রিফাত হত্যাকাণ্ডের পরই বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি অনিক কোথায় পালিয়েছেন!

  • ৫-Aug-২০১৯ ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
Ads

:: উৎপল দাস ::

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া সবাই ছাত্রলীগ নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওইদিকে কিলিং মিশনে অংশ নেয়া যুবকদের সাথে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিকের ঘনিষ্ঠতা বিভিন্ন  গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পরই তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে ভোরের পাতাকে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা ছাত্রলীগের  নেতারা বলেন, এই হত্যা মামলার আসামিরা জেলা ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাডার হিসেবে শহর দাপিয়ে বেড়াত। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি অনিক, সাধারণ সম্পাদক তানভীর ও সহ-সভাপতি তুহিনের সঙ্গে এই খুনের মামলার আসামিদের দহরম-মহরম এখন ওপেন-সিক্রেট। ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ যোগসূত্রের কারণেই প্রকাশ্য দিবালোকে বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে তারা। তাদের মধ্যে রাব্বী আকন জেলা ছাত্রলীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য। সাবেক এমপি ও বর্তমানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার দুই ছেলে রিশান ফরাজী ও রিফাত ফরাজীর কোনো পদবি না থাকলেও কমিটির নেতাদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। এ ছাড়া মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড ছিল ছাত্রলীগ সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিকের বিশ্বস্ত সহচর ছিল। যেকোনো প্রয়োজনে নয়নকে অপারেশনে পাঠাতেন তিনি। 

জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শহরের দোয়েল চত্বরে সিফাত চৌধুরী নামে একজনের ওষুধের দোকান ছিল। চার বছর আগে জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতির ভাইয়ের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়ায় নয়ন বন্ডকে পাঠিয়ে তাকে বেদম পেটানো হয়েছিল। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীরের ছেলে বিরুদ্ধে নয়ন বন্ড, রিশান ও রিফাত ফরাজীদের ‘ক্যাডার বাহিনী’ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

জেলা ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানান, অনিক তানভীরের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিটির অধিকাংশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই রয়েছে মাদক বানিজ্যে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ। সাধারণ সম্পাদক তানভীর হোসাইনের মাদক সেবনের ভিডিও এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।       কমিটির সহ-সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাজুর নামে এক পাগলীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা আছে। এছাড়া বরগুনার বামনায় ইয়াবাসহ উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাফান জোমাদ্দার আকাশ ও তার সহযোগী তোফায়েল হোসেন তপুকে আটক করেছিলো বরগুনা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের সদস্যরা।

এ প্রসঙ্গে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন ভোরের পাতাকে বলেন, ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলে সংগঠিত হয়ে এই খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে আসামিরা। তাদের সঙ্গে যাদেরই সম্পর্ক থাকুক, সেটি পুলিশের তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না। আমরা সব বিষয় খতিয়ে দেখছি। 

এইদিকে মাদক ব্যবসার অভিযোগে অভিযুক্ত ও বিতর্কিত নেতাদের কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেয়ায় তা বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে, সড়ক অবরোধ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা অভিযোগ করেছিলেন, জুবায়ের আদনান অনিক ও তানভীর হোসাইন   কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় গঠনতান্ত্রিক কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রকৃত ছাত্রলীগ কর্মীদের কোণঠাসা করে জামায়াত-বিএনপি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করেছিলেন। ওইসময়ে তারা আরও অভিযোগ করেছিলেন তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরোয়ার হোসেন স্বপনের বাবা বেলায়েত হোসেন পনু জোমাদ্দার তালতলী থানা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। তার আপন মামাত ভাই সবুজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলার অন্যতম আসামি। আপন ফুফাত ভাই তালতলী উপজেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক। আমতলী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহবুব র্যাবের হাতে ৫ কেজি গাঁজাসহ ধরা পড়েছিলেন, সেই মামলাও বিচারাধীন। তাই  এ সকল কমিটি তারা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। 
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, জুবায়ের আদনান অনিকের জেলা ছাত্রলীগের  সভাপতি পদ বাগিয়ে নেয়াটাই ছিলো পেশিশক্তি ব্যবহারের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ২০১৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বরগুনা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কমপ্লেক্সে জেলা ছাত্রলীগের কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে  তখনকার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম. বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম কমিটি ঘোষণা না করে ১০ জন প্রার্থীর বায়োডাটা নিয়ে ঢাকা চলে যান। তার পরের দিন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কবীরকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে জানিয়ে দেয়া হয়, তানভীর হোসাইন সভাপতি ও জুবায়ের আদনান অনিককে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সংবাদে অনিক সমর্থিত ছাত্রলীগের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা রাস্তায় বেরিয়ে পরে এবং তান্ডব চালিয়ে কমপক্ষে ৫০টি যানবাহন ও শতাধিক দোকানপাট  ভাংচুর করে। নিমিষেই ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয় বরগুনা। সংবাদটি দ্রুত ঢাকা পৌঁছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার মধ্যস্থতায়  রাত অনুমান ৮টার দিকে পুনরায়  বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কবীরের মুঠোফোনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম জানান, কমিটি পরিবর্তন করে আদনান অনিক সভাপতি ও তানভীর হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক করে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের কমিটি দেয়া হয়েছে।

এদিকে,  সরাসরি শেখ হাসিনার মনোনীত ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ভোরের পাতাকে অভিন্ন সুরেই বলেছেন, বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এছাড়া মাদক, ধর্ষণ মামলার আসামি থেকে শুরু করে বিএনপি জামায়াতের পরিবারের লোকজনকে নিয়ে কমিটি করার মতো অভিযোগ ইতিমধ্যে এসেছে। আগামী ২ মাসের মধ্যেই বরগুনা জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে সেখানে যোগ্য ও মেধাবীদের দিয়ে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়া হবে।

Ads
Ads