গত ৫ বছর হকি ছিল অসুস্থ!

  • ৬-Aug-২০১৯ ১০:১৯ অপরাহ্ন
Ads

ভোরের পাতার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ফয়সাল আহসান

:: জহির ভূইয়া ::

বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের কার্যক্রম আর খেলার মান নিয়ে বহু সমালোচনা আর আলোচনা হয়েছে। হয়েছে টিভিতে টকশো। হকি দিনদিন মানের দিক দিয়ে তলানিতে চলে যাওয়ার পেছনে মূলত দুটি গ্রুপের দলাদলিই দায়ী। দুগ্রুপের কারণে হকি স্বাধীনতার এত বছর পরও এগোতে পারেনি। সেই হকি এখন নতুনরূপে উপস্থিত হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। কারণ দীর্ঘ ৫ বছর পর নির্বাচিত কমিটি কার্যক্রম শুরু করেছে। তাতে আছে দুগ্রুপের সদস্য। আছেন জাতীয় হকি দলের সাবেক খেলোয়াড়। তাদেরই একজন মোহাম্মদ ফয়সাল আহসান। যিনি জাতীয় দল থেকে অবসরে যাওয়ার পর পর্দার পেছন থেকে কাজ করে গেছেন। এবার নির্বাচত কমিটির সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ফয়সাল আহসান ভোরের পাতার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন অনেক অপ্রিয় সত্য আর বাস্তবতা। সাবেক এই খেলোয়াড় আর হকি কর্মকর্তার বাস্তব অভিজ্ঞতা ভোরের পাতার ক্রীড়া পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।   

ভোরের পাতা স্পোর্টস: আপনার খেলোয়াড়ি জীবন নিয়ে বলুন।
ফয়সাল আহসান: আমি স্কুলজীবন থেকে হকি খেলা শুরু করি। তার মধ্যে হকির মূল ধারায় খেলা শুরু করি ১৯৮৭ সালে। দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম খেলি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। সে ক্লাব থেকে সরাসরি জাতীয় দলে ডাক পেয়ে যাই। জাতীয় দলে সাধারণত ৪২ বা ৪৫ জনের একটি প্রাথমিক দল তৈরি করা হয়। সেখানে থেকে বাছাই হতে হতে আবাসিক লেভেলে চলে যায়। শেষ অবধি ১৮ জনে জাতীয় দল রূপ নেয়, আমি সে তালিকা পর্যন্ত থাকি প্রথমবারেই। এরপর আমাকে খেলার জীবনে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সেই লিগের দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগের লিগের শীর্ষ তিন দলে খেলেছি। জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে বের হয়ে এসে আমি ওয়ান্ডারার্সে খেলি। এরপর আজাদে তারপর ঊষায় খেলি লম্বা সময়। ঊষায় খেলা অবস্থায় বেরিয়ে অ্যাজাক্সে খেলি, তারপর আবার ঊষায় ফিরে আসি। আমি মূলত ঊষারই খেলোয়াড়। ১৯৯৬ সালে আমি ঊষায় শেষবার খেলি। এরপর অবসরে চলে যাই।

ভোরের পাতা স্পোর্টস: খেলোয়াড়ি জীবন থেকে হকির কমিটিতে। এ প্রসঙ্গে কী বলবেন? আপনার অভিজ্ঞতা বলুন।
ফয়সাল আহসান: হকি কমিটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি এ বছরই। আমি দীর্ঘদিন হকি নিয়ে কাজ করেছি। তবে সেটা পেছন থেকে, মূল ধারায় আমি আসতাম না। হকির ভেতরের রাজনীতির কারণে আমি আসতাম না। আমাদের হকিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অনিয়ম চলছে। বিষয়টি ছিল একটি গ্রুপ হকির পাওয়ারে চলে আসে তখন অপর গ্রুপকে আর ভেতরে আসতে দিত না। অথচ আমরা সবাই একই হকি ঘরানার মানুষ। এটা নিয়ে আমার মধ্যে অসন্তোষ ছিল বলেই আমি হকিতে প্রবেশ করিনি। কিন্তু হকির জন্য ভেতর থেকে ভালোবাসা, মায়া-দরদ সবই ছিল। সেজন্য আমি পেছন থেকে কাজ করতাম। যখন যে কমিটি ডাকত আমি তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে কাজ করে দিতাম। ২০০৭ সালের মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম। তখনকার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন খন্দকার জামিল। আমাকে তিনি ডেকেছিলেন, আমি বলেছিলাম আমি অবশ্যই কাজ করব। গত ২ বছর থাকা এডহক কমিটিও আমাকে মিডিয়া কমিটির সেক্রেটারি বানিয়ে ছিল। আমি সকলের সঙ্গেই কাজ করেছি। আমি পরিচ্ছন্ন জীবন পছন্দ করি, তাই আমি অনিবার্চিত কোনো কমিটিতে থাকতে চাইনি। যে কারণে ওসব ঝামেলাতে কখনো যাইনি।

ভোরের পাতা স্পোর্টস: কমিটির বাইরে সাবেক খেলোয়াড় হিসেবে কি কোনো কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছেন?
ফয়সাল আহসান: সাবেক হকি খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি একটি সংগঠন করেছি। এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হকিকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া। যে কার্যনির্বাহী কমিটি কাজ করে তাদের দিকনির্দেশনায় কাজ করা। হকির বর্তমান কমিটির আগামীদিনের পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে আমাদের একটি সম্পর্ক আছে। আমাদের এই সংগঠনের বয়স বর্তমানে ৩ বছর, আর আমাদের সদস্য ১০০। আমি জোরগলায় বলতে পারি, বাংলাদেশের কোনো সাবেক খেলোয়াড়ের সংগঠন আমাদের মতো কার্যকর নয়। কারণ আমরা সাবেক সবাই প্রতি শুক্রবার হকি স্টেডিয়ামে সকালে মিলিত হই। আমরা অনুশীলন করি, নিজেদের মধ্যে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলি। আমরা এই দল নিয়ে কলকাতা সফর করেছি, সামনে ইন্দোনেশিয়া মাস্টার হকি টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার প্ল্যান আছে। এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আমি এবং সভাপতি হচ্ছেন মেজর ইমরুজ ভাই। 

ভোরের পাতা স্পোর্টস: হকির মান তো দিন দিন তলানিতে গেছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
ফয়সাল আহসান: আমি মেনে নিচ্ছি। ২০ বা ২৫ বছর আগে হকি এদেশের শীর্ষে ছিল। সম্ভাবনার দিক থেকে ঘরোয়া-আন্তর্জাতিক এবং বিশ^মানে খেলার মতো একটি খেলাতেই গুণ ছিল সেটা হলো হকি। প্রকৃত পৃষ্ঠপোষকতা ও সাংগঠনিক অদক্ষতার কারণে এবং নিজের গ্রুপিংয়ের জন্য আজও হকিকে সামনের দিকে দেখতে পাচ্ছি না। এখন কি সব সমাধান হয়ে গেল এই কমিটি আসাতে! না আমি তা বলব না। আগে যতটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এখন আর তা নেই। এবারের নির্বাচনে আমাদের প্যানেল থেকে ১৭টি আর ওই প্যানেল থেকে ১১টি পদে জয় পেয়েছে। দুগ্রুপের সদস্যদের নিয়ে কমিটি তৈরি হয়েছে। 

ভোরের পাতা স্পোর্টস: মাঝে হকির মান ওপরে তুলতে চেষ্টা হয়েছিল।    ব্যর্থ হয়েছে সে চেষ্টা, কেন?
ফয়সাল আহসান: আগে একটা সময় ছিল খন্দকার জামিল ভাই চেষ্টা করেছেন। তিনি আসার পর অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ পেছন থেকে নানা মন্তব্য করতে শুরু করলেন। জামিল ভাই রাগ করে হকি থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনিই ইউরোপে বাংলাদেশি হকি খেলোয়াড় পাঠাতে শুরু করলেন। আমাদের তখন পরিকল্পনা ছিল যত বেশি ইউরোপের সঙ্গে খেলানো। তাতে আমাদের খেলোয়াড়দের ভয়টা দূর হতো। সে পরিকল্পনায় জামিল ভাই চেষ্টা করলেন নিজের পকেটের টাকা দিয়ে। আমিও দিয়েছি। কিন্তু শেষ অবধি তিনি চলে যেতে বাধ্য হলেন। যাই হোক এখনকার বর্তমান কমিটির সভাপতি এয়ার চিফ, সাধারণ সম্পাদক সাইদ ভাই ও ভাইস প্রেসিডেন্ট রশিদ ভাই মিলে ভালো ভালো পরিকল্পনা করছেন। গত ৫ বছর হকি ছিল অসুস্থ পর্যায়ে। নতুন নির্বাচিত কমিটি নিয়ে আমরা সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করেছি।

ভোরের পাতা স্পোর্টস: হকির আগামীদিনের পরিকল্পনা কী কী? এসব কি বাস্তবে রূপ নেবে?  
ফয়সাল আহসান: এক বছরের মধ্যে ২টা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আছে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি  জুনিয়র এশিয়া কাপ আয়োজন করব। তবে তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভারত ও শ্রীলংকা চেয়েছিল, কিন্তু টেন্ডারে আমরা পেয়েছি। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী নিয়ে একটি হকি টুর্নামেন্ট আয়োজন করব।

ভোরের পাতা স্পোর্টস: ক্রিকেটকে দেখে ফুটবলেও বিপিএল। কিন্তু হকিতে নেই। কী বলবেন?
ফয়সাল আহসান: আমরা বিপিএলের মতো হকিতেও ফ্যাঞ্চাইজি লিগ চালু করব, তবে আমাদের একটু সময় দরকার। আমরা তো মাত্র কমিটিতে এসেছি। গুছিয়ে নিতে সময় প্রয়োজন। পেছনের অনেক কিছু ঠিক করে আমাদের সামনে যেতে হচ্ছে। আসলে আমরা অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু এর জন্য তো প্লাটফর্ম দরকার। আমরা হকির সেই প্লাটফর্ম তৈরির কাজ করছি।

Ads
Ads