ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে!

  • ২৮-Jul-২০১৯ ১০:০৫ অপরাহ্ন
Ads
  • # অতীতের সব রেকর্ড ভাঙল ডেঙ্গু
  • # আক্রান্ত আরও ৬৮৩ জন :স্বাস্থ্য অধিদফতর
  • # অকার্যকর ওষুধ দিয়েই চলছে মশক নিধন কার্যক্রম
  • # সরকারি হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষায় লম্বা লাইন

:: জিএম রফিক ::

দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু। রাজধানীতে এর প্রকোপ আরও বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগীর সেবা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও ৬৮৩ জন। আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি মহামারির রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষার্থীদের মাঝে অ্যারোসল বিতরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েই বসে আছেন দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমেছে বলে জানা যায়। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে সচেতনতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

বছর শেষ হতে এখন পাঁচ মাস বাকি থাকলেও চলতি মাসেই বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় দেড় যুগ আগে ২০০২ সালে দেশে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ২৩২ জন আক্রান্ত হন। তবে ২০০০ সালে ৯৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ডই ছিল সর্বাধিক। সুদীর্ঘ ১৬ বছর পর অর্থাৎ ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৪৮ জন আক্রান্ত হয়ে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছিল। মৃতের সংখ্যা ছিল ২৬। চলতি বছরের সাত মাস শেষ হওয়ার আগেই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৫২৮। এর ফলে ২০১৮ সালের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড স্থাপিত হলো।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে চলতি বছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৫২৮ ডেঙ্গু রোগী সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছেন। তবে এ বছর মৃতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম মাত্র ৮ জন। তবে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য অনুসারে চলতি মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা গত বছরের ২৬ জনের রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে ৩৩ জনে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮ থেকে শনিবার সকাল ৮ পর্যন্ত) আরও ৬৮৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সংখ্যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২৪ জুলাই সবচেয়ে বেশি ৬৬৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। এসব রোগীকে সামাল দিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। অথচ এমন পরিস্থিতিতে অকার্যকর ওষুধ দিয়েই ঢাকার দুই সিটিতে চলছে মশক নিধন কার্যক্রম। এমন ঘটনাকে ‘রঙ্গরস’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন রাজধানীবাসী। শ্যামলীর শিশুপার্ক এলাকার অধিবাসী একটি সৃজনশীল বই প্রকাশনা সংস্থার স্বত্বাধিকারী এনাম রেজা জানান, ‘দুই সিটি করপোরেশনে মশা নিধনকারী ওষুধ আমদানির জন্য ৪০ কোটি টাকা বাজেটের কথা শুনেছিলাম। আইসিডিডিআর-বির গবেষণায় ওই সব ওষুধ অকার্যকর বলে উঠে আসে। অথচ শ্যামলী এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ওই ওষুধ প্রয়োগ এখনো করা হচ্ছে। এটা কী ধরনের মজা?’ আজিমপুর ও উত্তরা জসিমউদ্দীন এলাকার কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা হলে তারা ‘সিটি করপোরেশনের এসব কার্যক্রম স্রেফ লোক দেখানো’ বলে মন্তব্য করেন। যদিও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের দাবি- এ ওষুধেই মশা মরছে। আর নতুন ওষুধ আনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

‘প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এ ওষুধ আমদানি করতে অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগবে’ বলে জানিয়েছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তবে সে পর্যন্ত ‘আল্লাহকে ভরসা করে রাজধানীতে’ থাকছেন বলে মন্তব্য করেন হাজী ক্যাম্পে হজের ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষারত আব্দুর রশিদ, মিলন রহমানসহ অনেকে। 
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, চলতি মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হলেও আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বছরওয়ারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০০-২০১৯ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৫৫৫১, ২৪৩০, ৬২৩২, ৪৮৬, ৩৪৩৪, ১০৪৮, ২২০০, ৪৬৬, ১১৫৩, ৪৭৪, ৪০৯, ১৩৫৯, ৬৭১, ১৭৪৯, ৩৭৫, ৩১৬২, ৬০৬০, ২৭৬৯ ও ২০১৯ সালের (২৭ জুলাই পর্যন্ত) ১০ হাজার ৫৪৮ জন।

এদিকে দিনদিন রোগীর তালিকা লম্বা হতে দেখা যাচ্ছে। সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালগুলোকে। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কবি নজরুল ইসলাম সরকারি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইদ্রিস আলী জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় রক্ত পরীক্ষা করতে আসেন হাসপাতালে। প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বহির্বিভাগ থেকে ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটেন। এরপর এক ঘণ্টা ধরে ডাক্তার দেখানোর লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার সামনে আরও ৯ জন। রাবেয়া আক্তারকে (৪০) দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ২ ঘণ্টা। হাসপাতালে কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা বলেন, কয়েক দিন ধরে রোগীর সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন জায়গা থেকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে আসছেন অনেকেই। ঢাকা মেডিকেলের অবস্থাও একই। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটতে হচ্ছে এবং ডাক্তার দেখাতে হচ্ছে। এছাড়া স্কয়ার, এপোলো, ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগির সংখ্যা বেড়েই চলেছে বলে হাসপাতালসূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে ডেঙ্গুতে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শুক্রবার সন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধা ডা. উইলিয়াম ম্রং এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে শিক্ষার্থী ফিরোজ কবির স্বাধীনের মৃত্যু হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ডা. উইলিয়াম ম্রং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ৯ম ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১ সেক্টরের অধীনে ঢালু সাব-সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঘ’ ইউনিটে নবম হয়ে ঢাবিতে ভর্তি হন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ফার্মেসি বিভাগের প্রথম বর্ষের  শিক্ষার্থী উখেংনু রাখাইন। গতকাল শনিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম নেওয়ার পথে মারা যান তিনি। 

ডেঙ্গুর প্রকোপ রাজধানী ছাড়িয়ে লক্ষ্মীপুর, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা না থাকায় তাদের অনেককে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে রাজধানীতে। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার শাহিনুর রহমান সরদার বলেন, গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি হন কামরুজ্জামান (৩৫) নামে এক রোগী। ‘তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে শুক্রবার রংপুরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলা হয়।’ তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই বলে তিনি জানান।

কুমিল্লায় ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৩ জন রোগী হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন আছে বলে জানা গেছে। জেলা সিভিল সার্জন ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের পরিচালক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বরগুনা জেলায় এ পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ১৮ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত ১৩ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। পাবনায়ও গত তিন দিনে অন্তত ৩০ নারী-পুরুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রঞ্জন কুমার দত্ত জানান, যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তারা পাবনার বাসিন্দা হলেও তাদের কেস স্টাডি করে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে ফেরার পরপরই অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হন এবং পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাদের শরীরে ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটেছে। হাসপাতালে ১৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। শনিবারই ভর্তি হয়েছেন ১২ জন। এর আগে ২/৩ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

Ads
Ads