একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : আলোচনায় ইভিএম

  • ৩০-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভএম) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনার পর জাতীয় নির্বাচনে এর ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত ও দ্বিমত দেখা দিয়েছে। একদিন আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানায়, আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে ১০০ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। এ জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করা হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার আরপিও নিয়ে দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসছে কমিশন। এদিকে, গতকাল দৈনিক ভোরের পাতা’কে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন মতামত জানিয়েছেন।

সংবিধান অনুযায়ী চলমান সংসদের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এতে ৩০ অক্টোবর থেকে সময় গণনা শুরু হবে বলে নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের জানান। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ইভিএম মেলার প্রস্তুতি সম্পর্কিত এক বৈঠকের পর ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, ৩০ অক্টোবরের পর যে কোনো সময় তফসিল ঘোষণা করতে পারে কমিশন। এক্ষেত্রে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহকে নির্বাচনের জন্য কমিশন উপযুক্ত বিবেচনা করতে পারে। 

নির্বাচন কমিশন বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ আসনে ইভিএম ব্যবহার করার পরিকল্পনা আছে তাদের। তবে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে হলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) সংশোধনী আনতে হবে। আরপিও সংশোধনীর জন্য প্রস্তাব করতে যাচ্ছে ইসি।

এ লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসবে কমিশন। কমিশন অনুমোদন দিলে তা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। এরপর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন শেষে তা পাসের জন্য সংসদে পাঠানোর বিধান রয়েছে। এদিকে আরপিও সংশোধনীর প্রস্তাব পাঠানোর আগেই ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকায় দেড় লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইসি। তবে তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই প্রকল্প প্রস্তাবের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় তাদের মতামতে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছে। ইসি সূত্র জানায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য ভোটকক্ষ ধরা হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার। সব আসনে ইভিএমে ভোট নিতে হলে ২ লাখ ৬৪ হাজার ইভিএম প্রয়োজন হবে (প্রত্যেক কেন্দ্রে একটি করে অতিরিক্ত ইভিএমসহ)। আর যদি ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করতে হয়, তাহলে ১ লাখ ৩২ হাজার ইভিএম প্রয়োজন হবে। বর্তমানে কমিশনের হাতে ৩৮০টি ইভিএম রয়েছে। একটি ভোট কেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য ১০-১২টি ইভিএম লাগবে। তবে সব পক্ষ একমত হলেই ইভিএম ব্যবহার করা হবে বলে জানান ইসির সচিব হেলালুদ্দিন। ২০২৩ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান কমিশনের। তবে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে থাকলেও জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে নন তাদের কেউ কেউ।

সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য ইসির পরিকল্পনা নিয়ে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ (জানিপপ)-এর চেয়ারম্যান ও বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ ভোরের পাতাকে বলেন, ‘আমরা প্রগতীর সাথে সংঘবদ্ধ। প্রযুক্তির সাথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ৩০০ আসনের এক তৃতীয়াংশ আসনে ইভিএম চালু করলে আগামীতে আরও আসনে সম্ভব হবে।’ ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভোটারা স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ইভএম সাশ্রয়ী। দেশীয় প্রযুক্তি নির্ভর। ভোটাররা স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন। তাদের বোধগম্য করে প্রশিক্ষণের ব্যবহার করতে হবে।’ তবে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে অনেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞই দ্বিমত পোষণ করেন। তারা জানান, বিষয়টি ত্রুটিপূর্ণ।

গত বছর রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে ইসির সংলাপে আলোচিত বিষয় ছিল ইভিএম। ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নিয়েছিল। ২৩টি দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছিল। এর মধ্যে বিএনপিসহ ১২টি দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দেয়। এখন হঠাৎ ইভিএম নিয়ে তোড়জোড়ের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধিতা আসছে। তবে ইসির সংলাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সাতটি দল ইভিএমের পক্ষে, তিন দল পরীক্ষামূলক ও আংশিকভাবে এবং একটি দল শর্ত সাপেক্ষে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছিল। ইভিএমের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে ইভিএমে ভোট হয়। এতে নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল হয়, দ্রুত ফল ঘোষণা করা যায়। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হলে আওয়ামী লীগ স্বাগত জানাবে।

তবে ইসির নিজস্ব জনবলকে এবং ভোটারদের ইভিএম বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’ অন্যদিকে ইভিএম  ব্যবহারের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তোড়জোড় দূরভিসন্ধিমূলক ও হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দল (বিএনপি)। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘একমাত্র সরকারি দল ছাড়া নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুধীজন, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অধিকাংশই ইভিএম ব্যবহার না করার জন্য মত দিয়েছিল। বেশিরভাগ মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে তড়িগড়ি করে আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ ও নানা ষড়যন্ত্রের কথা শোনা যাচ্ছে।’

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলামের সাথে তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, ‘আমরা ইভিএম’র বিষয়ে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি। এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক মতই থাকতে পারে। আমার প্রাথমিকভাবে আলোচনা করেছি। এর বেশি আপনাকে বলতে পারব না।’

এদিকে নির্বাচনী সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে তালিকায় রয়েছে ভোটগ্রহণের জন্য ৩৪ লাখ ৪০ হাজার স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ৬ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ স্ট্যাম্পপ্যাড, ১৭ হাজার ৪২০ কিলোগ্রাম লাল গালা, ৫ লাখ ৭৮ হাজার অফিসিয়াল সিল, ১১ লাখ ৫৬ হাজার মার্কিং সিল, ৮৭ হাজার ১০০ ব্রাশ সিল, ৬ লাখ ৬৫ হাজার অমোচনীয় কালির কলম। এছাড়া প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার রিম কাগজ প্রয়োজন হবে। এগুলো কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কেনাকাটার জন্য ইতোমধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। মালামাল সংগ্রহের কাজও শুরু হয়েছে। 

৬ সেপ্টেম্বরে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত হবে বলে ইসি সূত্রে জানা যায়। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে ভোটকেন্দ্রের খড়সা তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এছাড়া ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে গত ১৯ আগস্ট পর্যন্ত দাবি-আপত্তি গ্রহন করেছে কমিশন। আর দাবি নিষ্পত্তির তারিখ ৩০ আগস্ট এবং ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত হবে ৬ সেপ্টেম্বর। ৩০০ আসনে ৪০ হাজার ৬৫৭টি সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকা হাতে পেয়েছে ইসি।

তফসিল ঘোষণার পর আসনভিত্তিক কেন্দ্রের তালিকার গেজেট প্রকাশ করা হবে। ইসি সূত্র জানিয়েছে, নবম সংসদে ৮ কোটি ১০ লাখের বেশি ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্র ছিল ৩৫ হাজার ২৬৩টি (ভোটকক্ষ ১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৭টি)। সর্বশেষ দশম সংসদ নির্বাচনে ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটারের বিপরীতে ভোটকেন্দ্র ছিল ৩৭ হাজার ৭০৭। এ সময় ৩০০ আসনে ভোটকক্ষ ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮টি। এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১০ কোটি ৪২ লাখ ভোটারের বিপরীতে প্রয়োজন হবে প্রায় সাড়ে ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্র; এতে ভোটকক্ষ প্রায় ২ লাখ।
এ সংসদ নির্বাচনে ভোটার বেড়েছে ১ কোটি ২০ লাখ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে সর্বমোট  ভোটার হলেন ১০ কোটি ৪৩ লাখেরও বেশি। সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র হবে সাড়ে ৪০ হাজারের বেশি। নির্বাচনের জন্য সম্ভাব্য বাজেট রয়েছে ৬৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনার চেয়ে আড়াই-তিনগুণ ব্যয় হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়। ছবিসহ ভোটার তালিকার পর নবম সংসদ নির্বাচনে ৮ কোটি ১০ লাখ ও দশম সংসদ নির্বাচনে ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটার ছিলেন।

তফসিল ঘোষণার আগে-পরে দুই ধাপের অন্তত ৯০টি কাজ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রথম ধাপে ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রণয়ন, পুনর্নির্ধারিত সীমানা অনুযায়ী আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স প্রস্তুত, নির্বাচন সামগ্রী কেনাকাটা, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত, প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নির্বাচনী ম্যানুয়াল তৈরি, মনোনয়নপত্র মুদ্রণসহ আনুষঙ্গিক কাজ সেপ্টেম্বরে-অক্টোবরে শেষ করা হবে। তফসিল ঘোষণার পর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপের কাজ। দশম সংসদ নির্বাচন হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। তফসিল ঘোষণা করা হয় ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর। বিএনপিসহ সমমনা কয়েকটি দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। তার আগে নবম সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয় ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর। তিন দফা তারিখ পরিবর্তন করে ভোট হয় ২৯ ডিসেম্বর।

Ads
Ads