বঙ্গবন্ধুর আদরের সেই মেয়েটি ভালো নেই, শেখ হাসিনার সাক্ষাত চান

  • ২৮-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার বাইরের জেলাশহরগুলো সফর করেন। মে মাসে আসেন রংপুরে। দুদিন ছিলেন এখানে। রংপুর সফরকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু রংপুর সার্কিট হাউজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের আদর করেন। তাদের মধ্যে ছিল রংপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জেনিফার এলী।
বঙ্গবন্ধু তার মাথায় হাত দিয়ে আদর করেন। তখন সে স্লোগান দিচ্ছিল। সেই ছবি স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে। ছবিটি বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিশেষ দিনে সংবাদপত্রেও প্রকাশ হয়েছে। সেই জেনিফার এলী ভালো নেই। তার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আলী আশরাফ গুরুতর অসুস্থ। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। সালাম করতে চান তার পা ছুঁয়ে; বলতে চান অসুস্থ স্বামীর কথা।

বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন জেনিফার এলী। জানান বঙ্গবন্ধু রংপুরে প্রথম সফরে আসেন ১৯৭২ সালের মে মাসে, সম্ভবত ১০ মে। তখন তিনি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য স্কুলের কিছু ছাত্রী সার্কিট হাউজে যায়। পুলিশ তাদের ব্যারিকেড দেয়। কিছুতেই ঢুকতে দিচ্ছিল না। তারা তখন রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী বলে পরিচয় দেয়।
কয়েকজন মিলে সার্কিট হাউজের দেয়াল টপকে নামতেই পুলিশ বাধা দেয়। কিন্তু ছাত্রীরা দৌড়ে সার্কিট হাউজে ঢুকে পড়ে। এ সময় বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছিলেন সাজেদা চৌধুরী। সঙ্গে আরও ২-৩ জন। সাজেদা তাদের পরিচয় জানতে চান। ছাত্রীরা পরিচয় দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাবে বলে জানায়। সাজেদা তাদের বলেন, ‘তিনি তো খুব ব্যস্ত। লোকজনের ভিড়। সামনের রুমে উনি আছেন। ঢুকে পড়।’
জেনিফার এলী বলেন, ‘আমরা ৪-৫ জন ঢুকতেই দেখলাম, বিছানায় কোলবালিশে হেলান দিয়ে পাইপ হাতে সবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন। হঠাৎ বঙ্গবন্ধু আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কাকে চাও?’ পরণে স্কুল ড্রেস ছিল। বঙ্গবন্ধু আবার রসিকতা করে বললেন, ‘দেখতো তোফায়েল বঙ্গবন্ধু কোথায়?’ আমি বললাম, ‘আপনিই তো বঙ্গবন্ধু।’ তখন তিনি আমাদের কাছে ডাকলেন। ‘বঙ্গবন্ধু মানে কি বলতো’ বলে উনি আমাকে কাছে টেনে আদর করলেন। কি যে আনন্দ লাগছিল তখন, ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তারপর আমাদের নাম জিজ্ঞেস করলেন।
আমি বললাম, ‘আমরা আপনার অটোগ্রাফ নেব।’ তিনি খুব মজা করে বললেন, ‘অটোগ্রাফ! অটোগ্রাফ কি?’ আমি বললাম, ‘আপনার সিগনেচার।’ অথচ আমার কাছে তখন কোনো খাতা বা কাগজ ছিল না। আমি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। তিনি তখন আমার ডান হাত টেনে হাতে লিখে দিলেন, শেখ মুজিব। আমি সে লিখা ধরে রাখতে পারিনি। এত কাছে পেয়েও তার লিখিত স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি। তখন আবার পার্টির লোকজন তার সঙ্গে দেখা করবে। ওখান থেকে কে যেন বললেন, ‘তোমরা বাইরে যাও।’
জেনিফার বলতে থাকেন, ‘বাইরে এসে বারান্দায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে আমাদের আবারও দেখা। তিনি আমাদের বললেন, ‘তোমরা গান জান না? ওই যে, ওই গানটি শোন-একটি মুজিবুরের থেকে লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠ।’ আমরা বললাম, ‘হ্যাঁ’ পারি।’ এই বলে সাজেদা চৌধুরী আমাদের নিয়ে হাততালির সাথে সাথে তাল রেখে কিছু লাইন গাইলেন। আমরা তার সাথে সাথে গাইলাম। তারপর তিনি শিখিয়ে দিলেন, বঙ্গবন্ধু বাইরে এলে আমরা যেন সে গানটা গাই।
এরপর আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আধঘণ্টারও বেশি। বঙ্গবন্ধু পায়জামা পাঞ্জাবির সাথে মুজিব কোট, চশমা পরা। রুম থেকে বেরিয়ে জোরে জোরে হেঁটে আসছেন। বঙ্গবন্ধুর মাঝ থেকে কে যেন বললেন, ‘তোমরা স্লোগান দাও, স্লোগান দাও।’ আমি তখন হাত নেড়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখা মাত্রই স্লোগান দিলাম, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ‘আমার নেতা তোমার নেতা-শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ ইত্যাদি। স্লোগানের নেতৃত্ব আমি দিচ্ছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধুর হাতে ফুলের তোড়া ছিল। তিনি একটি লাল গোলাপ আমাকে ছুড়ে দিলেন। আমরা দৌড় দিয়ে বাইরে চলে আসি।
তাঁর দেওয়া ফুল হাতে পেয়ে আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাই। বাইরে তখন জিলা স্কুলের ছাত্ররা ভিড় করেছে। আমি সার্কিট হাউজের দেয়ালের খোপ বেয়ে উপরে উঠি। অন্য সব ছাত্রছাত্রীও ওঠার চেষ্টা করছিল। আমি তখন প্রাণপণে স্লোগান দিয়ে যাচ্ছিলাম। বঙ্গবন্ধু তখন হাসছিলেন ও ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ‘না তোরা পারলি না। এর সাথে তোরা পারলি না।’
রংপুরের কিছু নেতা পরে আমাকে দেখে বলেছিলেন, ‘এই পিচ্চির জন্য আমরা কিছু বলতে পারলাম না।’ প্রায় আধা ঘণ্টা আমরা ওনাকে ঘিরে ছিলাম। পরে উনি কালেক্টরেট মাঠে গেলেন। হেলিকপ্টার ওখানে থেমেছিল। আমরাও তখন বঙ্গবন্ধুর সাথে কালেক্টরেট মাঠে গিয়েয়েছিলাম। আমাদের স্কুলের অপজিটে। সেদিনের সেই অনুভূতি আমার মনে হলে আমি আজও সেই দিনটাতে চলে যাই। পরদিন সব পত্রিকার প্রথম পাতায় সার্কিট হাউজে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তোলা আমার ছবি উঠেছিল।
জেনিফার এলীর দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তার স্বামী রংপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আশরাফ এক বছরের বেশি সময় হলো স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী রয়েছেন। তার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। বাড়িতে একাই স্বামীর সেবা করে সময় কাটছে তার। সঞ্চিত যে অর্থ ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে স্বামীর চিকিৎসাতে। তিনি বলেলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে একবার একটু ছালাম করব। জানিয়ে দেব যে, আমি সেই শিশু, যাকে আপনার বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহের পরশ দিয়েছিলেন। আমি তার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।

Ads
Ads