেব্রা ক্রসিং ফাঁকা থাকে না। ফলে যাত্রীরা ইচ্ছা অনুযায়ী রাস্তা পার হয়। আবার ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস কাছাকাছি না থাকার কারণেও পারাপারে সমস্যা হয়।’

শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফুটওভার ব্রিজ দেখিয়ে পথচারী জহির আলম ভোরের পাতাকে বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়িগুলো এতটাই খাড়া যে, উঠতে গিয়ে রীতিমতো হাঁপাতে হয়। প্রতিটা ফুটওভার ব্রিজের একই অবস্থা। এসব ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে বয়স্ক, নারী ও শিশুদের পারাপারে সমস্যা হয়। এ কারণেই ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পারাপারে আগ্রহী হন না পথচারীরা।’ 

পথচারীদের এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলেন, ‘সড়ক পারাপারে নেই কোনো নির্দেশনা। আবার যা আছে তাও মানছে না সড়ক ব্যবহারকারীরা।’ নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজগুলো অনেক ওপরে হওয়ার কারণে কেউ উঠতে চায় না, আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ওঠার কষ্টের কারণেই পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে চায় না।’

নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলছেন, ‘কোনো ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরি হয়েছে বলে অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ শতভাগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এডহক ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এসব ফুটওভার ব্রিজ। সেজন্য দেখা যায় এগুলো ইন্টারসেকশন থেকে অনেকটা দূরে করা হয়। আবার উচ্চতার কারণেও অনেকে উঠতে চান না, যেটি ডিজাইনের বিষয়।’

এসব বিষয়ে ডিএমপি ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিটন কুমার সাহা ভোরের পাতাকে বলেন, ‘শুধু ট্রাফিক পুলিশের ওপর দায় চাপালে চলবে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ সড়কের জন্য বিআরটিএ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। জনসাধারণকেও সচেতন করতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আসবে।’

" /> ভোরের পাতা

সড়কে শৃঙ্খলা কতদূর! 

  • ১৩-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

>>আইন মানছে না চালক-পথচারী কেউই
>>সিগন্যাল বাতি নিয়ে বিভ্রান্ত পথচারীরা 
>>জেব্রা ক্রসিংয়ের নিয়ম মানে না কেউ
>>অনেকেরই জানা নেই ট্রাফিক আইন

:: আরিফুর রহমান ::

শিক্ষার্থীরা একটা ‘বিপ্লব’ করে যাওয়ার পরও ঢাকার রাজপথে এখনো ফেরেনি শৃঙ্খলা। পরিবহন চালক আর পথচারী- কেউই মানছেন না নিয়ম-কানুন। এমনকি ট্রাফিক আইনে কী আছে তাও জানেন না অনেকে। নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো চলেন তারা। পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে এখনো পার হন রাস্তা। পরিবহন চালকের অধিকাংশই তোয়াক্কা করেন না ট্রাফিক আইন। সড়কে বিশৃঙ্খলা ‘নিয়মিত অনিয়মে’ পরিণত হয়েছে। এ কারণেই কমছে না দুর্ঘটনা। জেব্রা ক্রসিং পথচারীর পারাপারের জন্য। সাধারণত স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল বা যেখানে লোক চলাচল বেশি, সেখানে সহজে পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং দেওয়া হয়। নিয়ম হলো জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে এসে গাড়ি নির্দিষ্ট গতিসীমার নিচে নিয়ে আসবে, যাতে সহজেই রাস্তা পারাপার হতে পারেন পথচারীরা। জেব্রা ক্রসিং ছাড়াও পথচারী পারাপারের জন্য রয়েছে আন্ডারপাস ও ওভারব্রিজ। কিন্তু পথচারীরা জেব্রা ক্রসিং, ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস ব্যবহার না করে রাস্তার যেখানে-সেখানে ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন প্রতিনিয়িত।

অন্যদিকে যানবাহনের চালকরাও পথচারী পারাপারের স্থান জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামাতে চান না। অন্যান্য স্থানের মতো দ্রুতগতিতেই ছুটে চলেন। মাসব্যাপী ট্রাফিক সচেতনতা কর্মসূচি চালুর পর গত কয়েকদিন রাজপথ পর্যবেক্ষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

রাজধানীর বেশিরভাগ জেব্রা ক্রসিং তিন রাস্তা, চৌরাস্তা কিংবা রাস্তার মোড়ে দেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, যানবাহন চালকদের অধিকাংশই এসব জেব্রা ক্রসিংয়ের তোয়াক্কা করছেন না। রাজধানীর পল্টন মোড়, শাহবাগ মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, সংসদ ভবনসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে গাড়ি থামতে সিগন্যাল দিলেও যানবাহনগুলো জেব্রা ক্রসিং পার হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো সময় বাস ও প্রাইভেট কারগুলো ক্রসিং পার না হয়ে জমি দখলের মতো ক্রসিং দখল করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে। এর মধ্য দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে পথচারীদের।

বায়তুল মোকাররম এলাকায় দেখা গেছে, আসলাম মিয়া নামের একজন পথচারী ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে নিজের ইচ্ছে মতো রাস্তার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাচ্ছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার তাড়াতাড়ি যাওয়া দারকার। কি করব বলেন, যেতে তো হবে। জানি এটা আমার ভুল, তারপরও তাড়াহুড়ো করে এই পথ বেছে নিতে হয়েছে।’ শাহবাগ মোড়ে এমনিভাবেই রাস্তা পার হচ্ছিলেন ব্যাংকার করিম হোসেন।

তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে তো আর পার হতে মন চায় না। পথচারী পারাপারের জায়গাটা কোথায়? জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাহারি রঙের বাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল। কেউ কি মানছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সেই স্মরণীয় নিয়ম-কানুন?।’ এ সময় দেখা গেল, কয়েকটা গাড়ি মোড় অতিক্রম না করেই ফার্মগেটমুখী রাস্তার জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা শুরু করল। অথচ একটু সামনেই বাস স্টপেজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সামনের ওভারব্রিজ থেকে শুরু হয়ে হাসপাতাল গেট পর্যন্ত বাস স্টপেজ। এখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে কোনো বাসকেই দেখা যায়নি। অধিকাংশই শাহবাগ মোড় থেকে যাত্রী তুলছে। পরীবাগ এলাকায় সিগন্যাল পড়লে এ স্টপেজের সামনে বাসগুলো থামছে। অন্যথায় স্টপেজে না দাঁড়িয়ে চলে যাচ্ছে। জেব্রা ক্রসিং দখল করে যাত্রী নিতে দেখা গেছে মিরপুর ও বিমানবন্দর রোডের বাসগুলোকেও। রাস্তায় সম্প্রতি পুলিশের পক্ষ থেকে ‘বাস স্টপেজ শুরু’ আর ‘বাস স্টপেজ শেষ’ নির্দেশনা লাগানো হয়েছে। এই নির্দেশনা একদমই মানছে না পরিবহন চালকরা।

এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ‘এয়ারপোর্ট-বঙ্গবন্ধু এভিনিউ’ পরিবহনের একটি বাসের চালক-হেলপার দুজনেই বললেন, ‘আগে যাত্রীদের সচেতন করুন, যাত্রীরা মোড়ে দাঁড়ায় বলেই আমরা থামিয়ে উঠাই।’ এ ব্যাপারে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মিরপুরের বাসিন্দা রতন হোসেন বলেন, ‘আসলে যেখানে বাস স্টপেজ, সেখানে দাঁড়ালে কোনো বাস পাওয়া যায় না। বাসগুলো স্টপেজে থামে না।’

বাংলামোটরের জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হচ্ছিলেন বৃদ্ধ কামাল হোসেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাঁটুর সমস্যার কারণে ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার হতে পারি না। এজন্য জেব্রা ক্রসিংটাই হচ্ছে আমার ভরসা। কিন্তু জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করাও নিরাপদ নয়। জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর এলোমেলো হয়ে গাড়ি থাকে। কখন কি ঘটে যায় এমন আতঙ্ক নিয়েই রাস্তা পার হতে হয়।’

মিরপুর-সদরঘাট রুটের বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসের চালক কাইয়ুম ইসলাম বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনা ঘটুক সেটা আমরা কোনোভাবেই চাই না। পথচারীরা খেয়ালখুশিমতো রাস্তা পারাপারের ফলে কখনও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার এসে পড়ে চালকদের ওপর।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাস্তায় বাস চলছে। হঠাৎ পথচারী রাস্তায় নেমে হাত উঠিয়ে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হতে লাগল। কারও গাড়ির ব্রেক দুর্বল হলে তখন গাড়ি তার ওপর উঠে যেতে পারে। আর ঘটে যেতে পারে অনাকাক্সিক্ষত বড় ধরনের দুর্ঘটনা।’

বাংলামোটর মোড়ে পথচারী আবদুল বাতেন বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল দেওয়ার পরও জেব্রা ক্রসিং ফাঁকা থাকে না। ফলে যাত্রীরা ইচ্ছা অনুযায়ী রাস্তা পার হয়। আবার ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস কাছাকাছি না থাকার কারণেও পারাপারে সমস্যা হয়।’

শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফুটওভার ব্রিজ দেখিয়ে পথচারী জহির আলম ভোরের পাতাকে বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়িগুলো এতটাই খাড়া যে, উঠতে গিয়ে রীতিমতো হাঁপাতে হয়। প্রতিটা ফুটওভার ব্রিজের একই অবস্থা। এসব ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে বয়স্ক, নারী ও শিশুদের পারাপারে সমস্যা হয়। এ কারণেই ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পারাপারে আগ্রহী হন না পথচারীরা।’ 

পথচারীদের এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলেন, ‘সড়ক পারাপারে নেই কোনো নির্দেশনা। আবার যা আছে তাও মানছে না সড়ক ব্যবহারকারীরা।’ নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজগুলো অনেক ওপরে হওয়ার কারণে কেউ উঠতে চায় না, আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ওঠার কষ্টের কারণেই পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে চায় না।’

নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলছেন, ‘কোনো ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরি হয়েছে বলে অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ শতভাগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এডহক ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এসব ফুটওভার ব্রিজ। সেজন্য দেখা যায় এগুলো ইন্টারসেকশন থেকে অনেকটা দূরে করা হয়। আবার উচ্চতার কারণেও অনেকে উঠতে চান না, যেটি ডিজাইনের বিষয়।’

এসব বিষয়ে ডিএমপি ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিটন কুমার সাহা ভোরের পাতাকে বলেন, ‘শুধু ট্রাফিক পুলিশের ওপর দায় চাপালে চলবে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ সড়কের জন্য বিআরটিএ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। জনসাধারণকেও সচেতন করতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আসবে।’

Ads
Ads